‘কাম নাই, সংসার চালাবার জনতে মাছ ধরি’

ফরহাদুজ্জামান ফারুক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রংপুর
বাঁশের তৈরি ফাঁদ দিয়ে ছোট মাছ ধরার ধুম পড়েছে/ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশের তৈরি ফাঁদ দিয়ে ছোট মাছ ধরার ধুম পড়েছে/ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘নদীত পানি কমছে। সবায় এ্যলা মাছ ধরা নিয়্যা ব্যস্ত। আগের মতো কাজ কাম নাই। এই জনতে কায়ো কায়ো মাছ বিক্রি করি সংসার চালাওচে। খালি নদীত নোয়ায়, গ্রামের খাইল-বিল, পুকুরোত এ্যলা ভালোয় মাছ পাওয়া যাওচে। বানের পানির দেশি মাছের দামও বেশি। হামার নেজেরও খাওয়া হওচে, মাছ বিক্রি করি সংসারও চলোছে’ এভাবেই নদী থেকে জাল টানতে টানতে কথাগুলো বলছিলেন নওশাদ আলী। রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পূর্ব ইচলি গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

বর্ষা আর বন্যায় তিস্তার তাণ্ডবে বসত-ভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন নওশাদ। তার মতো অনেকের ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী এই বন্যায় দুর্ভোগ বেড়েছে অসংখ্য মানুষের। করোনার মহামারির সাথে বন্যা দুর্যোগে অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এসব মানুষের জীবিকার যোগান মিলছে মাছ ধরা থেকে-ঘাম ঝরা রোদে দাঁড়িয়ে এসব বলছিলেন নিঃস্ব নওশাদ আলী।

খালে-বিলে মাছ ধরার হিড়িক

গঙ্গচড়ার মতো রংপুরে তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া, বুড়াইল, দুধকুমার নদী বিধৌত নিম্নাঞ্চলে এখন নানান বয়সী লোকজন মাছ ধরায় সরব। গ্রামাঞ্চলে এই দৃশ্য বেশি চোখে পড়লেও শহরেও কোথাও কোথাও খাল-বিলে মাছ শিকার করতে দেখা যাচ্ছে।

এবারের বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় রংপুর অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতিক্ষয় হয়েছে মৎসচাষিদের। বন্যার পানিতে ছোট ছোট পুকুর-ডোবার মাছ ভেসে গেছে। কোথাও ভেসে গেছে জলাশয় ও বিলের মাছও। এসব মাছ ছড়িয়ে পড়েছে কৃষি জমি, খালে-বিল আর নদীতে। এখন বন্যার পানি কমতে শুরু হওয়াতে রংপুর মহানগরসহ আট উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলছে মাছ ধরার হিড়িক।

কোথাও কোথাও এখনো খাল-বিল, নদী-নালা এখনও পানিতে টইটম্বুর। তলিয়ে আছে ফসলি জমিও। এসব জমিতে দেখা মিলছে অনেক রকমের দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছ। জাল, বর্শি আর দেশীয় বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি করা ফাঁদে সেই মাছ ধরছে শিশু-কিশোর থেকে বিভিন্ন বয়সী লোকজন।

সংসার চালাতে মাছ ধরছে তারা

গঙ্গাচড়ার দক্ষিণ কোলকোন্দ ঘোনটারী গ্রামে মাছ ধরতে দেখা যায় কয়েকজনকে। এসময় মোসলেম নামে একজনের সাথে কথা হয়। বন্যায় নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে শংকরদহ গ্রাম ছেড়ে এখানে অন্যের জমিতে ঠাঁই নিয়েছেন তিনি।

মাছ ধরতে ব্যস্ত মোসলেম উদ্দিন বলেন, এই বানোত ঘর-বাড়ি নদীত চলি গেইছে। এ্যলাও আবাদি জমি পানির তলোত পড়ি আচে। কাজ কাম নাই। হামাক তো বাচা নাগবে। সংসার চালাবার জনতে এ্যলা মাছ ধরি। টাউনের মাইনষে দেশি মাছ বেশি দামে কেনে। মাছ ধরি, মাছ বিক্রি করি কোনমতে বড়-ছাওয়া নিয়্যা দিন যাওছে। কবার পান-হামরা এ্যলা মাছে-ভাতে বাঙালি।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাল-বিলে মাছ ধরছে অসহায় মানুষ

কেউ শখে মাছ শিকার করলেও নদীপাড়ের অসহায় লোকেরা মাছ ধরছেন সংসার চালাতে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীসহ বিভিন্ন খালে-বিল থেকে ধরা মাছ চড়া দামে বিক্রির আশায় থাকেন তারা। কখনো ব্রিজের ওপর নতুবা গ্রামের হাটে-বাজারে রাস্তার ধারে বসে ধরা মাছ বিক্রি করছেন। সেই টাকায় কোনো রকমে সংসার চলছে।

জানা গেছে, এবারের বর্ষা ও বন্যায় জেলায় প্রায় সহস্রাধিক পুকুর, খাল-বিল ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। একারণে মাছ ধরায় মেতে উঠেছে ছোট-বড় সবাই। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের তৈরি বিভিন্ন জাল ও বাঁশের তৈরি ফাঁদ দিয়ে ছোট মাছ ধরার ধুম পড়েছে।

এদিকে মাছ ধরার চাহিদা বাড়ায় এখন হাটে-বাজারে বেড়েছে জাল বিক্রি। দেশীয় বাঁশ-বেত দিয়ে মাছ ধরার ফাঁদ তৈরির কারিগরদেরও ব্যস্ততা বেড়েছে। দেশীয় এসব ফাঁদের নাম এলাকা ভিক্তিক-চাঁই, টইয়া, পরো, ডিড়ই, ডাড়কি, ভোরং, বানা, হেঙ্গা ও খোলসুন ইত্যাদি।

আপনার মতামত লিখুন :