অপসারণ নয়, কুকুরের জন্য প্রয়োজন মানবিক পরিকল্পনা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
অপসারণ নয়, কুকুরের জন্য প্রয়োজন মানবিক পরিকল্পনা

অপসারণ নয়, কুকুরের জন্য প্রয়োজন মানবিক পরিকল্পনা

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বস্ত ও প্রভুভক্ত হওয়ার কারণে কুকুরের খ্যাতি রয়েছে যুগ যুগ ধরে। আদিকাল থেকেই কুকুর মানুষের খুব কাছের একটি প্রাণী। পোষা প্রাণী হিসেবে কুকুর বেশ বিশ্বস্ত এবং প্রভুভক্ত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কুকুরসহ অনেক প্রাণীর অবদান রয়েছে। পাশ্চাত্য দেশে এবং তাদের সমাজে কুকুরের অনেক কদর রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু ক্ষেত্রে কদর থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিরূপ অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।

দেশজুড়ে প্রভুভক্ত এই প্রাণীটির ওপর দিন দিন সহিংসতা বেড়ে চলেছে। কোথাও কোথাও চলে অতিমাত্রায় বর্বরতা। তারপরও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয় না এসব সহিংস অপরাধীদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রাজধানীর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কুকুর নিধন-অপসারণে এগোচ্ছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় ঘুমের ওষুধ দিয়ে অন্তত ১০০ কুকুরকে স্থানান্তর করেছে। অন্যদিকে এভাবে কুকুর অপসারণ বন্ধে হাইকোর্টে রিট করেছেন অভিনেত্রী জয়া আহসান ও প্রাণি অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠন। তারা বলছেন, এই ধরনের অপসারণ অমানবিক সিদ্ধান্ত। 

পরিবেশবিদ তথা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণী কল্যাণ আইন-২০১৯ অনুযায়ী কুকুর নিধন-অপসারণ দণ্ডনীয় অপরাধ। যথাযথ উপায়ে রাস্তার কুকুরকে টিকা ও বন্ধ্যত্বকরণ নিশ্চিত করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন থেকে কুকুর নিধন কিংবা অপসারণের ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জলাতঙ্ক তথা কুকুর উন্নয়নে ৩৩ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ অর্থের যথাযথ ব্যবহার হলে কুকুরের সংখ্যা ও জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত। সর্বোপরি কুকুরের জন্য আমাদের মানবিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।  

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক প্রফেসর ডা. বেনজির আহমেদ জানান, দেশে প্রায় ১৭ লাখের মতো কুকুর রয়েছে। যার মধ্যে বর্তমানে রাজধানীর দুই সিটিতে ৫৫ হাজারের মতো কুকুর রয়েছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। জলাতঙ্ক রোধে টিকা নিশ্চিতকরণসহ সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বন্ধ্যত্বকরণ নিশ্চিত করাই হবে সংশ্লিষ্টদের সঠিক দায়িত্ব।

প্রাণী কল্যাণ সংগঠন অভয়ারণ্যের প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ জানান, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এমন উদ্যোগ মেনে নেয়া হবে না। প্রাণীপ্রেমী সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। ঢাকায় ৭৫ শতাংশ কুকুর সরকারের বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচির আওতায় আছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে; কিন্তু দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন করছে না।

এদিকে ১০০ কুকুর অপসারণ করে মাতুয়াইল ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ডিএসসিসি’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, কুকুর বন্ধ্যত্বকরণ কর্মসূচি চালানোর মতো পর্যাপ্ত লোকবল ও ব্যবস্থা সিটি কর্পোরেশনের কাছে নেই। কুকুর নিয়ে বিস্তর অভিযোগ আসায় অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে এটা প্রাথমিক— দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না। কুকুরগুলো ছেড়ে দেওয়ার পর আবারও আগের এলাকায় ফিরে আসে কিনা তা দেখার জন্য এই পরিকল্পনা।

তবে অপসারণ নয় পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজধানীতে কুকুর রাখার বিষয়ে সমর্থন রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের। এ প্রসঙ্গে উত্তর সিটির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হক জানান, উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ২০ হাজারের উপরে কুকুর রয়েছে। আমরা এসব কুকুরকে রাজধানীতে রেখেই যথাযথ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিচ্ছি। মেয়র কুকুরকে খাবার দিচ্ছেন। নগরবাসীর যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি সামনে রেখে সব কুকুরকে টিকার আওতায় আনা হবে। এদের বন্ধ্যত্বকরণ নিশ্চিত করা হবে।

পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারের (প ফাউন্ডেশন) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রাকিবুল হক এমিল জানান, মানুষের বন্ধু হয়ে থাকা, শিক্ষার্থীদের টাকায় বন্ধ্যা করা, টীকা দেয়া, বিভিন্ন এলাকার প্রাণীপ্রেমীদের টেক কেয়ার করা বন্ধু প্রাণিগুলোকে হঠাৎ এসে, ধরে ধরে অজ্ঞান করে ময়লার মধ্যে ফেলে দিয়ে আসা- কোন সভ্যতা এটা করতে পারে না। আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে এ নগরে থাকা কুকুরগুলো যেন সুস্থ ও ভালো থাকে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ দ্বারা যাতে কোনো কুকুরের ক্ষতি না হয়। বন্ধ্যত্বকরণ নিশ্চিত করতে যা যা প্রয়োজন, তা সঠিক ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।