মশা নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা দেখিয়েছে ডিএনসিসি



শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীতে বসবাস মানেই মশার যন্ত্রণা। তবে সিটি করপোরেশনের তৎপরতায় অন্যবারের তুলনায় এবার মশার উৎপাত অনেকটাই কম। কানের কাছে আর মশার গান শোনা যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দেখিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র।

তবে শুধু যে মেয়র বা সিটি করপোরেশনের তৎপরতায় কমেছে বিষয়টি পুরোপুরি তাও না। এবার মশা নিয়ন্ত্রণে অনেকগুলো অনুসঙ্গ একসঙ্গে কাজ করেছে। তারমধ্যে রয়েছে করোনাকালীন সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত পরিচর্যা বৃদ্ধি ও সচেতনতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি আবহাওয়া অনুকূলে থাকার বিষয়টিও কাজ করেছে। যে কারণেই হোক এবার মানুষ অনেক স্বস্তিতে রয়েছে। বার্তা২৪.কম এর কাছে অনেক এলাকার বাসিন্দাই তাদের স্বস্তির বিষয়টি প্রকাশ করেছেন।

বিজ্ঞানীদের ধারণা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। তবে আমাদের দেশে যে মশার সাথে সব থেকে বেশি পরিচিত সেগুলো হচ্ছে কিউলেক্স ও এডিস মশা। এছাড়া আমাদের দেশে অ্যানোফিলিস ও হেমাগোগাস মশা দেখতে পাওয়া যায়।

তবে সব থেকে বেশি যন্ত্রণা দেয় কিউলেক্স ও এডিস মশা। এই দুই মশার বংশ বৃদ্ধির সময়কাল ও স্থানেও ভিন্নতা রয়েছে। কীটতত্ত্ববিদদের মতে কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম বা সময়কাল শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকে। এরপর মশার বংশ বিস্তার বাড়তে বাড়তে গিয়ে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তারপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। কিউলেক্স মশা সাধারণত ডোবা, নালায়, কচুরিপানা বা বদ্ধ জলাশয়ে জন্মায়।

অন্যদিকে এডিস মশার বংশবিস্তার শুরু হয় এপ্রিল মাস থেকে। মে, জুন মোটামুটি বাড়তে থাকে। এরপর জুলাই-আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। তারপর সেপ্টেম্বর থেকে এডিস মশার বংশ বিস্তার কমতে থাকে। অক্টোবরের দিকে প্রায় শূণ্যের কোটায় চলে আসে। এডিস মশা আমাদের দেশের জন্য ভয়ঙ্কর। কেননা এই মশার কামড়ে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো মরণব্যাধি হয়ে থাকে। এডিস মশাকে অনেকে জমিদারি মশাও বলে থাকেন। কারণ এই মশা সাধারণত বাসাবাড়ী ফুলের টব, ফ্রিজের পানি, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার বা অন্য কোথাও জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে বংশ বিস্তার করে।

দুই ধরণের মশার জীবনচক্র থেকে বোঝা যায় অক্টোবর মাস মশার জন্য ‘ডাল সিজন’ বা নিম্নমুখী সময়। এই সময়ে মশার উৎপাত একটু কমই থাকে। তাই মশা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এমনটিও বলা যাচ্ছে না। আবার মশার যন্ত্রণায় বসা যায় না এমনও না।

মশা বংশ বিস্তার রোধে এবার বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কয়েক দফা বিশেষ সপ্তাহ পালন করেছে। শুধু তাই না প্রথমবারের মতো উন্নতমানের ওষুধ আমদানি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ‘নোভালিউরন’ (Novaluron) নামক কীটনাশক আমদানি করা হয়েছে। এটি সাধারণত ট্যাবলেট জাতীয় কীটনাশক।

দশ লিটার পরিষ্কার পানিতে একটি ট্যাবলেট এবং ডোবা বা নালার পানিতে একই পরিমাণ পানিতে দুটো ট্যাবলেট মিশিয়ে দিলে ২/৩ তিন মাস সেখানে মশার বংশবিস্তার বন্ধ হয়ে যাবে। মনে রাখা ভালো এই ওষুধ মশা মারে না। এটি শুধুমাত্র মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করে।

মশায় যেসকল রোগ ছড়ায়: ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি।

মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১৯ নং রোডের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, “আমি আমার ১২ বছরের ঢাকার জীবনে এমন মশাহীন দেখিনি।  দারুণ স্বস্তিতে আছি। একটা সময় মনে হতো ঢাকায় কোনদিনই মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। এবার যেটা দেখলাম আমি সত্যি অভিভূত। এজন্য মেয়র আতিকুল ইসলাম সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আমার অনুরোধ মেয়র যেন এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন।”

তিনি বলেন, “এই মাসে মশার বংশ বিস্তার কম ঠিক আছে কিন্তু গত দুই মাস ধরেই মশার উৎপাত নেই বললেই চলে। গত বছরও যেখানে দিনের বেলায় মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হতো এবার সেখানে রাতের বেলাতেও খুব বেশি মশা চোখে পড়ে না। কখনো দুই একটা আসে আবার কখনো তাও নেই। আগের মহল্লার চায়ের দোকানে বসা যেত না মশা নাক মুখ ঢুকে যেত এখন সেটা নেই। আমি চরম স্বস্তিতে আছি। এটা শুধু আমার কথা না আমার এলাকার আরো কয়েক জনের সাথে কথা বলেছি তারাও একই কথা বলেছেন।”

মশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, “আমরা গত বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার মশার প্রজনন মৌসুম থেকে মশার বংশ বিস্তার রোধের ওপর জোর দিয়েছি। আমরা দুই দফা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিয়েছি। শুধু তাই না আমরা পুরনো ওষুধ থেকে বেরিয়ে আসছি আমরা চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ অর্থাৎ উন্নতমানের কীটনাশক আমদানি করেছি। আমাদের এই কর্মসূচি বিশেষ কোনো সিজনে নয় সারাবছরব্যাপী চালু থাকবে। মানুষ যেন মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকতে পারে সেটাই আমাদের প্রচেষ্টা।”

ডিএনসিসির সদ্য সাবেক প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোমিনুর রহমান মামুন বার্তা২৪.কম-কে বলেন, “আমরা ফোর্থ জেনারেশন কীটনাশক এনেছি। আগামী সপ্তাহ থেকেই এই কীটনাশক প্রয়োগ শুরু হবে। ট্যাবলেট জাতীয় এই কীটনাশক ব্যবহারে ন্যুনত্যম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নেই। এটা কোথাও প্রয়োগ করলে অন্তত ২ থেকে ৩ মাস সেখানে মশার বংশবিস্তার হবে না।”

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বার্তা২৪.কম-কে বলেন, এবার সিটি করপোরেশনে যেমন শুরু থেকেই কাজ করেছে। তবে একটা জিনিস আপনাকে মনে রাখতে হবে অক্টোবর হচ্ছে মশার ‘অফ সিজন’। এই সময় মশার বংশ বিস্তার কম হয়। তাছাড়া এবার করোনার প্রভাবে মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন ও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সর্তক থাকায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে মানুষের ভেতর এক ধরণের ভীতি কাজ করেছে তাই মশা নিয়ন্ত্রণে এবার সফলতা দেখা যাচ্ছে। তবে এবার মশা কম বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে এর প্রভাব আরো ভয়ানক হবে।

মশা নিয়ন্ত্রণে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশারের পরার্মশ: কিউলেক্স মশা যেহেতু নভেম্বর থেকে বংশ বিস্তার শুরু করে তাই ওই সময়কে উপযুক্ত সময় ধরে কীটনাশক প্রয়োগ শুরু করতে হবে। অন্যদিকে এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধে মানুষকে বেশি বেশি করে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এপ্রিল থেকে সিটি করপোরেশনকে পরিপূর্ণ মনিটরিং চালু রাখতে হবে।”