আলু’র লম্ফঝম্প: ‘সরকার বলে ৩৫, বাজারে দেখি ৫০’!



মানসুরা চামেলী, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
আলু’র লম্ফঝম্প: ‘সরকার বলে ৩৫, বাজারে দেখি ৫০’!

আলু’র লম্ফঝম্প: ‘সরকার বলে ৩৫, বাজারে দেখি ৫০’!

  • Font increase
  • Font Decrease

‘হায়রে আলু, সরকার বলে ৩০ টাকায়, আবার কইল ৩৫, গাড়িগুলো নাকি ২৫ টাকা বেচবে। বাজারে দেখি ৪৫ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কোনটা বিশ্বাস করমু-বুঝি না। বাপের জন্মে শুনিনি আলুর এত দাম! জিনিসপত্রের দাম এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকছে যা চাইবে তাই দিতে হবে।’

রাজধানী ঢাকার নাগরিক মাহফুজুর রহমান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বাজারে আলুর দাম শুনে এভাবেই বলছিলেন কথাগুলো! তার সাথে গলা মিলিয়ে আরেক ক্রেতা বললেন, ‘হ্যাঁ- সব সবজির দাম বাড়লেও কখনও শুনি নাই আলুর এত দাম হয়। সুপার শপগুলো নাকি আলু কম দামে বিক্রি করে, কিন্তু ওখানে গেলেও শুনি আলু শেষ! বাজারে কয়েকদিন আগে আমি ৫৫ টাকা কেজি দরে কিনলাম।’


মধ্যবাড্ডা বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে আলুর লম্ফঝম্ফ নিয়ে এসব কথা শুনে  আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা আর কতক্ষণ চুপ থাকেন? তিনিও বলে উঠলেন, ‘আরে ভাই দাম কমতে দেরি আছে, আগে তো নতুন আলু আইতে হইবো বাজারে!’


গত কয়েকদিনে দ্রব্যমূল্যের আচমকা ও অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির জন্য নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষদের। উপার্জনের সঙ্গে বাজার খরচের সমন্বয় করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন তারা। তারই মধ্যে হু হু করে বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি আলুর দাম। প্রতি বছর বন্যা, সরবরাহ কম, আমদানি বন্ধ-এসবের দোহাই দিয়ে পণ্যের দাম বাড়লেও আলু ছিল স্থিতিশীল। তবে এ বছর আলু তার অতীতের সকল ভেঙে চড়া বাজারে স্থান করে নিয়েছে।

নামেমাত্র লাগানো হয়েছে দামের সাইনবোর্ড

আলু দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকারও দোলাচলবৃত্তির পরিচয় দিয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর আলুর দাম নিয়ন্ত্রণে  খুচরা বাজারে ৩০ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি করার নির্দেশনা দিয়েছে সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

তিনস্তরে আলুর দাম নির্ধারণের ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশে আলুর পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ৩০ টাকা বিক্রি করতে হবে। পাইকারি পর্যায়ে ২৫ টাকা আর হিমাগার পর্যায়ে কেজি ২৩ টাকা বিক্রি করতে হবে।

ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে পুনরায় আলুর দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ২০ অক্টোবর খুচরা বাজারে ৩৫ টাকা আলুর দাম নির্ধারণ করা হয় আর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে হয় প্রতি কেজি ২৭ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে কেজি ৩০ টাকা।

ক্রেতাদের অভিযোগ, ‘সরকার বলছে ৩৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি হবে, কিন্তু বাজারে তা হচ্ছে না। আবার টিসিবির গাড়ির পেঁয়াজও দীর্ঘলাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দুই ঘণ্টার পর ট্রাকের কাছে এসে শোনা যাচ্ছে পেঁয়াজ শেষ।’

বিক্রেতাদের দাবি, ‘আলুর সরবরাহ নেই, তাই সরকার দাম ধরে দিলেও তাদের কিছু করা নেই। এমনকি তারা পাইকারি বাজারে প্রশাসনের অভিযান ও জরিমানার ভয়ে আলু বাজারে আনছেন না। অনেক বাজার আলু শূন্য দেখা গেছে।’

রামপুরা বাজারের আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা আবদুল মজিদ মিয়া বলেন, ‘সরকার যাই বলুক, ৩০/৩৫ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব না। প্রশাসন বাজার তদারকি করে কিছু করতে পারবে না। কারণ, আলু এখন কৃষকের হাতে। সরবরাহ একবারেই কম।’

এদিকে, বেধে দেয়া দামে আলু না বেচলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সরকারের নির্দেশনায় মাঠে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন টিম। তবে নামেমাত্র বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তার অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর।


তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারের দ্রবমূল্যের এমন দৃশ্য দীর্ঘ অব্যবস্থাপনার ফল। সরকার যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ার ফলেই দিনদিন অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। মোট কথা- যদি কাউকে আইনের আওতায় না আনা হয় তখনই সংকট সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।


এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বার্তা২৪.কম’কে বলেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে দাম নির্ধারণ করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ সহজ নয়। সাধারণত আমরা জানি, যখন চাহিদা কম থাকে এবং সরবরাহ বেশি থাকে তখন পণ্যের দাম কমে। অপরদিকে, চাহিদা বেশি থাকলে সরবরাহ কম থাকলে মূল্য বাড়ে। এখন সাম্প্রতিকালে বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বন্যায় ফসলি জমির ক্ষতি কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ কমেছে। কিন্তু চাহিদা তো আর কমেনি, এ কারণে দাম বেড়েছে। যদিও সরকারি বলছে আলুর উৎপাদন অনেক বেশি। যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে আলুর দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্টের আলু বিক্রেতা

ক্যাব সভাপতি আরো বলেন, যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থাকে, তখন ব্যবসায়ীদের মধ্যে যেসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে সেগুলোরও দাম বাড়ানোর প্রবণতা থাকে। এর প্রেক্ষিতে সরকার পাইকারি ও খুচরা বাজারসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দুই একটি পণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু তারা কিছু শুনছে না।

এখন সরকারের করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে যেটা করতে হবে, যদি কোল্ড স্টোরে আলুর পর্যাপ্ত মজুত থেকে থাকে, তাহলে যারা এই মজুত করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। এর সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তখন মূল্য স্বাভাবিক হবে।

এদিকে আলু দামের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বার্তা২৪.কম’কে বলেন, আলুর বিষয়টি মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়ের। তারপরও আমরা আমাদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি দেখছি। ইতোমধ্যে টিসিবির মাধ্যমে ২৫ টাকা দরে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা আরো কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষি মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি দেখছে। আর আলুর দাম গতকালের (২২ অক্টোবর) তুলনায় কিছুটা কমেছে। আশা করি আগামী দুই তিনদেনর মধ্যেই অনেকটাই কমে যাবে, খুচরা বাজারে আলু ৩৫ টাকার নীচে নেমে আসবে।