কালুখালীতে ‘শক্তিশালী’ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন



মো. আকরাম হোসেন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কিছুদিন আগে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও যুবলীগ নেতা রবিউল হত্যা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলা। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের স্থানীয় রাজনীতিও বিরাজ করছে থমথমে উত্তাপ। তাছাড়া পদ্মার অববাহিকায় অবস্থিত এ অঞ্চলে এক সময়ে সক্রিয় ছিল সর্বহারা রাজনীতি।

কালুখালীতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন অনেক স্ট্রং বলে জানিয়েছেন কালুখালী থানার নবনিযুক্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির ব্রেক-ডাউন করতে সফল হয়েছে দাবি তার।

বর্তমানে আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি ও নানা পরিকল্পনা নিয়ে বার্তা২৪.কম- এর সঙ্গে কথা বলেছেন নবনিযুক্ত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মো. আকরাম হোসেন।

বার্তা২৪.কম: কালুখালী থানার অফিসার ইনচার্জ হয়ে কিছুদিন হয় এসেছেন। কালুখালীতে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

ওসি: আমি ২০০৩ সালে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে জয়েন করি। আমার মনে হয় সর্বোচ্চ দীর্ঘ সময় সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে কাটিয়েছি। মিরপুর মডেল থানা, চকবাজার মডেল থানা, ধানমন্ডি মডেল থানা, কেরানীগঞ্জ, সভারসহ প্রায় ১০টি মডেল থানায় আমি কাজ করেছি।

কালুখালী এসে আমার যেটা মনে হয়েছে তা হচ্ছে এখানে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন অনেক স্ট্রং (শক্তিশালী)। আমরা অবশ্য সে দুর্বৃত্তায়ন অনেকটা ব্রেক-ডাউন করে ফেলেছি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে আমরা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছি। এখানে মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক আছে যারা দলীয় নাম পদ-পদবী ব্যবহার করে শান্তির জনপদকে অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। আমি এখানে (কালুখালীতে) এসে বলেছি, সরকারদলীয় পদ-পদবি বলেন, বিরোধীদলীয় বলেন, ভিন্নমত বলেন, কোন মতাদর্শনের অনুসারীকেই কোনো ধরনের অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে দেব না।

এখন সাধারণ মানুষের সেবার মান উন্নয়ন করতে হবে। আমি অফিসার ইনচার্জ হিসেবে আমার ভিশন, মিশন মোটো হল, রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তি নিরাপত্তা, আইনের সুযোগ সুবিধা সেটা সমানতালে চলাব। এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে এমন কোন কাজ কাউকে করতে দেওয়া হবে না।

বার্তা২৪.কম: এখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দুটি গ্রুপ দৃশ্যমান হয়েছে। যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য আপনাদের পদক্ষেপ কি?

ওসি: যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমরা ক্যাপাবল। আমাদের সমস্ত সাপোর্ট আছে। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকতে পারে। সেসব যদি যুক্তিসংগত হয় তাহলে সে মতাদর্শনকে আমরা অবশ্যই সম্মান করবো। কিন্তু এই মতাদর্শ নিয়ে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। সেরকম কোন সুযোগ নাই।

বার্তা২৪.কম: এখানে (কালুখালীতে) কাজ করতে এসে কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন কি?

ওসি: আমি কোন সমস্যাকে সমস্যা মনে করি না। পুলিশের চাকরিতে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। সমস্যাকে ওভারকাম করা আমাদের কাজ। তাছাড়া আমার কাছে ঐ ধরনের কোন সমস্যা এখন পর্যন্ত নেই।

বার্তা২৪.কম: কিছুদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ সন্তান ও যুবলীগ নেতা রবিউল হত্যা সঙ্গে কালুখালী থানা পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ ব্যাপারে কি বলবেন?

ওসি: আমি এখানে জয়েন্ট করার আগে রবিউল হত্যাকান্ড ঘটে। আমি আসার পরে আমার সিনিয়র সহকর্মী ও থানা অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে আমি এ ব্যাপারে কথা বলেছি। আমি যতটুকু জানি এ হত্যাকাণ্ডের সাথে পুলিশের কোন সম্পৃক্ততা নেই। মানুষের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে পুলিশকে ভিকটিমাইজেশন করার। যে প্রবণতা থেকেই পুলিশের আজকে এই বদনামটা।

বার্তা২৪.কম: রবিউল হত্যার ঘটনায় কালুখালী থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়। তাহলে কি তাদের সাথে অন্যায় করা হয়েছে?

ওসি: বদলি তো আমাদের এখানে (পুলিশ বাহিনীতে) রুটিন মাফিক ঘটনা। এটা নিয়মিত হয়ে থাকে। যাদেরকে বদলি করা হয়েছে তাদেরকে ওই ঘটনার (রবিউল হত্যা) কারণে বদলি করা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। বদলিটা আমাদের নিয়মিত ঘটনা। আমি একটা জায়গায় ছিলাম, বদলি হয় এখানে এসেছি। কাল যদি আমার কর্তৃপক্ষ মনে করেন আমাকে এখানে রাখা সমুচিত হবে না অন্য কোন ইউনিটে বদলি করে দিবে।

বার্তা২৪.কম: রবিউল হত্যা মামলার সর্বশেষ আপডেট কী?

ওসি: এই হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রকৃত পক্ষে যারা জড়িত, এই ঘটনার যারা নায়ক তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ পর্যন্ত তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা শাখা তদন্ত করছে। অপরাধীকে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বার্তা২৪.কম: কালুখালীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পদ্মা নদী। যার ফলে এ অঞ্চলে একসময় সর্বহারা রাজনৈতিক সক্রিয় ছিল। এখন সে রাজনীতি কোন পর্যায়ে?

ওসি: শুধু এ অঞ্চলে না, আশির দশকে সর্বহারা রাজনৈতিক ব্যাপক দাপট ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় পাশের পাংশা থানার ওসি মিজান স্যারকে তারা হত্যা করেছে। পাশের আরেকটি থানা, সম্ভবত শ্রীনগর থানা নাম। সে থানা লুট হয়েছে। সর্বহারা রাজনীতি তখন যে দাপট বা শক্তি সামর্থ্য ছিল, তা এখন আর নাই। সর্বহারা, চরমপন্থী কিংবা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছিল তাদেরকে আলোর পথে আনার জন্য, তাদের কর্মকাণ্ড থেকে মূলস্রোতে নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাজ করেছেন। সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে ফিরে এসেছে। অনেকে এখনো বিপথে রয়ে গেছে। একজন সর্বহারার নেতা মুজিবুর রহমান মেছোকে কিছুদিন আগে গ্রেফতার করেছি। এখনো যারা সরকারের ডাকে সাড়া না দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য আমার ম্যাসেজ, তাদের ক্ষমতা থাকলে আমাকে মোকাবিলা করুক।

বার্তা২৪.কম: বর্তমানে কি তাদের তৎপরতা চোখে পড়েছে?

ওসি: না, তাদের কোন ধরনের তৎপরতা চোখে পড়েনি। চোখে তো পড়বেই না বরং আমরা গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে কেউ যদি কোনো অপকর্ম করার চেষ্টা করে কিংবা সরকারের ডাকে সাড়া না দিয়ে এখনো সক্রিয় থাকে অবশ্যই তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় আনব।

সাক্ষাৎকারে গল্প করছেন ওসি মাসুদুর রহমান ও আকরাম হোসেন। ছবি: বার্তা২৪.কম

বার্তা২৪.কম: অসংখ্য ভালো কাজের মধ্যেও কিছু বিতর্কিত কাজের কারণে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশ নিয়ে একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। সে ক্ষেত্রে কালুখালীবাসীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন কিনা?

ওসি: দু-একটি বিতর্কিত কাজ দিয়ে, বিতর্কিত লোক দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে মূল্যায়ন করা যাবে না। বাংলাদেশের পুলিশের মূল্যায়ন করতে চাইলে অবশ্যই ২ লক্ষ পুলিশের সেবা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ পুলিশ সর্ববৃহৎ একটি বাহিনী। একটা পরিবার। এই পরিবারের মধ্যে দু-একটা বিতর্কিত লোক থাকতে পারে। সেটা নিয়ে আমাদের পুলিশ বাহিনীকে মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই।দেশের দুই লক্ষ পুলিশের সেবাই যদি সাধারণ মানুষ আস্থা রাখে, মানুষ যদি সন্তুষ্ট হয়। আমার স্বার্থকতাটা এখানেই।

অবশ্য কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু রিঅ্যাক্ট আসে। সেটার জন্য ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা আছ, বিভাগীয় পানিশমেন্টের ব্যবস্থা আছে। এখানে প্রতিবছর বহু পুলিশ চাকরি হারায়, বিভিন্ন ধরনের পানিশমেন্টের আওতায় আসে। প্রমোশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, পদোন্নতি হচ্ছে না। পুলিশের অপরাধ করেও পার পাওয়ার সুযোগ নেই।

বার্তা২৪.কম: কোন বিষয়ের উপর সার্বাধিক গুরুত্ব দিবেন?

ওসি: আমি যোগদান করে (২৫ দিনে) এ পর্যন্ত মোট ৬টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি। বাল্যবিবাহ, নারী নির্যানতের মত ঘটনা কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া হবে না। এগুলা থামাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

প্রশ্ন: কালুখালীবাসীর উদ্দেশ্যে কি বলতে চান?

ওসি: কালুখালীবাসীকে একটা কথাই বলবো, আপনারা অন্যায় করবেন না। কোন অন্যায়কে বরদাস্ত করা হবে না। আমার দ্বারা তো বটেই আমার পুলিশের কোনো সদস্যের দ্বারা অন্যায় হবে না। আমার রুমে ঢোকার জন্য কারো অনুমতির দরকার হয় না, সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ যখন তখন প্রবেশ করতে পারে। আমার রুমের আগে এটা আমি লিখিতভাবে টানিয়ে দিয়েছি।

যে কেউ, যে কোনো মাধ্যমে আইনি সহযোগিতা চাওয়ার সাথে সাথে আমি প্রস্তুত রয়েছি। আপনারা আপনাদের সমস্যা নিয়ে সরাসরি থানায় আসুন। কোন দালাল শ্রেণীকে ধরবেন না। দালালরা যেমন আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে একইভাবে ভুক্তভোগীকে আরো বিপদে ফেলে। আমার থানায় জিডি বলেন, মামলা বলেন, অভিযোগ বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশন বলেন কাউকে একটা টাকাও চকলেট খাওয়ার জন্য নেয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্নই আসে না, কাউকে নিতেও দেওয়া হবে না।

আমি যোগদান করে পুলিশের অন্য সদস্যদের বলেছি। আমার এখানে ১০ টাকা পরিমাণও অবৈধ-অনৈতিক সুযোগ কেউ পাবে না।আমার পুলিশ সদস্যদরা যদি কারো কাছ থেকে একটা চকলেট খাওয়ার সুবিধা ভোগ করে তাহলে আপনার আমার কাছে আসেন। অভিযোগ দেন, যদি ঘটনার সত্যতা পাই তাহলে সেই পুলিশ সদস্যের সাথে আমার ব্যক্তিগত বোঝাপড়া আছে। আমার পুলিশ সদস্যকে সেভাবে নির্দেশ দেয়া আছে। জনগণের সেবা দিতে আসছি, সেবা দিয়ে যাবো।

বার্তা২৪.কম: সময় দেয়ার জন্য বার্তা২৪.কমের পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ওসি: আপনাকেও ধন্যবাদ।