সংসার চালাতে কাজের বুয়া, কখনো পিঠাওয়ালী পারভীন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাভার (ঢাকা)
শিশু সন্তান কোলে নিয়ে তাজরীনের সামনে তিনি।  ছবি: বার্তা২৪.কম

শিশু সন্তান কোলে নিয়ে তাজরীনের সামনে তিনি। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বিভীষিকাময় দিন ২৪ নভেম্বর। এই দিনে তাজরীনের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত হয়েছে অনেক পোশাক শ্রমিকের জীবন। আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে জীবন দিয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর ট্রাজেডি এটি। যারা বেঁচে ফিরেছেন তাদের অনেকের জীবনে সুখ নামের বস্তুটি যেন অধরাই। এমন দিনে কোনমতে বেঁচে ফিরেছেন পারভীন। আজ শিশু সন্তান কোলে নিয়েই তাজরীনের সামনে তিনি।

দেশের ইতিহাসে পোশাক শিল্পের বৃহত্তর দুটি কাল অধ্যায়ের ইতিহাস রচিত হয় এই সাভারেই। যার একটি রানা প্লাজা ট্রাজেডি অপরটি তাজরীন ট্রাজেডি। এই ট্রাজেডির শিকার হয়ে পারভীন সংসার টানছেন মানুষের বাসায় কাজ করে। শীত কাল আসলেই ফুটপাতে বসে পড়েন পিঠা বিক্রির জন্য। ভাঙ্গাগড়ার এই ৫ সদস্যের সংসারে তিনি কখনো বুয়া, কখনো ফুটপাতের পিঠা ব্যববসায়ী।

মঙ্গলবার (২৪ নভেম্বর) সকালে আগুনের চিহ্ন বহন করা সেই তাজরীন ফ্যাশনের সামনে গিয়ে দেখা যায়, পারভীন তার শিশু সন্তান কোলে নিয়ে এখনো দাবি আদায়ে দিচ্ছেন শ্লোগান। ‘আট বছর পার হলো খুনি দেলোয়ারের কি হলো, আট বছর পার হলো শ্রমিকরা কি পেলো’। তার দাবি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতি পূরণের। তাজরীনে কাজ করার বিনিময়ে আজ তিনি পথে বসেছেন। হারিয়েছেন কাজ করার ক্ষমতা। জীবন সাজাতে এসে পড়েছেন অথৈ সাগরে।

তাজরীনের আহত শ্রমিক পারভীন বার্তা২৪.কম’কে বলেন, আমি নেত্রকোনা থেকে সংসার সাজানোর জন্য নিশ্চিন্তপুর এলাকায় এসে চাকরি নেই তাজরীনে। ৪ তলায় হেলপার হিসাবে কাজ করছিলাম। ভালই চলছিলো সংসার, কিন্তু হঠাৎ তাজরীনের ধোয়ার ঝড়ে তছনছ হয়ে যায় সংসার। জীবনে সুখের খোঁজে এসে নেমেছি পথে। আজ আমি কখনও কাজের বুয়া, কখনও পিঠাওয়ালী।

আজকের এই দিনে আমি আধামরা হয়ে জীবন বাঁচাতে কোনমতে বাঁশের সাহায্যে নেমে আসি। হাত পুড়ে যায় আমার। এখন কোন কাজ করতে পারি না। গার্মেন্টসে চাকরি করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের প্রতিশ্রতি অনুযায়ী কোন ধরনের সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় নি। আমরা ন্যায্য দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করলেও কেউ দৃষ্টি দিচ্ছে না। আজ আমার শিশু সন্তান কোলে নিয়ে নামতে হয়েছে রাস্তায়। আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী ক্ষতিপূরণ দিলে আর শিশু সন্তান নিয়ে রাস্তায় নামতে হতো না। আজকের এই দিনে আমি ক্ষতিপূরণের দাবি জানাই।

আহত শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের দাবি তাজরীন ফ্যাশনের জায়গায় একটি হাসপাতাল নির্মান করে আহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত নতুবা শ্রমিকদের বসবাসের জন্য একটি আবাসন কেন্দ্র (ডরমিটরি) নির্মাণের।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বলেন, এরকম অনেক শ্রমিক আছে, যাদের সংসার চলে নিদারুন কষ্টে। সংসার টানতে অনেকেই শিশু সন্তান কোলে নিয়ে নেমেছেন রাস্তায় কিংবা কাজ করছেন মানুষের বাসায়। এদের প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানাই।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের এই দিনে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় ১১৩ জন পোশাক শ্রমিক। এসময় আহত হন অনেকেই। আহত ও নিহতদের বেশিরভাগ শ্রমিকই ছিল নারী পোশাক শ্রমিক। বেঁচে ফেরা শ্রমিকরা যাপন করছেন আজও অসহায়ত্বের জীবন।