কাপাসিয়ার রাজিব হত্যার রহস্য উদঘাটন, ঘাতক গ্রেফতার



মাহমুদুল হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, গাজীপুর
ক্যাপ পরা নিহত রাজিব, শীতের হুডি পরা ও মুখে দাঁড়ি ঘাতক শাহিন

ক্যাপ পরা নিহত রাজিব, শীতের হুডি পরা ও মুখে দাঁড়ি ঘাতক শাহিন

  • Font increase
  • Font Decrease

নয়দিন আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অচেনা ঘাতকের হাতে খুন হওয়া রাজিব হত্যার রহস্য উদঘাটন করে দোষী ব্যক্তিকে ৭ দিনের চেষ্টায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় রোববার (২০ ডিসেম্বর) ভোর ৫টায় নরসিংদীর চরসিন্দুর বাজার থেকে ঘাতক মো. শাহীন ইসলামকে (৩৪) গ্রেফতার করেন মামলার তদন্তকারী কাপাসিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আফজাল হোসাইন। তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে বিষয়টি বিলম্বে প্রকাশ করেছে পুলিশ।

গ্রেফতার শাহীন নরসিংদীর মনোহরদী থানার মধ্য চালাকচর এলাকার কুখ্যাত ডাকাত শহীদুল্লাহর ছেলে। ঘাতক শাহীন কাপাসিয়ার সাফাইশ্রীতে নানা আব্দুল রশিদের বাড়িতে প্রায় ১০ বছর ধরে বসবাস করে পুলিশের সোর্স হিসেবে নিয়োজিত। তার মা কাপাসিয়া থানায় রান্না ও পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন।

সে বাবার হাতে ডাকাতির দীক্ষা পেয়ে দীর্ঘসময় এ কাজে জড়িত ছিল। ২০০৯ সালের মে মাসে নরসিংদীর মনোহরদী থানায় তার বিরুদ্ধে একটি ডাকাতি মামলা (নম্বর-৪) হয়। যেটিতে ২০১৬ সালে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। এক বছর সাজা খেটে ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে শাহীন।

গত ১৩ ডিসেম্বর সকালে কাপাসিয়া সদর ইউনিয়নের সাফাইশ্রী এলাকার শ্রী শ্রী শ্মশান কালী মন্দির ও শ্রী শ্রী শিব মন্দিরের পশ্চিম পাশের কলা বাগানে এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ পাওয়া যায়। লাশের সন্ধান পাওয়ার প্রায় ৫ ঘণ্টা পর জানা যায় মরদেহটি সাফাইশ্রী এলাকার সুভাষ চন্দ্র ধরের ছেলে রাজিব ধরের (৩৩)। সে ইস্টার্ন ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় ড্রাইভারদের দেখাশোনা করতো। তিনি নিজেও একজন চালক ছিলেন। কয়েকমাস আগে চাকরি থেকে বরখাস্তের পর বাল্যবন্ধু শাহীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। যেই বন্ধুর হাতে অবশেষে তাকে প্রাণ দিতে হলো।

রাজিবের লাশের সন্ধান পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে সাফাইশ্রী এলাকার শত শত লোক গিয়ে তাকে চিনেও কেউ পুলিশের কাছে তার পরিচয় বলেনি। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

লাশ উদ্ধারের পরদিন ১৪ ডিসেম্বর নিহত রাজিবের মা প্রতিভা রাণী ধর অজ্ঞাত লোকদের আসামি করে থানায় হত্যা মামলা (নম্বর- ১০) দায়ের করেন। এরপর ছায়া তদন্তে নামে থানা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও র‌্যাব। সব সংস্থা হত্যার রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হলেও ক্লু-লেস মামলাটি আলোর মুখ দেখায় তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আফজাল হোসাইন। তিনি ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতকের মুখ থেকে বের করেন হত্যার প্রকৃত কারণ ও স্বীকারোক্তি।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও ঘাতক শাহিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর নিজের গ্রামে ফিরে নেশায় জড়িয়ে যায় নিহত রাজিব। নেশার সূত্রে ঘাতক শাহিন ও রাজিবের মধ্যে ঘনিষ্ঠার পর নিজ ও পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে তাদের আধিপত্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দৈনিক ২০-২৫ বার ফোনে যোগাযোগ হতো দুজনের। তারা এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ছিল। অন্যদের মেরে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদক ও টাকা কেড়ে নিত। তাদের দলের আরেক সদস্যের নাম তুহিন। এই তিন জনের সমন্বয়ে এলাকায় একটি বেনামি গ্যাং তৈরি হয়। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ও বদমেজাজি শাহীনের নিত্যদিনের কাজই ছিল নানা অপরাধ। সে পুলিশের সোর্স থাকার সুবাধে অপর দুই সহযোগীকে নিয়ে এলাকায় অপরাধের রাজত্ব কায়েম করে। তারা এলাকার নিরীহ মানুষ ও মাদক ব্যবসায়ীদের পুলিশী হয়রানিতে ফেলে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিত। এমনকি পুলিশের ভয় দেখিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ ও মাদক কেড়ে নিত। তারা খুবই হিংস্র প্রকৃতির ও পুলিশের সোর্স হওয়ায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না।

সম্প্রতি শাহিনের সমস্ত অপকর্ম রাজিবের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ভাটা পড়ে শাহিনের রাজত্বে। সেই সঙ্গে ফাটল ধরে দীর্ঘদিনের বন্ধুতে। এ জন্য বেশ ক্ষুব্ধ ছিল শাহীন। বিষয়টি ভাবনার বাইরে ছিল রাজিবের। অন্যদিকে শাহিনের আপন ছোট ভাই ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায় রাজিবের। ওসমানও বড় ভাইয়ের মতোই হিংস্র এবং একই স্বভাবের। ওসমান ও রাজিব প্রতিনিয়ত এক সঙ্গে গাঁজা, ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি নানা অপকর্ম শুরু করে। নিজের বন্ধু ছোট ভাইয়ের নেশার পার্টনার; এটি মানতে পারছিল না শাহিন। এ নিয়ে অপর সহযোগী তুহিনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজিবকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় শাহিন। পুনরায় রাজিবের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির চেষ্টা চালায় শাহিন।

পরিকল্পনা মতো গত ১১ ডিসেম্বর দিনভর রাজিবের সঙ্গে সময় কাটিয়ে হোটেলে খাবার খেয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায় শাহিন। সেই ঘরের কক্ষে ছিল শাহীনের আরেক সহযোগী বাসু। যার জন্য দু’জন বাইরে থেকে খাবার পার্সেল করে নিয়ে যায়। অল্পক্ষণ আড্ডা দিয়ে রাজিব নিজের বাড়িতে চলে যায়। আর রাত সাড়ে ১২টার দিকে শীতলক্ষ্যা পাড়ের সাফা-মারওয়া জেনারেল হাসপাতালের ঘাটে গিয়ে রাম দা ধার দিতে থাকে শাহিন। দা ধারানোর শব্দ পেয়ে শাহিনের কাছে এগিয়ে যায় স্থানীয় তন্ময়, পবিত্র ও সুমন। তখন সুমন দা ধারানোর কারণ শাহিনের কাছে জানতে চাইলে তিনজনকেই ধারাল দা উঁচিয়ে শাহিন বলে আমি যেখানে আছি সেখানে কোন সাহসে তোরা আসিস। ভয় পেয়ে তিনজন ফিরে গিয়ে পবিত্রর দোকানের সামনে থেকে সাফাইশ্রীতে যার যার বাড়িতে যেতে রিকশায় উঠে। তখন হাতে দা ও ব্লেড কাটার নিয়ে পেছন থেকে ছুটে এসে রিকশা থামায় শাহিন। তাদের রিকশায় চড়ে রাজিবের বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে নামে শাহিন।

এরপর রাজিবের কক্ষের জানালায় টোকা দিয়ে তাকে ডাক দেয় শাহিন। জানালা খুললে রাজিবকে গাঁজা ও ইয়াবা দেখিয়ে শাহিন বলে খাবি নাকি? রাজিব সম্মতি দিলে শাহিন বলে চল মন্দিরে গিয়ে মাল খাই। এরপর দুজন মন্দিরের দিকে হাঁটতে থাকে। শাহিনের হাতে ধারাল দা দেখেও কোনো সন্দেহ করেনি রাজিব। কারণ শাহিনের কাছে বড় একটি দা আছে এটি সবাই জানত। আর যখনই সে মন্দিরে যায় এটি সঙ্গে থাকে। এ জন্য রাজিব কিছু মনে করেনি। পথে শাহিন একাধিকবার রাজিবকে বলেছে মন্দিরে নিয়ে তোকে মেরে ফেলব। রাজিব বিষয়টি আমলে না নিয়ে জবাবে বলে তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমাকে কোনোদিনই মারবি না জানি।

কথায় কথায় সেখানে পৌঁছে মন্দিরের পেছনে বসে তুহিনের কাছ থেকে নেওয়া ইয়াবা দু’জন সেবন করে। এরপর সেবন করে গাঁজা। নেশা করা শেষে রাত পৌনে ২টার দিকে কলা বাগান (ঘটনাস্থল) দিয়ে ফেরার কথা বলে শাহিন। এরপর রাজিব আগে ও পেছনে শাহিন হাঁটতে শুরু করে। কলা বাগানে নেমেই দা দিয়ে কোপ দিয়ে একটি কলা গাছ মাটিতে ফেলে দেয় শাহিন। শব্দ পেয়ে রাজিব ফিরে তাকালে তার ঘাড়ে প্রথমে কোপ দেয় শাহিন। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে উপর্যপুরি এলোপাথারি রাজিবকে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে শাহিন। এরপর দ্বি-খণ্ডিত কলা গাছের মোথাটিতে পর পর দুটি কোপ দিয়ে দায়ের রক্ত পরিষ্কার করে শাহিন। এরপর রাত সোয়া ২টার দিকে ঘটনাস্থলের পশ্চিমে লাল মিয়ার ধানের খোলা দিয়ে যেতে থাকে শাহিন। ধানের খোলায় বসবাস করা কাশেম ও তার স্ত্রী রাতের ওই সময়ে বাইরে প্রস্রাব করতে বের হয়। এতো রাতে কাউকে যেতে দেখে স্বামী-স্ত্রী ভয় পেয়ে দ্রুত ঘরে চলে যায়। বিষয়টি লক্ষ্য করে কাশেমের দরজায় কড়া নাড়ে শাহিন। শাহিন কাশেমকে জিজ্ঞেস করে তোর বাড়ি কোথায়। ময়মনসিংহ জানালে জবাবে শাহিন বলে দেখ হাতে রক্তমাখা দা। মন্দিরে একজনকে খুন করে এসেছি। তোরা আমাকে যেতে দেখেছিস। ঘটনার কোনো সাক্ষী রাখা ঠিক হবে না। তোদেরও খুন করবো।

এ কথা বলার পর ভয়ে কাশেম ও তার স্ত্রী শাহিনের পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চায়। কাকুতি-মিনতি করার পর শাহিন কাশেমকে তার রক্তমাখা দা ও পা ধুয়ে দিতে বলে। পরে কাশেম এসব ধুয়ে দিলে শাহিন সোজা চলে যায় উপজেলা সরকারি খাদ্য গোদামের গোডাউনের পেছনে। সেখানে থাকা ময়লার স্তুপে দাঁড়িয়ে শরীরে থাকা জাঙ্গিয়া বাদে রক্তমাখা সমস্ত কাপড় ও হত্যায় ব্যবহৃত দা নদীতে ফেলে দেয়। এরপর জাঙ্গিয়া পরিহিত অবস্থায় থানার পাশ্ববর্তী সাফা-মারওয়া জেনারেল হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে ইয়াবা সেবন করে এই পোশাকেই পাখিডাকা ভোরে নিজের ঘরে ফেরে শাহিন। তখন ঘরে অবস্থান করা বাসু শাহিনকে বলে তোর এই অবস্থা কেন? ধমকের সুরে শাহিন বাসুকে বলে চুপচাপ ঘুমা। এরপর শাহিন শুয়ে পড়ে এবং বিকেল ৩টায় ঘুম থেকে উঠে। হত্যাকাণ্ডের একদিন পর ১৩ ডিসেম্বর সকালে মরদেহের সন্ধান মেলে এবং লাশের পরিচয় সনাক্তের খবর পেয়েই পালিয়ে যায় শাহিন।

এ বিষয়ে মামলার ও কাপাসিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আফজাল হোসাইন বার্তা২৪.কমকে বলেন, একেবারে তুচ্ছ কারণে রাজিবকে খুন করেছে শাহিন। চরসিন্দুর বাজারের এক নৈশপ্রহরীর সঙ্গে শাহিন বসে ছিল। সেখান থেকে শাহিনের মায়ের সাহায্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে শাহিন দোষ স্বীকার করেছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারের পর শাহিনকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। কিন্তু নদীতে ডুবুরী নামিয়েও হত্যায় ব্যবহৃত দা ও আলামত উদ্ধার করা যায়নি। চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সোমবার (২১ ডিসেম্বর) সকালে ১৬৪ ধারায় শাহিনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করতে গাজীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হবে। একই সঙ্গে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে। পুলিশ মাত্র ৭ দিনে ক্লু-লেস মামলাটিকে আলোর মুখ দেখিয়েছে। হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।