‘ছয় পোলাপান লইয়া ছাপড়ার নিচে ঘুমাইতাম’



মো. রফিকুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম, মাদারীপুর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘ছয়ডা পোলাপান লইয়া ছাপড়ার নিচে থাকতাম। মাঝে ছন আর কলাপাতা দিয়ে ঘর বানইতো আমার পোলারা। খুব কষ্ট হইতো ঘরে থাকতে। আশপাশে ঠাডা (বজ্রপাত) পড়লে পরাণে পানি থাকতো না। আইজ শেখের বেটি আমাগো দিকে চাইছে, আল্লাহ তারে বাঁচাই রাখুক’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপহার পাকা ঘর পেয়ে আবেগাপ্লুতো হয়ে এসব কথা বলেন শিবচর উপজেলার নলগোড়া এলাকার মৃত কালাই খাঁর স্ত্রী আলেকজান (৬৫)। মুজিববর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় আকেজানকে পাক ঘর দেওয়া হয়েছে।

শনিবার (২৩ জানুয়ারি) গণভবন থেকে সারাদেশে একযোগে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব বাড়ি হস্তান্তরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় শিবচর উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৪৪ জন সুবিধাভোগীর হাতে ঘর ও জমির দলিল তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ঘরের দলিল হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুতো হয়ে আলেকজান বলেন, ‘নিজের জমি না থাকায় যুদ্ধের পরের বছর পোলাপন লইয়া ঢাহায় (ঢাকা) যাই।সেখানে খুব কষ্ট করি। হোটেল আর বাসাবাড়ির বাসন পরিস্কারের কাজ করছি। আমার ছয় সন্তানকে রেখে স্বামী ৪০ বছর আগে মারা গেছে। তারপর ঢাকায় থাকতে না পেরে ৪০ বছর ধইরা শিবচরের ফিরোজ খানগো বাড়িতে কাজ করছি। তাদের বাড়ি সব কাজ করি। তাদের বুড়া বাপ-মায়ের সেবা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টির সময় ভাঙা ঘরে থাকতাম। ঠাডা গইরালে (বিদ্যুৎ চমকালে) পরানে পানি থাকতো না। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন ও ত্রিপলের চাদরে ঢেকে রাখা তাঁবু বানিয়ে থাকছি। যে বাড়িতে কাজ করি তাগো বাড়ি থেকে কাপড়ে পেঁচিয়ে অগো (নিজের সন্তান) জন্য ভাত নিয়ে আসতাম। খুব কষ্ট করছি বাবা (সাংবাদিককে)। আল্লায় শেখ হাসিনারে বাচাঁইয়া রাখুক, তার কারণেই আজ পাকা ঘর পাইছি (পেয়েছি)।’

প্রধানমন্ত্রীর উপহার গ্রহণ করছেন আলেকজান
প্রধানমন্ত্রীর উপহার গ্রহণ করছেন আলেকজান

আলেকজান বলেন, ‘আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে বিয়ে দিছি। আর চার ছেলের কেউ কৃষিকাজ, কেউ ড্রাইভার। আমার এক পোলা প্রতিবন্ধীও। একসময় ছেলেদের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছিলাম। ওরা বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। এখন ওদের সংসার হইছে। নাতি নাতনিদের নিয়ে ওরা আলাদা হয়ে গেছে। কেউ আমার খোঁজ রাখে না। তাই আমি অন্যের বাড়ি কাজ করে খাই। নিজের ঘর ছিল না। একটি ছাপড়ার নিচে ঘুমাইতাম। এতোদিন পর আজ ঘর পেয়ে ভালই লাগছে। এই শেষ বয়সে এসে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘর পেয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা হলো। আজকের পর থেকে আর ছাপড়ার নিচে থাকতে হবে না।’

জানা গেছে, মাদারীপুর জেলায় প্রথম ধাপে ৯৮৮টি ঘর বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৬টি ঘরের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, যা শনিবার গৃহ ও ভূমিহীন ১৪৬টি পরিবারের মধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শিবচর উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তার দফতর থেকে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ‘নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় শিবচরে ২৬৬টি ঘর বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এদের মধ্য উপজেলা নিলখী, বহেরাতলা দক্ষিণ, সন্নাসীরচর ও কুতুবপুর ইউনিয়নে ৪৪টি ঘরের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার এই ৪৪ জন ঘরের মালিকের কাছে তাদের দলিল হস্তান্তর করা হয়।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘শিবচরের ৪৪টি পরিবারের কাছে কবুলিয়ত ও অন্যান্য কাগজপত্র তুলে দিয়েছি। বাকি ঘরগুলোর কাজও চলমান। পর্যায়ক্রমে তাদেরকেও ঘর বুজিয়ে দেওয়া হবে।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- মাদারীপুর জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক আজহারুল ইসলাম, উপজেলা চেয়ারম্যান আ. লতিফ মোল্লা, পৌর মেয়র আওলাদ হোসেন খান, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিএম আতাউর রহমা, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাহিমা আক্তার, উপজেলা বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা।