ভবিষ্যৎ বাণী দিতেন দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত বাবা হুজুর!



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, বগুড়া
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বগুড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত মোজাফফর হোসেন (৬০) ওরফে বাবা হুজুর খুনের নেপথ্যে নানা ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকাশ্যে দিনের বেলা মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশা থামিয়ে চালকসহ আরও ৫ জন যাত্রীর সামনে বুকে গুলি করে তাকে খুন করা হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে এই খুনের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে পুলিশ প্রশাসনকে।

খুনের নেপথ্যে কি রহস্য, কারা প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে তাকে খুন করলো? এসব ক্লু উদঘাটনে ইতিমধ্যে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক টীম। মোজাফ্ফর হোসেনের পার্শ্বে বসে থাকা যাত্রী আজিজুল হকের বর্ণনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ড যে পূর্বপরিকল্পিত তা স্পষ্ট। তিনি জানান, মহাসড়কের পার্শ্বে মোটরসাইকেল নিয়ে দুই যুবক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। ওই স্থানে সড়কে গর্ত থাকায় অটোরিকশার চালক গতি কমায়। এসময় এক যুুুবক সামনে দাঁড়ালে অটোরিকশা থামায় চালক। তাৎক্ষণিক অপর যুবক অটোরিকশার বাম পার্শ্বে বসে থাকা মোজাফফর হোসেনকে কাছ থেকে বুক লক্ষ্য করে গুলি করে। অন্য যাত্রীরা কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা মোটরসাইকেল যোগে নন্দীগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। দুই যুবকের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস এবং মাথায় টুপি ছিল।

এদিকে অনুসন্ধানে মোজাফফর হোসেন সম্পর্কে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের তথ্য।

নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার সুকাশ গ্রামের বাসিন্দা মোজাফফর বগুড়া শহরের নিশিন্দারা কারবালা এলাকায় বসবাস করেন দীর্ঘদিন ধরে। তার প্রথম স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে থাকলেও তিনি ২য় স্ত্রী ও এক শিশু কন্যাকে সাথে নিয়ে বগুড়ায় বসবাস করতেন। এলাকায় তাকে সবাই চেনেন বাবা হুজুর নামে। তিনি জ্বিনে ধরা রোগীকে ঝাড়ফুঁক দিয়ে জ্বিন ছাড়াতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করতেন।

২০১৪ সালে নিশিন্দারা ফকির উদ্দিন স্কুলের পার্শ্বে একটি ভাড়া বাড়িতে আল জামিয়া আল আরাবিয়া দারুল হেদায়া কওমি হাফেজিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই মাদরাসার তিনি ছিলেন পরিচালক। তবে করোনার কারণে এক বছর আগে মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে মাদরাসার কার্যক্রম বন্ধ হলেও তিনি সেখানে নিয়মিত বসতেন। এলাকার লোকজন তার কাছে তেমন না গেলেও, দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিনই অংসখ্য মানুষ আসতো জ্বিন ছাড়ানোর চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ বাণী শোনার জন্য।

এছাড়াও ৩-৪ বছর আগে থেকে যুবক বয়সীদের আনাগোনা ছিল বাবা হুজুরের আস্তানায়। বাবা হুজুর আইপিএল খেলায় কোন দেশ বা দল জিতবে তা আগাম বলে দিতেন বলে স্থানীয়রা জানায়। যারা আইপিএল জুয়া খেলতো তারাই মুলতঃ বাবা হুজুরের কাছে আসতেন ভবিষ্যৎ বাণী শোনার জন্য। এসব করেই বাবা হুজুর তার গ্রামের বাড়িতে ৮ -১০ বিঘা জমি কিনেছেন কয়েক বছরে ব্যবধানে। গ্রামের বাড়ি এবং শহরে দুইটি সংসার চালাতেন এই পেশার মাধ্যমেই। নিহত মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে বাবা হুজুরের চাচাতো বোন তহমিনা জানান, তার ভাইয়ের ১ম পক্ষের একটি মেয়ে বিয়ে হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। গ্রামে বসবাসরত তিন ভাইদের সাথে তার সম্পর্ক বেশ ভালো। অপর তিন ভাইদের জমি বেশি না থাকলেও এই ভাই অনেক জমি কিনেছেন।

তিনি বলেন, তাকে মেরে ফেলার মত গ্রামে কোন শত্রু নাই। ধান কাটার কারণে তার ২য় স্ত্রীও গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। মাদরাসা সংলগ্ন রূপসী লেডিস টেইলার্সের রেজাউল করিম কিরন, মাহী স্টোরের আব্দুল করিমসহ স্থানীয় লোকজন বলেন, বাবা হুজুরের কাছে প্রতিদিনই লোকজন আসতো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। তবে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, আইপিএল খেলা নিয়ে ভবিষ্যৎ বাণী করা নিয়ে বাবা হুজুরের সাথে এরুলিয়ার দুই যুবকের বিরোধ হয়েছিল। বাবা হুজুরের কথায় আইপিএল জুয়া খেলে তারা কয়েক লাখ টাকা খুইয়েছিলেন। পরে চারমাথা এলাকার এক নেতা সেই বিরোধ নিস্পত্তি করে দেন। কয়েক দিন আগে থেকে আবারও সেই দুুুই যুবককে বাবা হুজুরের আস্তানায় যাতায়াত করতে দেখা যেত। স্থানীয় রিকশা চালক বাবু জানান, সোমবার বেলা ১২টার দিকে বাবা হুজুর মাদরাসা থেকে তাররিকশাতেই চারামাথা যান। এরপর সেখান থেকে গ্রামের বাড়িতে যান। যাওয়ার সময় বাবুকে বলেছিলেন পরদিন সকালেই বগুড়ায় ফিরবেন।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা বার্তা২৪.কম-কে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। তার দুই স্ত্রী ও পারিবারিক বিষয়, অর্থনৈতিক লেনদেন ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুলিশ কাজ শুরু করেছে।