সংক্রমণের চূড়ায় রাজশাহী



ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
সংক্রমণের চূড়ায় রাজশাহী

সংক্রমণের চূড়ায় রাজশাহী

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজশাহীতে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট সংক্রমণের চূড়ায় অবস্থান করছে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

জেলায় এখন প্রতিদিন নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে গড়ে ৪০ শতাংশ নমুনায় করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মিলছে। আপাতত এটিই সর্বোচ্চ সংক্রমণ বলে ধরে নিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদার বলেন, করোনার প্রথম ধাক্কা এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে অবস্থা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে রাজশাহীতে এখন সংক্রমণের পিক চলছে। কয়েকদিনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সংক্রমণের হার ৪০ শতাংশ। এর বেশি হচ্ছে না। সুতরাং একে সংক্রমণের চূড়া হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

তিনি বলেন, এখন লকডাউন চলছে। লকডাউনটা ১৪ দিন পূর্ণ হলে আশা করছি সংক্রমণ কমে আসবে। লকডাউন দেয়া না হলে সংক্রমণ আরও বাড়ত। এখন আমরা চাই সংক্রমণটা যেন আর না বাড়ে। সে জন্য কঠোর লকডাউনটা বাস্তবায়ন করতে হবে। সেভাবেই কাজ হচ্ছে।

তবে রাজশাহীর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. চিন্ময় কান্তি দাস মনে করেন, সামাজিক সংক্রমণের হার নির্ণয়ে স্বাস্থ্য বিভাগে যে তথ্য আছে তা পর্যাপ্ত নয়। তাছাড়া নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। সে কারণে সংক্রমণ নিয়ে যেকোনো অনুমান বা ধারণা যথাযথ নাও হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

গত ১১ জুন রাজশাহীতে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হয়। সেদিন জেলায় মোট নমুনা পরীক্ষা হয় ১ হাজার ৬৮৮টি। শনাক্ত হন ৩৩৯ জন। র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট, আরটি-পিসিআর ও জিন এক্সপার্ট মিলে শনাক্তের গড় হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। শুধু আরটিপিসিআর পরীক্ষায় আক্রান্তের হার ৩৮ শতাংশ। ১২ জুন জেলায় নমুনা পরীক্ষা হয় ৯৩৮টি। শনাক্ত ১৯৫ জন। শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এদিন শুধু আরটিপিসিআর পরীক্ষায় আক্রান্তের হার ৩৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

১৩ জুন জেলায় মোট নমুনা পরীক্ষা হয় ১ হাজার ৫২৬টি। মোট শনাক্ত ৩৬৮ জন। শনাক্তের হার ২৪ দশমিক ১২ শতাংশ। পিসিআর নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের হার ৫৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ১৪ জুন মোট নমুনা পরীক্ষা হয় ১ হাজার ৫৪৯টি। মোট শনাক্ত ৩০৮ জন। শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। আর শুধু আরটিপিসিআর নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের হার ৪১.১৭ শতাংশ। এছাড়া ১৫ জুন মোট নমুনা পরীক্ষা হয় ১ হাজার ৮৫৪টি। শনাক্ত হয় ৩৫৩ জন। শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর আরটিপিসিআর নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের হার ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ১৬ জুন শুধু পিসিআর ল্যাবে সংক্রমণের হার ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা পিসিআর ল্যাবের টেস্টকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, লকডাউনের পর সংক্রমণ এখনও কমেনি। রাজশাহীতে লকডাউনটা আরও অন্তত ১৫ দিন আগে দেয়া উচিত ছিলো। লকডাউনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কিনা সেই তথ্য আমরা পাবো লকডাউন শুরুর ১৪ দিন পর থেকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গেই রাজশাহীর লকডাউন দরকার ছিলো। কিন্তু আমের কথা বলে লকডাউন দেয়া হলো না। সেখানেই ক্ষতিটা হয়ে গেছে। তখন লকডাউন হলে সুফল এখন দেখতে পারতাম। তাহলে সেক্ষেত্রে সংক্রমণের এমন ভয়াবহ চিত্র দেখতে হতো না।

তিনি আরও বলেন, এখন পিকে উঠেছে কি না সেটা জেনে লাভ নেই। তবে এখনও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সুযোগ আছে। এ জন্য সর্বাত্মক লকডাউনটা যেন ভালোভাবে বাস্তবায়ন হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

শহরে লকডাউন চললেও গ্রামে মানুষ এখনও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হারে উপজেলা পর্যায়ের মানুষের অনুপাত একেবারেই কম নয়। বরং সংখ্যাটি উদ্বেগজনক। কিন্তু গ্রামের মানুষ এখনও সচেতন হচ্ছেন না।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানিয়েছেন, করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট পৌঁছে গেছে রাজশাহীর গ্রামে গ্রামে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে অচিরেই দ্রুত শুরু হতে পারে সামাজিক সংক্রমণ। গত কয়েকদিন প্রান্তিক পর্যায়ের এমন রোগী পেয়েছেন যা আগে কখনও পাননি। প্রান্তিক এসব মানুষের সংক্রমণের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসপাতাল পরিচালক বলছেন, গ্রামে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা বেশিরভাগই দিন আনে দিন খায়। উর্পাজনে করেই তাদের সংসার চলে।

তিনি বলেন, গ্রামের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে শুধু অন্ধ বিশ্বাস আর ভ্রান্ত ধারণা থেকে।

শামীম ইয়াজদানী বলেন, গত বছর করোনায় প্রান্তিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু সেটি সংখ্যায় খুব কম। তার বিপরীতে অনেক ধনী মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী মারা গিয়েছিলেন।

এ থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষ ভুল একটা শিক্ষা নিয়েছেন যে এটা ধনীদের রোগ, গরিবের নয়।

সম্প্রতি রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি দেখে গেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল। তারা বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে।

কর্মকর্তারা বলেছিলেন, টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে কয়েকগুণ, বিশেষ করে যতটা পারা যায় প্রান্তিক বা উপজেলা পর্যায়ে বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু রাজশাহীর জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে ঠিক মতো টেস্ট হচ্ছে না। ফলে আক্রান্তদের পুরোপুরি আইসোলেশনে আনা যাচ্ছে না। গ্রামকে গ্রাম ধরে টেস্ট করলেই বোঝা যাবে আক্রান্তদের আসল সংখ্যাটা আমরা যা দেখছি তার থেকে অনেক বেশি।

চিন্ময় কান্তি বলেন, যেভাবে শহর থেকে গ্রামে করোনা পৌঁছেছে তা থেকে বাঁচার একমাত্র পথ টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। সেই সঙ্গে সবাইকে পরতে হবে মাস্ক, মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি।