বাড়ছে আক্রান্ত-মৃত্যু, ব্যক্তি সচেতনতার অভাবেই বিপর্যয়ের শঙ্কা!



মানসুরা চামেলী, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পরছে না মাস্ক, মানছে না স্বাস্থ্যবিধি

পরছে না মাস্ক, মানছে না স্বাস্থ্যবিধি

  • Font increase
  • Font Decrease

মৌচাক মার্কেট, বেশ ভিড়! সামাজিক দূরত্বের ধারের কাছেও নেই কেউ-ই। কারো মুখে মাস্ক, কারো থুতুনিতে, কেউ মাস্ক পরার ঝামেলায় জড়াননি। করোনার ঊর্ধ্বগামী সংক্রমণে ভিড় ঠেলে বাচ্চার জন্য কাপড় কিনছেন রাহাত। কাপড়ের স্তুপ থেকে ভালোটা বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। ক্রেতা রাহাতের মুখেও মাস্ক নেই, বিক্রেতারও একই অবস্থা। দুইজনের দূরত্ব এক হাতও না!

মাস্ক পরেননি কেন জানতে চাইলেই, উত্তরে অস্বস্তি বোধ করছিলেন রাহাত। তবে প্রশ্ন কেড়ে নিয়ে উত্তরটা অনেকটা খেঁকিয়ে উঠার মতো করে দিলেন বিক্রেতা। ‘আরে আপা ধুরহ, ঝামেলা বাড়ায়েন না। গরমে বাঁচি না আর মাস্ক; আল্লায় দেখবে!

এবার কথা হলো এক রিকশাওয়ালার সঙ্গে। রিকশায় উঠে হ্যান্ডলে রাখা মাস্ক দেখিয়ে বললাম 'মামা, মাস্কটা পরেন'- প্রত্যুত্তরে রিকশাচালক জানালেন ‘পরি তো, গরমে খুলে রাখছিলাম’।

রিকশাওয়ালা-যাত্রী কারও মুখে নেই মাস্ক

গুলশান থেকে রামপুরা গন্তব্য। এখানেও যথারীতি সিএনজি অটোরিকশা চালকের মুখে মাস্ক নেই। চালককে মাস্ক পরতে বলতেই ‘তড়িঘড়ি করে একটা মাস্ক পরে নিলেন। যেটা ময়লায় কালো হয়ে আছে’।

গুলিস্তানে দুই যুবক রিকশায় উঠলেন, রিকশাচালকও মাস্ক ছাড়া। দুই যুবকেরও মাস্ক নেই। মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে বলেন উঠেন, ‘করোনা আর কই, হলে হইবে- মাস্ক পরে থাকা যায় নাকি!’

দেশে আবারও বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই রোগী, শনাক্তের হার ও মৃত্যুতে আগের দিনের রেকর্ড ভাঙছে। এরপরও স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক পরা নিয়ে ব্যক্তি সচেতনতার এই বেহাল দশা দেশে।

গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১৬.৩৮ শতাংশে পৌঁছে গেছে। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে এরইমধ্যে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলার অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। জেলায় জেলায় চলছে লকডাউন, বিধিনিষেধ। রাজধানী ঢাকার দিকে ধেয়ে আসছে সংক্রমণের নতুন ঢেউ। জনবহুল এই নগরীতে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাজারে সামাজিক দূরত্ব মানার কোন বালাই নেই

করোনার এমন ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণেও মাস্ক ব্যবহারে মানুষের মধ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানা তো ছেড়েই দিয়েছেন। সরকারের দফায় দফায় জারি করা নির্দেশনার তোয়াক্কা করছেন না তারা। বর্তমানে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হার ইঙ্গিত দিচ্ছে, সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার। তাই মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মানার ঢিলেঢালা ভাব করোনা সংক্রমণকে আরও তীব্র করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী সামনের দিনগুলোতে দেশে করোনার সংক্রমণ আরও বাড়তে থাকবে। বিধি নিষেধ থাকলেও তা মানা বা মানানোর কোন প্রবণতা দেখছি না। তাছাড়া মানুষ মাস্কও পরছেন না। আবার ঈদ আসছে সেটাও সংক্রমণ ছড়ানোর বড় কারণ হতে পারে। সব মিলে সামনে খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলায় করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। এসব জেলায় পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার সর্বোচ্চ ৫৩ শতাংশ থেকে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ সাতক্ষীরায়, ৫৩ শতাংশ। এর পরপরই সর্বোচ্চ সংক্রমিত জেলার মধ্যে রয়েছে ঠাকুরগাঁও ৫০ দশমিক ৪১ শতাংশ; যশোরে ৪৯ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, বাগেরহাটে৪২ দশমিক ৪৬ শতাংশ, কুষ্টিয়ায় ৪১ শতাংশ ও মেহেরপুরে ৪০ শতাংশ ও ফরিদপুরে ৩২ শতাংশ সংক্রমণ। 

আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বলছে, আসলে সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে সচেতন হতে হবে। জীবনটা তো আমাদের। সবার নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাস্ক পরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করা উচিত। কারণ সবার সহযোগিতা না পেলে আইন প্রয়োগ সব সময় কাজ হয় না। আমরা চেষ্টা করছি ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে মানুষকে সচেতনতার পাশাপাশি জরিমানাও শাস্তি দিয়ে বিষয়গুলো বোঝানোর।

গণপরিবহনের যাত্রীদের সামাজিক দূরত্ব মানার ইচ্ছা থাকলেও নেই সুযোগ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পরিচালক শামসুল হক বলেন, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রথমে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ছাড়ালেও এখন ঢাকা অর্থাৎ কেন্দ্রের দিকে ধেয়ে আসছে। এ অবস্থা আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে আমি সবাইকে বলব ঈদে কোন অবস্থাতে বাড়ি না যেতে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বার্তা২৪.কমকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি সামনে কোন দিকে যাবে- তা ভ্যারিয়েন্ট না- এর সংক্রমণের হারের ওপর নির্ভর করবে। এখন পর্যন্ত আমরা চারটি ভ্যারিয়েন্টের নাম বেশি শুনছি। কিন্তু সারা বিশ্বে ১০০ এর বেশি ভাইরাসের মিউটেশন হয়েছে। সব ভ্যারিয়েন্ট কিন্তু খুব ক্ষতিকর না। আমাদের এখানে এখন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বাড়ছে, এখন ঢাকার দিকেও আসছে। তবে আগামী দুই সপ্তাহে সংক্রমণ পরিস্থিতি বোঝা যাবে। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে সামনে কমে আসতে পারে। আবার ঢাকা বাড়তে পারে।

তবে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন বিকল্প নেই বলে জানান আইইডিসিআর এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।

‘আমাদের এখানে বিধি-নিষেধ চলছে। সরকার জেলায় জেলায় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। অনেক জেলায় কড়া বিধিনিষেধ চলছে। ঢাকায় মাঝে সংক্রমণ কমায় সবাই স্বাধীন হয়ে গেছে ভাবছেন। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব মানা ও মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছেন। করোনা মিউটেশন হতেই থাকবে কিন্তু আমরা ব্যক্তিগতভাবে সচেতন না হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি ঠেকানো যাবে না। সবাই জানে করোনায় আক্রান্ত হলে জীবনও চলে যেতে পারে। তারপরও মানুষ সচেতন না। করোনা থেকে বাঁচতে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। আর টিকা নিতে হবে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে -টিকা করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে অন্যতম মাধ্যম একমাত্র না।'- যোগ করেন তিনি।

করোনা থেকে বাঁচতে টিকা নিচ্ছেন সচেতন নাগরিক

জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাহাতুন নাঈম ম্যাগলিন বলেন, এবার সেকেন্ড ওয়েবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ডেল্ডা ভ্যারিয়েন্ট কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকা ছড়িয়েছে বেশি। যেমন যশোর, সাতক্ষীরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এরপর রাজশাহী, নওগাঁ এবং ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে আসছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত গবেষণায় মোট সংক্রমণের মধ্যে ৮০ শতাংশ পাওয়া যাচ্ছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। আমরা যদি সতর্ক না হই সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করবে। অন্যদিকে ভারতে কিন্তু এখন ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে- এটা আরও বেশি সংক্রমণ ছড়ায়। 

সমাজের অসচেতনতায় শিশুরা মানছে না স্বাস্থ্যবিধি

তিনি আরও বলেন, যখন ভাইরাসের নতুন মিউটেশন হয় তখন কিন্তু আগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। অনেক সময় কাজ করে না। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক পরা ছাড়া আমাদের হাতে কোন বিকল্প নেই।