‘জয়’ নামটা বাবার দেয়া আর ‘সজিব’ আমার মায়ের দেয়া: প্রধানমন্ত্রী



সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

  • Font increase
  • Font Decrease

পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় এর জন্মদিনে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি সব সময় আব্বার হাতের নখ কেটে দিতাম। আমি যখন হাতের নখ কাটছি তখন আব্বা আমাকে বলল হ্যাঁ কেটে দে আর কাটার সুযোগ পাবি কি না জানি না। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমি তখন সন্তান সম্ভাব্য। আমাকে বলছে তোর ছেলে হবে। সেই ছেলে স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করবে। কাজেই তার নাম জয় রাখবি। ১৯৭১ সালে জয় যখন জন্মগ্রহণ করে জয় এর নামটা আমার আব্বার দেওয়া, তাই জয় নাম রেখেছিলাম। আর যেহেতু বন্দিখানার মধ্যে আমাদের জন্য তো আনন্দের কিছু ছিল না। আমার মা বললেন যে জয় আসার পর অন্তত একটা কাজ পেলাম। আমরা যেন একটু সজিব হলাম, সেজন্য সজিব নামটা কিন্তু আমার মায়ের দেওয়া। সেই নামটা আমার মা দিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭০ সালে যখন নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি করবে না সেটা নিয়ে বাংলাদেশের অনেক দল, অনেক নেতা আপত্তি জানিয়েছিল অনেক কথা বলেছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন আগে নির্বাচনটা হোক, জনগণ তাদের ম্যানডেটটা দেক কে তাদের নেতৃত্ব দেবে। সেটা সব থেকে বেশি প্রয়োজন। তাই মার্শাল ’ল’র মধ্যে যেসব শর্ত ছিল সেই শর্ত থাকা সত্ত্বেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচন করে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা কখনই এটা ভাবতে পারে নাই যে আওয়ামী লীগ এতো শক্তিশালী সংগঠন, যে গোটা পাকিস্তানের শাসনভার নিয়ে নিতে পারে। তাই তারা আর ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আমাদের ওপর গণহত্যা শুরু করে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় বন্দি করে রাখে।

তিনি বলেন, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস। সাধারণ আমি ছোট বেলা থেকে দেখেছি ওই দিন সমগ্র দেশের বাড়িতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাকিস্তানি পতাকা তোলা হতো। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ কোথাও পাকিস্তানি পতাকা কিন্তু তোলা হয়নি। একমাত্র রাষ্ট্রপতি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ঢাকায় ছিল সে যেখানে থাকত সেই জায়গা ছাড়া আর ক্যাটনমেন্ট ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানি পতাকা ছিল না। সমগ্র বাংলাদেশে তখন বাংলাদেশের পতাকা। এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতেও সেই পতাকা তোলা হয়। বঙ্গবন্ধু যখন পতাকাটা তুলে আসেন। আমি সব সময় আব্বার হাতের নখ কেটে দিতাম। আমি যখন হাতের নখ কাটছি তখন আব্বা আমাকে বলল হ্যাঁ কেটে দে আর কাটার সুযোগ পাবি কি না জানি না। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমি তখন সন্তান সম্ভাব্য। আমাকে বলছে তোর ছেলে হবে সেই ছেলে স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করবে। কাজেই তার নাম জয় রাখবি।

পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বন্দি করে রেখেছিল। আমি যখন হাসপাতালে সব সময় আমার দরজার সামনে পাহাড়া দিতো। তবে আমাদের যারা মুক্তিযোদ্ধারা ছিল আমি হাসপাতালে তারা আমার সঙ্গে গোপনে দেখা করতে আসত। কিন্তু ওরা পাহাড়ায় থাকায় দেখা করতে আসতে পারে না। একদিন আমার সুযোগ হল যেদিন জয় হয়েছে তারপর দিন কবি সুফিয়া কামাল তিনি গেছেন আমাকে দেখতে। সাথে সেকান্দার আবু জাফরের স্ত্রী তিনিও গিয়েছিলেন। ওনারা যেভাবেই হোক ফাঁকে আমার কেবিনে ঢুকে পড়েন সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেই সেনা সদস্য এসে দরজা খুলে ওনাদের সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করে এবং বের করে দেয়। সেটা দেখে আমার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে যায়। আমি বের হয়ে এসে ধমক দেই আমি বললাম তুমি ঢুকলা কেন? আমার রুমে নক না করে ঢুকলা কেন? বলে এরকম আসছে তাই আমি বলেছি সেটা তো তোমার ব্যাপার না ‍তুমি অনুমতি না নিয়ে এভাবে আসতে পার না। আমি ফের ধমক দিয়ে বললাম তুমি যদি এভাবে আস আমি মুক্তিযোদ্ধা ডেকে তোমার লাশ ফেলে রাখব। আমি রাগে এই ধমক দিলাম। ও সত্যি ভয় পেল তারপর থেকে আর আর রুমের সামনে দাঁড়াতো না। কেউ আসলে বলতো কিতনা রুমে জায়েগ্গে? আমার কেবিনে বললে আর ঢুকতে দিত না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যেদিন জয় হল তারপর দিন আমার খাবার দিতে দেয়নি। আমি ধমক দিয়েছি যার জন্য সারাদিন অভুক্ত ছিলাম। আমার আয়াকে আসতে দেয়নি। আমার জন্য পানির ব্যবস্থা কোন কিছু করতে দেয়নি। যদিও আমার ছোট ফুফু আমার সাথে লুকিয়ে থাকতেন। এই অবস্থার মধ্যে জয় এর জন্ম। আবার যখন বন্দিখানায় ফিরে আসি সেদিন এক কর্নেল আসল। আমি জয় কে কোলে নিয়ে দাঁড়ানো ছিলাম জানালার সিক এর কাছে। আমি এ পাশে আর্মির কর্নেল ওপাশে সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ওরা জানে যে আমরা নাম রেখেছি। আমাকে জিজ্ঞেস করে তোমার ছেলে হয়েছে নাম কি? আমি বললাম নাম জয়, কিসকা মতলত ক্যায়া হায়। আমি বললাম জয় মানে জয়, জয় মানে ভিক্টরি, জয় মানে আনন্দ। যখন বলছি জয় মানে ভিক্টরি তখন ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল ও ঘুরে চলে যাওয়ার সময় বলছে অনেক নমরুদ পয়দা হোয়া। কত জঘন্য ৭ দিনের একটা বাচ্চা গালি দিতে দিতে যাচ্ছে। ‍ওদের অ্যাটিটিউড কি ছিল সেটাই দেখালো। তবে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা সব সময় সক্রিয় ছিল। যখন জয় জন্ম নেয় ঠিক ওই সময় ওরা খবর পেত। সাথে সাথে তারা কতগুলো বোমা ফাটায় তাতে আবার পাওয়ার স্টেশন উড়ে যায় সাথে সাথে হাসপাতাল অন্ধকার হয়ে যায়। যখনই জয় হলো সাথে সাথে কতগুলো বোমা ফাটালো। মানে ওরা যে আছে। আমাদের বন্দিখানায় এরকম অবস্থা ছিল যদি সন্ধ্যার পরে কোন বোমা না ফুটতো কোন গুলির আওয়াজ না আসত মনে হতো আমরা নাই মরে গেছি। হলে ভাবতাম না মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের আশাপাশে আছে। ওটাই আমাদের প্রাণ শক্তি ছিল। ওটা আমাদের একটা বেঁচে থাকার সুযোগ দিতো। আওয়াজ শুনলেই বুঝতাম মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের পাশেই আছে। সেই রকম একটা পরিবেশে জয় এর জন্ম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাপড় ছিল না। ওই হাসপাতালে কোন মত একটা কাপড় পেচিয়ে জয় কে আমার কাছে দেয়। আমার এক বান্ধবী দিনারা হক ওর বোনের অপারেশন হয়েছিল। ও ওখানে দেখতে আসত। ও অন্তঃসত্ত্বা ছিল ও বাচ্চার জন্য কাপড় বানিয়ে রেখেছিল। ছোট একটা বোতলে একটু মধু আর ওই কাপড়গুলো সেখানে দিয়ে একটা নার্সের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়। সেই কাপড় পরিয়ে জয়কে নিয়ে আসি।