আমার খালি পা, দুঃসহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

তিনি দেশটাকে এতোটাই ভালোবাসতেন, কখনো স্যান্ডেল পরেননি। তাতে নাকি যে মাটিতে নিজের ছেলেদের শেষ স্থান হয়েছে সেই মাটিকে অসম্মান করা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কারণে দুই সন্তান হারানো এবং পরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সর্ব কনিষ্ঠ সন্তানের স্মরণে আমৃত্যু খালি পায়ে হেঁটেছেন তিনি।

তিনি বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ আমার কাঁধে ঝোলা দিয়েছে। আমার খালি পা, দুঃসহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান। আমার ভিতর অনেক জ্বালা, অনেক দুঃখ। আমি মুখে বলতে না পারি, কালি দিয়ে লিখে যাব। আমি নিজেই একাত্তরের জননী।

তিনি একাত্তরের জননী, মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক রমা চৌধুরী। আজ ১৪ অক্টোবর তার জন্মদিন। ১৯৪১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)।

রমা চৌধুরী ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিংবদন্তিতুল্য এ মহীয়সী নারী জীবনভর কৃচ্ছ সাধনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে রমা চৌধুরী মুখোমুখি হন জীবনের সময়ের। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সম্ভ্রম হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিটেমাটি ও নিজের সাহিত্যকর্ম চোখের সামনে আগুনে পুড়ে যেতে দেখেন তিনি। সব হারিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই কোলের সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় সংগ্রাম। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের আগে এক সন্তান আর বিজয়ের কিছুদিন পরে আরেক সন্তান অনাদর, অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। পরে সংসার জীবনে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আরেক সন্তানও দুঘর্টনায় মারা যায়। তিন সন্তানকেই তিনি মাটিতে সমাহিত করেছেন।

রমা চৌধুরী নিজের চেষ্টায় নিজের লেখা ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশ ও ফেরি করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ ও নিজের সন্তানদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয় গড়ার প্রচেষ্টায় দিনাতিপাত করে গেছেন। সারাজীবন সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রমা চৌধুরীর জীবনপ্রবাহ এখন দেশে-বিদেশে গবেষণার বিষয়। তাকে নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ডকুমেন্টারি, গল্প, উপন্যাস, নাটক রচিত হয়েছে। রমা চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘একাত্তরের জননী’ মুক্তিযুদ্ধের এক মহান দলিল। রমা চৌধুরী ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।