দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ের ভিক্ষার টাকায় চলে সংসার!



ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কল্পনা খাতুন। বয়স সবেমাত্র ১৬ বছর। চোখের দৃষ্টি না থাকলেও মনের দৃষ্টি দিয়ে পরিবারের বাস্তবতাকে কল্পনা করে পরিবারের সদস্যদের জন্য দু'মুঠো খাবার জোগাড় করতে তাকে নামতে হয়েছে ভিক্ষাবৃত্তির কাজে। তার ভিক্ষার টাকা এখন সংসারের আয়ের অন্যতম বড় মাধ্যম।

বলছি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের উত্তর সিতাইঝাড় গ্রামের বাসিন্দা শারীরিক প্রতিবন্ধী আশরাফ আলীর (৬০) কন্যা কল্পনা খাতুনের কথা।

অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে মোটামুটিভাবে দিন অতিবাহিত করে আসছিল আশরাফ ও আঞ্জু দম্পতি। এরই মধ্যে বিয়ের দুই বছর পর স্ত্রী আঞ্জু বেগমের কোল জুড়ে আসে প্রথম কন্যা সন্তান আলপিনা বেগম (২৮)। তাকে নিয়েই সুখে দিন কাটছিল ওই দম্পতির।আলপিনা বেগমের বয়স যখন বারো বছর, তখন জন্ম নেয় দ্বিতীয় কন্যা সন্তান কল্পনা খাতুন (১৬)। ওই বছরই আশরাফ আলী দিনমজুরের কাজ করতে গিয়ে হঠাৎই প্যারালাইজডে আক্রান্ত হলে তার ডান হাত ও ডান পা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শুরু হয় অন্ধকারে অনিশ্চয়তার পথচলা।

অসুস্থ স্বামী ও দুই কন্যা শিশুকে নিয়ে বিপাকে পড়েন স্ত্রী আঞ্জু বেগম। নিরুপায় হয়ে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার খরচ ও পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণ যোগাতে স্ত্রী আঞ্জু বেগম নবজাতক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যা শিশু কল্পনা খাতুনকে কোলে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন ভিক্ষা বৃত্তিতে। এদিকে দ্বিতীয় কন্যা শিশু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কল্পনা খাতুনের বয়সের দুই বছর মাথায় স্ত্রী আঞ্জু বেগম একমাত্র ছেলে সন্তান আতাউলকে (১৪) জন্ম দেন। এতে করে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে পাঁচজন হলে অভাব অটনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে শুরু করে পাঁচ সদস্যের পরিবারের।

ভিক্ষার টাকায় অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় অন্যদিকে সন্তানদের ভরণ পোষণ নিয়ে এক দুর্বিষহ জীবন শুরু হয় স্ত্রী আঞ্জু বেগমের। একদিকে অভাব অনটন অন্যদিকে প্রথম কন্যা সন্তান বড় হওয়ায় সমাজের কথা চিন্তা করে তার বিয়ে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়েন ওই দম্পতি। উপায়ান্তর না পেয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু কল্পনাকে অবলম্বন করে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভিক্ষা বৃত্তিতে ছুটে চলেন স্ত্রী আঞ্জু বেগম। কয়েক বছরের ভিক্ষার টাকার কিছু অংশ মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখেন আঞ্জু বেগম। পরে দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার একটি সম্বন্ধ আসলে চল্লিশ হাজার টাকার যৌতুক নির্ধারণ করে প্রথম মেয়ে আলপিনার বিয়ের দিন তারিখ ধার্য হয়। কিন্তু যাদের খাবার যোগাড় করাই দুষ্কর তারা কিভাবে চল্লিশ হাজার টাকা ম্যানেজ করবেন তা নিয়ে তারা হয়ে পড়েন দিশেহারা। বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কিছু টাকা সাহায্য হিসেবে পেয়ে ভিক্ষার জমানো টাকা মিলে পঁচিশ হাজার টাকা ম্যানেজ করতে সক্ষম হন তারা। পরে পাত্র পক্ষকে বুঝিয়ে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা হস্তান্তরের মাধ্যমে অবশিষ্ট টাকা পরে দেবেন জানিয়ে মেয়ের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। কিন্তু অবশিষ্ট টাকা এখন পর্যন্ত দিতে না পারায় মেয়েকে তার স্বামীর বাড়িতে হতে হচ্ছে নির্যাতনের শিকার।

অপরদিকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যা কল্পনা খাতুনের একটি ভাতার কার্ডের জন্য মা আঞ্জু বেগম দীর্ঘদিন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারের বাড়িতে ধর্না দেন। দীর্ঘদিন ঘুরেও মেম্বার ও চেয়ারম্যানের সাড়া না পেয়ে নিরুপায় হয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী আশরাফ আলী তার মেয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কন্যার ভিক্ষা করে জমানো ১৫০০ টাকা দিলে চেয়ারম্যান তাৎক্ষণিক ভাতার কার্ডের বন্দোবস্ত করে দেন। এবং কল্পনা তার ভাতার টাকার প্রথম কিস্তি উত্তোলনের সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য সেখান থেকে এক হাজার টাকা কেটে নেন। গত ৫-৬ মাস আগে স্থানীয় এক ব্যক্তির সহযোগিতায় ভাতার কার্ড পান শারীরিক প্রতিবন্ধী আশরাফ আলী। কিন্তু বাবা ও মেয়ের সামান্য ভাতার টাকায় আশরাফ আলীর চিকিৎসার ব্যয়, একমাত্র ছেলে আতাউলের লেখাপড়ার খরচসহ সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না স্ত্রী আঞ্জু বেগমের পক্ষে। তাই দুবেলা দু মুঠো ভাতের জন্য ১৬ বছর বয়সী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ে কল্পনা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে আজও অবধি আঞ্জু বেগম চালিয়ে যাচ্ছেন ভিক্ষা বৃত্তি।

স্থানীয় গৃহবধু আপিয়া ও মমিনা জানায়, দীর্ঘদিন থেকে আশরাফ আলী প্যারালাইজড হয়ে পড়ে থাকায় তার স্ত্রী আঞ্জু বেগম তার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে সাথে নিয়ে ভিক্ষা করে আসছেন। সারা দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে সামান্য ভিক্ষা পান তা দিয়ে সংসার চালানোই সম্ভব হয় না। কিভাবে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা করাবেন? মেম্বার, চেয়ারম্যানও এই পরিবারকে সহযোগিতা করে না।

তারা বলেন, এই পরিবারটিকে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে সহযোগিতা করা উচিত।

আশরাফ আলীর স্ত্রী আঞ্জু বেগম জানান, আমার স্বামী একজন পঙ্গু মানুষ। তাই কোন কাজকর্ম করতে পারেন না। আনুমানিক ১৬ বছর ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কন্যা কল্পনা খাতুনকে সাথে নিয়ে ভিক্ষা করে আসছি। আমার একমাত্র ছেলে আতাউল স্কুলে পড়ে। তার পড়ালেখার খরচ যোগাতে পারি না। বসতবাড়ি ছাড়া আমাদের কোন আবাদি জমি কিংবা কোন সহায় সম্পদ নেই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করে বেড়াই। কেউ ভিক্ষা দেন, কেউ দেন না। ৪-৫ সদস্যের পরিবারে একবেলা ভাত জুটলেও আরেক বেলা জোটে না।

তিনি বলেন, ভাত না জোটায় অনেক সময়ই আমরা না খেয়ে দিন অতিবাহিত করি। আমরা মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছ থেকে কোন সহায়তা পাই না। তাই আমি আমার অসুস্থ স্বামী ও সন্তানদের জন্য সরকারের নিকট সাহায্য চাই।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কল্পনা খাতুন জানান, আমি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। আমার প্রতিবন্ধী ভাতা হয়েছে। আমার বাবাও একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় উপার্জন করতে পারেন না। তাই ছোট বেলা থেকেই মায়ের সাথে ভিক্ষা করে ভিক্ষার টাকায় সংসার চালিয়ে আসছি। আমি এখন বড় হয়েছি। ভিক্ষা করতে লজ্জা লাগে। যেহেতু আমাকে একদিন বিয়ে সাদি করতে হবে। তাই আমার পরিবার যদি সরকারি সহায়তা পান তাহলে আমি ভিক্ষা বৃত্তি ছেড়ে দেব।

প্রতিবন্ধী ভাতার বিষয়ে কল্পনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য দীর্ঘদিন আমি ও আমার পরিবার মেম্বার-চেয়ারম্যানের বাড়িতে ধর্না দিয়েও কোন সাড়া পাইনি। উনাদের আচরণে ধারণা হয়েছে টাকা ছাড়া ভাতা মিলবে না। পরে আমার বাবা নিরুপায় হয়ে ভিক্ষা করে জমানো ১৫০০ টাকা চেয়ারম্যানকে দিলে দ্রুত প্রতিবন্ধী ভাতার বন্দোবস্ত করে দেন। একইভাবে ভাতার প্রথম কিস্তি উত্তোলনের সময় স্থানীয় ইউপি সদস্য ১০০০ টাকা নেন।

প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড বাবদ ১৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে, পাঁচগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটা মিথ্যা কথা। পুরো পাঁচগাছি ইউনিয়নে আমার নামে এমন কোন ক্লেইম (বদনাম) নেই।

একইভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা উত্তোলনের সময় ১০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমি টাকা নেয়নি। সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই ইউপি সদস্য বলেন, ওই পরিবারকে আমরা ভিজিডি কার্ড ও রেশন কার্ড দিয়েছি তারা সেই সুবিধা ভোগ করছে। তবুও তারা যদি আরও কিছু চান, তাহলে তা আমরা কোথা থেকে এনে দেব বলেন! পরে তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে ফোন রেখে দেন।