বরিশালের পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের অভাব

জহির রায়হান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, বরিশাল
ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারার হাট, ছবি: সংগৃহীত

ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারার হাট, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নিজস্ব সংস্কৃতিতে ভরপুর বিভাগের নাম বরিশাল। মনীষী, দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক ও দেশ বরেণ্য রাজনীতিবিদরাও জন্মগ্রহণ করেছেন এই জনপদে। এখানে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে অগণিত ঐতিহাসিক আর দর্শনীয় স্থান।

এছাড়াও এই বিভাগে রয়েছে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। যা দেখে ১৯৭৩ সালের ১লা জানুয়ারি বরিশাল নগরীর তৎকালীন বেলেস্ পার্কে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু উদ্যান) দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি জনসভায় বলেছিলেন বরিশালের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে আধুনিকমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর পরে বরিশালের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকতার স্বপ্নপূরণ আর বাস্তবায়ন আস্তে আস্তে থমকে যায়। এরপরও পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যৌবনে বিদেশি পর্যটকদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্র এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা, রাত্রীযাপন, খাওয়া-দাওয়ার অব্যবস্থাপনাসহ স্থানীয়দের অসহযোগিতা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনে দিনে কমতে শুরু করেছে পর্যটকদের আনাগোনা।

বরিশালের বিশ্লেষকরা বলছেন, বরিশালের পর্যটনকেন্দ্র আর দর্শনীয় স্থানগুলো পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাব, উন্নয়ন কাজে সরকারের উদাসীনতা আর স্থানীয়দের রুক্ষ আচরণের কারণেই দেশ-বিদেশি পর্যটকরা স্থানগুলোতে আসতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন না। যার ফলে দিনে দিনে কমে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায়। তবে কিছু কিছু পর্যটনকেন্দ্রে সৃজনভিত্তিক চাহিদা রয়েছে এখনো। কুয়াকাটা, ঝালকাঠির ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারার হাট ও বরিশালের লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য সাতলার বিল অন্যতম।

বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব এস এম ইকবাল বার্তাটোয়েন্টিফোর. কমকে বলেন, বরিশালের পর্যটন বা দর্শনীয় স্থানগুলো আধুনিক করার লক্ষে উন্নয়ন কাজে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয়দেরও সার্বিক সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করি। আর শিক্ষা সফরে যদি শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে বরিশালের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নিয়ে যায় তাহলে অনেকাংশেই কেন্দ্রগুলোর আরো প্রচারণা বৃদ্ধি পাবে বলেও আশা করেন তিনি।

বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজল ঘোষ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎতের পরে বরিশালের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন কাজ ধীরে ধীরে থেমে যায়। পরবর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও আমরা তা বাস্তবায়ন দেখিনি। সভা সেমিনারের মধ্যেই ছিল উন্নয়ন কাজ। তবে বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ পর্যটন স্থানগুলোকে আধুনিক করার লক্ষে উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করলে পর্যটন শিল্প তাঁর পূর্ণ যৌবন ফিরে পাবে। একই সাথে বাড়বে দেশ-বিদেশি পর্যটকদেরও সংখ্যা।

বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বার্তাটোয়েন্টিফোর. কমকে বলেন, বরিশাল ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্মেলিত দর্শনীয় স্থান আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আধুনিক ও পর্যটনমুখী করার লক্ষে বর্তমান সরকার বিভিন্ন যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ইতিমধ্যে অনেক পর্যটনকেন্দ্রে কাজ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন তা দৃঢ়তার সাথে তদারকি ও বাস্তবায়ন করছে। বাকি পর্যটনকেন্দ্র গুলোর উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ চেয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

বিশেষ করে উজিরপুরের সাঁতলা গ্রামের শাপলার বিল এলাকায় পর্যটনমুখী করার লক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। পর্যটকদের সুবিধার্থে রেস্ট হাউজ নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতি, স্থানীয়দের বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ ও শাপলা সংরক্ষণে বিলে মাছ চাষ করা বন্ধে মৎস্যজীবদের সাথে বৈঠক করা হয়েছে ।

তিনি আরো বলেন, দূর্গাসাগর দীঘির মানোন্নয়ন আরও দৃষ্টিনন্দন করতে অনেক উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে । আরও উন্নয়ন কাজে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে বরিশাল জেলাজুড়ে দর্শনীয় স্থানগুলো সংস্কার ও আধুনিক করার লক্ষে উন্নয়ন কাজ শুরু হবে। এর মধ্যে শেরে-বাংলা জাদুঘর (চাখার), লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, গুঠিয়া মসজিদ এলাকা, উলানিয়া জমিদার বাড়ি, জীবনানন্দ দাশ এর বাড়ি, আরজ আলী মাতব্বরের বাড়ি, বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেলস পার্ক) সহ বাকি দর্শনীয় স্থানগুলোকেও সংস্কার করা হবে।

যা দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হবে সরকারের পাশাপাশি সমাজিক উদ্যোগ গ্রহণ আর উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে।

বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জাকারিয়া বার্তাটোয়েন্টিফোর. কমকে বলেন, বরিশালের পর্যটনকেন্দ্রগুলো অনেক পুরানো। এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীর পাশাপাশি বিদেশি অনেক পর্যটকরা আসত। তবে দিনে দিনে পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা, মানসম্মত খাবারের অভাব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে পর্যটকরা আগের তুলনায় কম আসছে।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের আসা-যাওয়া, সার্বিক নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষে সরকার অনেক উন্নয়ন কাজ হাতে নিয়েছে। এসব উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন হলেই আবার পর্যটন এলাকাগুলোতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাবে।

এদিকে কয়েক'শ বছরের পুরানো ঝালকাঠির ভিমরুলি খালের মোহনায় গড়ে ওঠা ভাসমান পেয়ারার হাট এলাকায় নেই কোন পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা। ফলে বিদেশি পর্যটকরা আসে না বলেই চলে। আবার দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসলেও স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা বখাটেদের বখাটেপনা আর মাত্রারিক্ত গানবাজনায় অতিষ্ঠ তারা।

এছাড়াও সাগর কন্যা সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটায়ও একই চিত্র। তবে এখানে বিলাসবহুল ভবন থাকলেও নেই কোন বাসস্ট্যান্ড। এছাড়াও মানসম্মত খাওয়া-দাওয়ার অব্যবস্থাপনা, স্থানীয়দের আন্তরিকতার অভাবে দিনে দিনে কমে যাচ্ছে পর্যটকদের আসা-যাওয়ার সংখ্যা। তবে বিভিন্ন উৎসবে কুয়াকাটায় উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়।

আপনার মতামত লিখুন :