অস্তিত্ব সংকটে জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি

জহির রায়হান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, বরিশাল
কবি জীবনানন্দ দাশ, ছবি: সংগৃহীত

কবি জীবনানন্দ দাশ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলে সুপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম রূপসী আর আধুনিক বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। বরিশাল জুড়ে অন্যান্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে বিভিন্ন স্থাপনা থাকলেও জীবনানন্দ দাশের নামে নেই কোনও উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। আর যেটুকু আছে সেটা পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটাপন্ন।

অভিযোগ আছে, জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের ব্যক্তিরাও এগিয়ে আসছেন না।

জানা গেছে, বরিশাল নগরীর বগুড়া রোড এলাকায় কবি জীবনানন্দ দাশের মূল জন্মভিটা দখল হয়ে গেছে। তবে সেখানে কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি রক্ষার্থে অল্প জায়গা জুড়ে দুইতলা বিশিষ্ট মিলনায়তন ও পাঠাগার ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের সামনের দেয়ালে তার ছবিসহ স্মৃতি ফলকও নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও কবির নামে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে হল, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে মুক্ত মঞ্চসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, কবি জীবনানন্দ দাশ বরিশালকে বিশ্বের বুকে পরিচয় করে দিলেও বরিশালবাসী তাকে যথার্থ মূল্যায়ন করেনি। কবির মৃত্যুর ৬৫ বছরেও বরিশালে আজও তার নামে কোনও স্থাপনা বা ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়নি।

ঝালকাঠির সাংবাদিক ও লেখক পলাশ রায় জানান, কবির লেখা কবিতায় ঝালকাঠির ধানসিঁড়ি নদীর কথা লেখা থাকলেও নাব্যতা সংকটে নদীর অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। যা দেখে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা হতাশ হন। ঝালকাঠিতেও কবির নামে কোনও স্থাপনা নির্মাণে সরকারের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র পাঠচক্র বরিশালের সমন্বয়কারী বাহাউদ্দিন গোলাপ জানান, দুঃখজনক হলেও সত্য এই শহরে জীবনানন্দের বসতভিটাটুকুও সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ প্রশাসন।

বরিশালের কবি ও লেখক হেনরী স্বপন জানান, দেশ-বিদেশে সর্বত্র যখন কবি জীবনানন্দ দাশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে তখন বরিশালে কবি’র গ্রহণযোগ্যতা কমতে শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় কবি’র জন্মভিটাও আজ বেদখল। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর জন্মভিটায় তার নামে একটি মিলনায়তন ও পাঠাগার নির্মাণ করা হয়েছে। তবে পাঠাগারে কবি’র লেখা সব বই সংরক্ষণ নেই। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো যে স্মৃতি আছে তা সঠিকভাবে ব্যবহার আর সংরক্ষণ হচ্ছে না। বরিশাল শহরের বসবাসরত মানুষের অবহেলা আর অগ্রহণযোগ্যতায় কবি জীবননান্দ দাশের স্মৃতির অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন।

তিনি আরও জানান, তরুণ প্রজন্মের কাছে তার স্মৃতি তুলে ধরতে বরিশাল শহরে কবি’র বাড়ি ঘিরে বহুতল ভবন নির্মাণ, নিবিড় অরণ্য স্থান, পুকুর কেটে চারপাশে গাছপালা, ছন ও নলখাগড়ার বন ও কবির মূর্তি নির্মাণের দাবি এলাকাবাসীর।

বরিশাল জেলা সাংস্কৃতিক বিষয়ক কর্মকর্তা হাসানুর রশীদ মাকসুদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, ‘কবির স্মৃতি রক্ষার্থে তার নামে মিলনায়তন ও পাঠাগার নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে বরিশাল শহরে কবি জীবনানন্দ দাশ সংস্কৃতি কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করেছে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়। একনেকে পাস হওয়ার পর প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’

বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এস অজিয়র রহমান বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, ‘শুদ্ধতম ও রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতি রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কবি’র নামে স্থাপিত মিলনায়তন ও পাঠাগার সংস্কার ও নতুন গবেষণাগার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া বিএম কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি কবি জীবননান্দ দাশের ভাস্কর্য তৈরির উদ্যোগ নেয় তাহলে জেলা প্রশাসন সহযোগিতা করবে।

জানা গেছে, ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল নগরীর বগুড়া রোড এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা কবি কুসুম কুমারী দাশ ও বাবার নাম সত্যানন্দ দাশগুপ্ত।

আপনার মতামত লিখুন :