কোল্ডস্টোরেজে আলু রেখে ‘প্রতারণার ফাঁদে’ আলুচাষিরা



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, রাজশাহী
চাষিদের থেকে ঋণের মূল টাকার সঙ্গে আদায় করা হচ্ছে ১৬ শতাংশ সুদ,  ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

চাষিদের থেকে ঋণের মূল টাকার সঙ্গে আদায় করা হচ্ছে ১৬ শতাংশ সুদ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজশাহীর ‘রহমান কোল্ডস্টোরেজ’র অধীনস্থ পাঁচটি স্টোরেজে আলু রেখে মালিকপক্ষের ফাঁদে পড়েছেন কয়েক হাজার আলুচাষি। আলু চাষের মৌসুমের শুরুতে কোল্ডস্টোরেজ মালিকরা তাদেরকে সুদমুক্ত বলে ঋণ দেয়। তবে পরিশোধের সময়ে ঋণের মূল টাকার সঙ্গে আদায় করা হচ্ছে ১৬ শতাংশ সুদ। আর আলু রাখার সময়ে বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা হারে ভাড়া দেয়ার কথা থাকলেও ছাড় করার সময়ে জোর করে বস্তাপ্রতি ২৬০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ঋণের টাকা পরিশোধ না করলে আলুও ছাড় করছেন না স্টোরেজ মালিকরা।

এনিয়ে বুধবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় এবং বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন চাষিরা। নির্ধারণ করা ভাড়া এবং ঋণের সুদের টাকা নেওয়া বন্ধ না হলে তারা স্টোরেজ অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করবেন বলেও জানান।

জেলার মোহনপুর, পবা ও তানোর এলাকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আলুচাষ শুরু হওয়ার আগে থেকে রহমান কোল্ডস্টোরেজের কর্মকর্তারা বাড়ি এবং মাঠে কৃষকদের ক্ষেতে গিয়ে সুদমুক্ত ঋণ, বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা ভাড়াসহ নানা ধরনের প্রলোভন দিয়ে আলুচাষে উৎসাহিত করে। তাদের প্রলোভনে চাষিরা স্টোরেজ মালিকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী চাষ করা আলু মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত স্টোরেজে রাখা হয়। পরে স্টোরেজ থেকে পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়। সেখানে আলুর মালিক উপস্থিত থাকেন। তবে বিক্রির টাকা পাইকারী ক্রেতারা স্টোরেজ মালিকের হাতে দেন। সেখান থেকে ঋণ ও স্টোরেজ ভাড়ার টাকা কেটে নিয়ে বাকিটা চাষিদের বুঝিয়ে দেন স্টোরেজের কর্মকর্তারা।

পবার বেড়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও এলাকার আলুচাষিদের মধ্যে অন্যতম মুরাদ হোসেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সুদমুক্ত ঋণ বলায় আমি সাড়ে ২৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মাঠে আলু চাষ করেছি। চাষ করা আলু তোলার পরপরই কিছু বিক্রি করেছি। বাকি ৬ হাজার ৫০০ বস্তা আলু স্টোরেজে রেখেছিলাম। গত সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন পাইকারী ব্যবসায়ীর কাছে আমার আলুর তিন ভাগের দুই ভাগ বিক্রি করা হয়েছে।’

মুরাদ হোসেন বলেন, ‘টাকা বুঝে নিতে গেলে দেখা যায়- তারা ভাড়া ২০০ টাকার জায়গায় ২৬০ টাকা কেটে নিচ্ছেন। আর ঋণের টাকার সঙ্গে ১৬ শতাংশ হারে সুদও রাখছেন। ভাড়া ও ঋণের মূল এবং সুদের টাকা দিয়ে কোনো লাভ থাকছে না। বরং বড় অংকের লোকসান গুণতে হচ্ছে।’

পবার মথুরা গ্রামের চাষি আসলাম আলী বলেন, ‘আমি ৫১ মণ আলু বীজ নিয়েছিলাম। সঙ্গে সুদমুক্ত বলায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা ঋণ নেয়। আমি আলু রেখেছি ৪১৩ বস্তা। এখন বিক্রির পর ভাড়া, বীজবাবদ সুদসহ টাকা এবং ঋণ ও সুদের টাকা যোগ-বিয়োগের পর স্টোরেজ মালিকই আমার কাছে আরও টাকা চাইছেন। কোনো লাভ তো থাকছেই না বরং তাদের কাছে উল্টো ঋণী আমি!’

মোহনপুর উপজেলার টেমা গ্রামের আবদুল মতিন বলেন, ‘আমার প্রায় ১ লাখ টাকা ঋণের সঙ্গে ১৫ হাজার টাকা সুদ এবং ৮০০ বস্তা আলু রাখার জন্য ২১ হাজার টাকা ভাড়া কেটে নিয়ে আর কিছুই নেই। আলুচাষ আর এ জনমে করবো না।’

জানতে চাইলে রহমান কোল্ডস্টোরেজের মহাব্যবস্থাপক আবদুল হালিম বলেন, ‘আমাদের কোনো কর্মকর্তা চাষিদের কাছে বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা ভাড়া নেয়ার কথা বলেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। তবে আমরা ২৬০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে আলু রেখেছি। রাজশাহীর সব স্টোরেজে এ হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’

বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার প্রলোভনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যারা নিয়মিত আমাদের স্টোরেজে আলু রাখেন, তাদের ক্ষেত্রে আমরা বলেছিলাম- এক বস্তা আলুর বিপরীতে ২০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিলে সেটার কোনো সুদ ধরা হবে না। কিন্তু অধিকাংশ চাষি এক বস্তা আলুর বিপরীতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন। এখন নিয়ম অনুযায়ী লভ্যাংশ নেওয়া হবে। তারা না বুঝে ঋণ নিলে সেটার দায় প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তারা নেবে না নিশ্চয়।