লাগাম টানা যাচ্ছে না কিশোর গ্যাং কালচারের

মনি আচার্য্য, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে নিজেদের এলাকা নির্ধারণ করে কিশোর গ্যাং’র সদস্যরা | ছবি: সংগৃহীত

দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে নিজেদের এলাকা নির্ধারণ করে কিশোর গ্যাং’র সদস্যরা | ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি ‘কিশোর গ্যাং’ কিংবা ‘গ্যাং কালচার’ দেশে আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম। চলতি বছরে বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যাকাণ্ডে নয়ন বন্ডের ০০৭ গ্যাং’র সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পায় পুলিশ। এ ঘটনার পর থেকে কিশোর গ্যাং’র বিরুদ্ধে নতুন করে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

বরগুনার ঘটনার জের ধরেই চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং’র বিরুদ্ধে অভিযানে নামে র‌্যাব ও পুলিশ। টানা কয়েক মাসের অভিযানে রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং’র শতাধিক সদস্য গ্রেফতার হয়। গ্রেফতার কিশোরদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও খুনসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়।

পুলিশ ও র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, টানা ওই অভিযানে রাজধানীসহ সারা দেশে একযোগে কিশোর গ্যাং’র সক্রিয়তা কমে গিয়েছে। গ্রেফতার আতঙ্কে কিশোর অপরাধীরা গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেদের কর্মকাণ্ড। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এলাকাভিত্তিক নানা অপরাধের ঘটনা।

তবে অভিযানের শুরুর ১-২ মাস কিশোর গ্যাং’র সদস্যদের সক্রিয়তা কমে গেলেও আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে তারা। নতুন নামে নতুনভাবে একাধিক কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। নানা সাঙ্কেতিক নামে গ্যাংগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে নিজেদের এলাকা নির্ধারণের কাজও করছে গ্যাংগুলো।

কিশোর গ্যাং’র সদস্যদের আঁকা গ্রাফিতি | ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ করে রাজধানীর আজিমপুর, হাতিরঝিল ও উত্তরা এলাকায় আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের মাঝেও কিশোর গ্যাং আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে স্থানীদের অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, নতুন করে এসব এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলো দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকে নিজেদের এলাকা বণ্টন করছে। স্কুল-কলেজের সামনে নির্ধারিত স্থানে এসব গ্যাং’র সদস্যরা প্রায়ই আড্ডা দিচ্ছে। ছিনতাই ও মেয়েদের উত্যক্ত করার ঘটনাও বেড়েছে স্কুল-কলেজের সামনে।

আজিমপুর ও হাতিরঝিল এলাকায় নাম না জানা কয়েকটি গ্যাং এবং উত্তরার ‘ব্যাচ ৬৯’ নামে একটি গ্যাং’র নাম উঠে এসেছে স্থানীয়দের অভিযোগে।

আজিমপুর ও হাতিরঝিল এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবারও ১১-১৭ বছর বয়সী কিশোররা আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে তাদের কাছে। প্রতিদিনই মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপরাধ করছে একদল শিশু-কিশোর।

নতুন করে কিশোর গ্যাং’র সদস্যদের সক্রিয়তার বিষয়ে হাতিরঝিল-মধুভাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো.তৌফিককুল আলম বার্তা২৪.কমকে বলেন, মুধবাগ এলাকায় আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। এলাকার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে তারা ছিনতাই ও ইভটিজিং করছে। এদের বিরুদ্ধে এখনই শক্ত ব্যবস্থা না নিলে আগের মতো অরাজকতা সৃষ্টি করবে এলাকায়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে কিশোর গ্যাং’র সদস্যরা। তবে ২০১৭ সালে উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান নিহত হওয়ার পর ‘গ্যাং কালচার’ আলোচনায় আসে। শুরু থেকে ৩০ থেকে ৩২টি কিশোর গ্যাং রাজধানীতে থাকলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনও কিশোর গ্যাং রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কিশোর গ্যাং কারচারের বলি হয় উত্তরার শিক্ষার্থী আদনান

এ বিষয়ে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান বার্তা২৪.কমকে বলেন, কিশোর গ্যাং’র বিষয়টি র‌্যাব বরাবরই গুরুত্ব সহকারে দেখে। কিশোর গ্যাং বা কিশোর গ্যাং কালচারের বিষয়ে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক প্রচেষ্টায় কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

বার্তা২৪.কমকে তিনি বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহারে গ্যাং কালচার তৈরি হচ্ছে। তাদের অধিকাংশ যোগাযোগ বা পরিকল্পনা ভার্চুয়াল জগতকে ঘিরে। আমি মনে করি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বাবা-মা ও অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি মনোযোগী ও সচেতন হতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :