এক যুগেও নিশ্চিত হয়নি ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব

ইসমাঈল হোসাইন রাসেল,স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,বার্তা২৪.কম,ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নিবন্ধনের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও শর্ত অনুযায়ী কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত প্রতিটি কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের কোটা পূরণ করতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ কিছু দলের শর্ত পূরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে দাবি করলেও দলের সকল পর্যায়ের কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রাখার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন বাতিল করা হতে পারে।

জানা গেছে, ২০০৮ সালে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-আরপিও-তে নিবন্ধনের নিয়ম চালুর পাশাপাশি দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধনের শর্ত দিয়ে ৩৯টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করে ২০০৮-এ বিধান করা হয় ২০২০-এর মধ্যে নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরের কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখতে হবে। তবে শর্ত অনুযায়ী সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। সামনে এক বছর বাকি থাকায় এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চেয়ে জানুয়ারিতে দলগুলোকে চিঠি দেবে ইসি।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমরা প্রতি বছরই অগ্রগতি জানতে চাই। দলগুলো মৌখিকভাবে অগ্রগতি হয়েছে জানালেও তার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেন না। জানুয়ারিতে কমিশন থেকে তাদের পুনরায় চিঠি দিয়ে অগ্রগতি জানতে চাওয়া হবে। তবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছোট দলগুলোতে কার্যক্রম কিছুটা কম। ফলে তাদের এ বিষয়ে কার্যকারিতাও তেমন নেই। কিন্তু জাতীয় পার্টি বলেছে তাদের ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত হয়েছে। আমরা তাদের কাছে সেই তথ্য চেয়েছি।

নারী নেতৃত্বের বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের বার্তা২৪.কম-কে বলেন, নারী নেতৃত্বে অন্য দলের তুলনায় আমাদের অবস্থান ভালো। আমি মনে করি না ২০২০ সালের মধ্যে কোন দল ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারবে। তবে আমরা এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এগিয়ে যাচ্ছি। তবে দলে এখন পর্যন্ত কত শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

সর্বশেষ গত বছর রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধন শর্ত প্রতিপালন করছে কিনা- তা জানতে চেয়ে নিবন্ধিত দলগুলোকে ইসি চিঠি দিলে ৩৭টি দল তাতে সাড়া দেয়। চিঠির জবাবে কয়েকটি দল নারী নেতৃত্বের বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করে। সে সময় আওয়ামী লীগ ১৯ শতাংশ, বিএনপি ১৫ শতাংশ ও জাতীয় পার্টি ২০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রেখেছে বলে দাবি করা হয়। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্বের হার আরও অনেক কম। কোনো কোনো দল কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রাখার বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। তবে তথ্য উপস্থাপনের পর গত এক বছরে নারী নেতৃত্ব আরো বেড়েছে বলে জানিয়েছে দলগুলো।

এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন সমন্বয় ও সহায়তা শাখার উপ সচিব আব্দুল হালিম খান বার্তা২৪.কম-কে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রতিবছরই আমরা আপডেট জানতে চাই। দলগুলো আমাদের শর্ত প্রতিপালনে অগ্রগতির তথ্য দেয়। ২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের বিষয়ে অগ্রগতি জানতে আমরা দলগুলোকে চিঠি দেবো। যেহেতু তারা এই শর্ত মেনে রেজিস্টার্ড হয়েছে, সুতরাং তাদের এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

নারী নেতৃত্ব বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বার্তা২৪.কম-কে বলেন, আমাদের নারী নেতৃত্বের সংখ্যা নিয়মিতভাবেই বাড়ছে। কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব ক্ষেত্রেই এ সংখ্যা বাড়বে। আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনেও নারী নেতৃত্ব বাড়বে। আমরা ২০২০ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করতে পারব বলে আশা করছি। তবে অন্য দলগুলো এ ব্যাপারে এগিয়ে আসছে না। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটিতেই প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক নারী নেতৃত্ব রয়েছে, কিন্তু বিএনপিতে সেই সংখ্যক নারী নেতৃত্ব নেই।

এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে সকল স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে, আমরা সেটি করব। ইতোমধ্যে আমাদের প্রায় কাছাকাছি সংখ্যক নারী নেতৃত্ব রয়েছে, সামনে তা আরো বাড়বে। আশা করছি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

ইসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, নিবন্ধিতদের মধ্যে ইসলামিক দলগুলোর নারী নেতৃত্বের অগ্রগতি কিছুটা কম। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও ইসলামি আন্দোলন জানিয়েছিল- বাংলাদেশে এখনও সেভাবে নারী নেতৃত্ব গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়নি। এবং নারীরা রাজনীতিতে আসতে খুব একটা আগ্রহী হয় না। তবে নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করবে বলেও জানিয়েছিল দলটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সর্বস্তরের কমিটিতে ৩০ শতাংশ নারী নেতৃত্ব রয়েছে। যাদের সঙ্গে কথা বলায় শরীয়াহ’তে বাধা নেই তাদের সঙ্গে নারী নেত্রীরা কথা বলছেন। তারা তাদের মতো করে রাজনীতিতে আছেন। যেহেতু দেশের ৫০ ভাগই নারী, তাদের বাদ দিয়ে কোন কিছুই করা সম্ভব নয়। যারা বিপথগামী আছেন তাদের সঠিক পথে আনতে কাজ করছেন তারা। ২০২০ সালের মধ্যে আমরা ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব থাকবে, আমরা সেটি কমিশনকে যথা সময়ের জানিয়ে দেবো। কমিশন আমাদের দেয়া তথ্য তদন্ত করে দেখতে পারে। তবে নারীরা রাজনীতিতে স্ব স্ব জায়গা থেকে অবদান রাখছে।

নারীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ তৈরি করে দেয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দলগুলো নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের শর্ত পূরণ করতে না পারলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ তারা এ শর্ত মেনে নিয়েই নিবন্ধন নিয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে কমিশন কি ব্যবস্থা নেবে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদাত হোসেন চৌধুরী (অব.) বার্তা২৪.কম-কে বলেন, নিবন্ধনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্বের বিষয়ে সময়সীমা ঠিক করে দেয়া আছে, আমরা সে সময় পর্যন্ত দেখব। রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু আমাদের স্টেকহোল্ডার তাদের সঙ্গে সঙ্গে এটি নিয়ে আমাদের বসতে হবে। তারা যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেটি বাস্তবায়ন করতে না পারে তাহলে হয়ত তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনায় বসে এটি নিয়ে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করব। এ বিষয়ে নির্ধারিত সময়ের পরই আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।

আপনার মতামত লিখুন :