অস্তিত্ব সংকটে রংপুরের বধ্যভূমিগুলো

ফরহাদুজ্জামান ফারুক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রংপুর
রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি, ছবি: বার্তা২৪.কম

রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তখন উত্তরের জেলা রংপুরের মানুষও রক্ষা পায়নি। রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও অরক্ষিত রয়ে গেছে বধ্যভূমিগুলো। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার নীরব সাক্ষী এসব বধ্যভূমি সংস্কারের অভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে।

অধিকাংশ বধ্যভূমি ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ঢাকা, নেই যাতায়াতের রাস্তা। নির্দিষ্ট দুই একটি দিন ছাড়া সারাবছরই বধ্যভূমিগুলো মাদকসেবীদের দখলে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পৃক্ততার অভাবে অনেকেই বধ্যভূমিগুলোর ইতিহাসই জানেন না। এ ছাড়া নামফলক ও যুদ্ধে স্থানীয় শহীদদের নামও উল্লেখ নেই বেশিরভাগ বধ্যভূমিতে।

                               বধ্যভূমিগুলো সংস্কারের অভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে 

রংপুরে ছোট-বড় অনেক বধ্যভূমি থাকলেও সরকারিভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাত্র ১৩টি। সেগুলো হলো- রংপুর টাউনহল, দখিগঞ্জ শ্মশান, সাহেবগঞ্জ, দমদমা, বালার খাইল, নব্দীগঞ্জ, লাহিড়ীর হাট, ঘাঘট নদী, নিসবেতগঞ্জ, জাফরগঞ্জ ব্রিজ, বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ার বিল ও পদ্মপুকুর এবং মিঠাপুকুর উপজেলার জয়রাম আনোয়ারা বধ্যভূমি।

রংপুরের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের ঝড়ুয়ার বিল। ১৯৭১ সালে ঝাড়ুয়াল বিলে একসঙ্গে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে পাকিস্তানি হানাদাররা গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।

রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের হাজিরহাট এলাকায় জাফরগঞ্জ ব্রিজের পাশে রংপুর শহরের ব্যবসায়ী অশ্বিনী ঘোষসহ ১৯ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে আজও কোনো স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি।

রংপুর টাউন হল ছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের ফুর্তিমহল। এটাকে টর্চার সেল বানানো হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যা করা হতো টাউন হল এলাকায়।

বধ্যভূমিগুলো বেহাল দশায় পড়ে আছে

এছাড়াও রংপুরের গঙ্গাচড়ার তিস্তা তীরবর্তী শংকরদহ গ্রামে ১৯৭১ সালে ঘটেছিল এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। পাকিস্তানি বাহিনীর বুলেট কেড়ে নেয় ১৭ জনের প্রাণ। এর মধ্যে মসজিদে নামাজ আদায়রত অবস্থায় পাকিস্তানি সেনারা ব্রাশফায়ারে ছয়জনকে হত্যা করে। স্বাধীনতার এত বছর পরও সরকারিভাবে শংকরদহ বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা সদরুল আলম দুলু বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, সেই শহীদদের অনেক বধ্যভূমি আজও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানানোর লক্ষে বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা জরুরি।’

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ জরুরি

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে রংপুর বিভাগের ৫ জেলার ৫ হাজার ৬৬৬ জন রাজাকারের তালিকা করা হয়েছিল। কিন্তু তা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এখন সময় এসেছে এ তালিকা প্রকাশ করার।

প্রজন্ম একাত্তর রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি দেবদাস ঘোষ দেবু বলেন, ‘আমার বাবাসহ অনেক মুক্তিকামী মানুষকে পাকিস্তানি সেনারা জাফরগঞ্জ ব্রিজে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। সেখানে আজও কোনো নামফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নেই। এমন আরো অনেক জায়গা রয়েছে, যা আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। সেগুলো সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।’

আপনার মতামত লিখুন :