৪০ কেজি ওজনের বলের পেছনে ছুটছে মানুষ!

উবায়দুল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ময়মনসিংহ
৪০ কেজি ওজনের বল মাথায় নিয়ে যাচ্ছে এক তরুণ

৪০ কেজি ওজনের বল মাথায় নিয়ে যাচ্ছে এক তরুণ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিতলের তৈরি ৪০ কেজি ওজনের বল মাথায় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক তরুণ। আর তার পেছন পেছন পঙ্গপালের মতো ছুটছে মানুষ।

এরপর বলটি একটি পতিত জমির নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়া হল। মুহূর্তেই সেই বলটি নিয়ে সেখানে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষের মাঝে শুরু হল কাড়াকাড়ি। সেই সঙ্গে সকলের কণ্ঠে ভেসে আসতে শুরু করল, ‘জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে... হেইও।’ আর এ দৃশ্য দেখতে সেখানে বিভিন্ন বয়সী লক্ষাধিক মানুষের ভিড়।

বলা হচ্ছে একটি খেলার কথা। যার নাম ‘হুমগুটি’ খেলা। পিতলের তৈরি যে বলটির কথা বলা হল সেটিকেই বলে গুটি। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যে এলাকার খেলোয়াড়রা গুটিটি গুম করবেন তারাই বিজয়ী। এটি এমনই এক খেলা, যেটাতে খেলোয়াড় সংখ্যা অগণিত। তবে এ খেলায় নেই কোনো রেফারি। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কখনো দুই-তিনদিন পর্যন্ত এ খেলা চলার রেকর্ডও আছে।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেলে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ও দশমাইল এলাকার মাঝামাঝি তালুক-পরগনা সীমান্তে শুরু হয় এ খেলা। ঐতিহ্যবাহী খেলাটির এবার ২৬১তম আয়োজন।

পঙ্গপালের মতো ছুটছে মানুষ

স্থানীয়রা জানান, পৌষ মাসের শেষ বিকেলকে এ উপজেলায় আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘পুহুরা’। প্রতি বছর এই দিনে একই সময়ে একই স্থানে এ হুমগুটি খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয় এ হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়িয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর, দেওখোলাসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামে কয়েকদিন দিন আগ থেকে খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত চলে উৎসবের আমেজ।

জানা গেছে, ১৭৫৮ সালে মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সঙ্গে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেমচন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে প্রতিবাদী আন্দোলন।

জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করতে লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে ‘তালুক-পরগনার সীমানায়’ এ গুটি খেলার আয়োজন করা হয়। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটি গুমকারী এলাকাকে ‘তালুক’ এবং পরাজিত অংশের নাম হবে ‘পরগনা’।

জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। এভাবেই তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি এই খেলার গোড়াপত্তন।

জমিদার ও জমিদার প্রথা না থাকলেও সেই হুমগুটি খেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এলাকাবাসী। খেলায় মুক্তাগাছা, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ সদর ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দল বেঁধে হাজার হাজার খেলোয়াড় ও উৎসুক জনতা আসে খেলাটি দেখতে।

এ খেলায় একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ওই নিশানা দেখে বোঝা যায় কারা কোন পক্ষের লোক। ‘গুটি’ কোন দিকে যাচ্ছে তা মূলত চিহ্নিত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটি ‘গুম’ না হওয়া পর্যন্ত চলে খেলা।

হুমগুটি সাংস্কৃতিক ফোরামের পরিচালক এবি ছিদ্দিক বলেন, ‘জমিদার আমল থেকে হুমগুটি খেলা হয়ে আসছে। বংশ পরম্পরায় আমার পূর্ব পুরুষরা ঐতিহ্যবাহী খেলাটির আয়োজন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় পৌষের শেষ বিকেলে আমাদের এ আয়োজন চলছে, চলবে।’

আপনার মতামত লিখুন :