‘শিকল বন্দী’ শাকিলকে নতুন বাড়ি উপহার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
শাকিলের মায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ির দলিলপত্র বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ছবি: বার্তা২৪.কম

শাকিলের মায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ির দলিলপত্র বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বছর খানে আগে রাজধানীর ফুটপাতে শিকলে বন্দী থাকা প্রতিবন্ধী শাকিলের নতুন বাড়ি হয়েছে। শরিয়তপুরে নিজ গ্রামে নতুন ঘর পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত প্রতিবন্ধী শাকিল ও তার মা হনুফা বেগম। মানবিক এই কাজটি করেছে ‘সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্ট’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন।

শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) শাকিলের মায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাড়ির দলিলপত্র বুঝিয়ে দিয়েছেন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

নতুন বাড়ি পাওয়া শাকিল ও তার মায়ের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো। কারণ, এক বছর আগেও শাকিলের দিন কাটতো রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুরে কবরস্থানের কাছে ফুটপাতে। ফুটপাতে পথচারী পারাপারের সাইনবোর্ডের খুঁটি ও পায়ের সঙ্গে লাগানো শিকলই ছিল শাকিলের সারা দিনের সঙ্গী। সেখানে দাঁড়িয়েই করতে হতো প্রস্রাব-পায়খানা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় যাই হোক, মা মানুষের বাড়িতে কাজ শেষ করে না ফিরলে শাকিলের মুক্তি মিলত না। এভাবে চলছিল এক বছর।

নতুন ঘরের সামনে মায়ের সঙ্গে শাকিল, ছবি: বার্তা২৪.কম

শাকিলের মায়ের নাম হনুফা বেগম। বাবা মারা গেছেন ১৬ বছর আগে। গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরের পালং থানার দক্ষিণ কেবল নগরে। গ্রামে এক মামা আর ঢাকায় এক খালা ছাড়া আর কেউ নেই শাকিলের। মা হনুফা বেগম মানুষের বাসায় কাজ করার পাশাপাশি কাগজ ও বোতল কুঁড়িয়ে যা আয় করতেন তা দিয়ে শাকিলের ওষুধ ও কোনো রকম সংসার চলত। মা কাজে গেলে ফুটপাতে শিকলে বাঁধা থাকত শাকিল।

একদিন এই দৃশ্য চোখে পড়ে অনার্স পড়ুয়া এক তরুণীর। তিনি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিদের সহায়তায় পরিচালিত সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্ট নামের সংগঠনের সদস্য। তার সংগঠন তখনই প্রতিবন্ধী শাকিল ও শাকিলের মায়ের পাশে দাঁড়ায়।

শাকিলের মায়ের সঙ্গে কথা বলে তারা প্রথমে উত্তরা মেডিকেল হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তবে শাকিলের মানসিক কোনো উন্নতি না দেখে চিকিৎসকরা জানান, তার সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পরে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান ও সহকারী কমিশনার জিনিয়া জিন্নাতের সার্বিক সহযোগিতায় দক্ষিণ কেবল নগরে সরকারি খাস জমির ২৬ শতাংশ জায়গা শাকিলের মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করায়। একই সঙ্গে তার মায়ের নামে একটি একাউন্ট খুলে দেয়। তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে বিত্তবানদের কাছে শাকিলের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান নিয়ে গেলে মানুষের দান-সহযোগিতার অর্থ সংগ্রহ করে তাদের জন্য একটি পাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়। মোটর চালিত গভীর নলকূপ, রান্নাঘর ও বাথরুমের ব্যবস্থাও করে সংগঠনটি।

শিকল বন্দী শাকিলের আগের জীবন, ছবি: সংগৃহীত

শুক্রবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে দলিলপত্রসহ বাড়িটি শাকিলের মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নতুন বাড়ি পেয়ে উচ্ছ্বসিত শাকিল ও তার মা।

শাকিলের মা জানান, স্বামীর মৃত্যুর সময় শাকিল সুস্থই ছিলো। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পরে শাকিল হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়। অর্থাভাবে তখন সঠিক চিকিৎসা করতে পারিনি। পরে ধীরে ধীরে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। আমি তাকে রাস্তার পাশে বেঁধে রাখতাম যেন গাড়ির নিচে না পড়ে।

সাইলেন্ট হ্যান্ড সাপোর্টর মাধ্যমে এই বাড়ি করে দিতে যারা যারা সহায়তা করেছেন, সবার জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে দোয়াও করেন তিনি।

এ দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ‘বাড়িতে ২-৩ দিনের মধ্যে বৈদ্যুতিক সংযোগ প্রদান করা হবে এবং যতদ্রুত সম্ভব শাকিলের প্রতিবন্ধী ভাতা এবং শাকিলের মা হনুফা বেগমের জন্য বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন :