যৌন হয়রানি: বাদীর সাক্ষীরা বলছেন অভিযোগ ‘মিথ্যা’

হাসান আদিব, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ড. আমিরুল মোমেনীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার এজহারে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য’ ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন খোদ মামলার বাদীর পাঁচ সাক্ষী।

এজাহারে বর্ণিত ঘটনা দেখেননি এবং তাদের অবগত না করেই সাক্ষী করা হয়েছে দাবি করে আদালতে এফিডেভিট জমা দিয়েছেন তারা। সাক্ষীর তালিকা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহারের জন্যও আবেদন করেছেন সাক্ষীরা।

অন্যদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সব সাক্ষীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদও করেননি। পাঁচ সাক্ষীর মধ্যে একজনের সঙ্গে ‘আলাপ’ করলেও এজাহারে যে অভিযোগ করা হয়েছে- সেই বিষয়ে তাকে অবগত করা হয়নি বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তার মুখোমুখি হওয়া একমাত্র সাক্ষীর।

ছাত্রীর এজাহারের কপি

তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার এসআই রাজু আহমেদ বলেন, অভিযোগ দায়েরের পর আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে মামলার বাদী তার সহপাঠী ও সাক্ষী হিসেবে নাম দেওয়া মাহবুব হাবিব হিমেলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। তার সঙ্গে অল্প কিছু কথা হয়। অন্য সাক্ষীদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মামলার এজাহারে বর্ণিত ছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনার দিনে (১২ ফেব্রুয়ারি) অভিযুক্ত অধ্যাপক আমিরুল ক্যাম্পাসেই ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দফতর থেকে ভিজিলেন্স টিমের সদস্য হিসেবে তাকে পাঠানো হয় রাজশাহী নগরের সপুরায় অবস্থিত উদয়ন নার্সিং কলেজে।

কলেজটিতে ওই দিন দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের বিএসসি ইন নার্সিংয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। যেখানে তিনি সকাল ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত অবস্থান করেন। তার সঙ্গে কেন্দ্রে দায়িত্বে ছিলেন সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ।

ঘটনার দিন ওই কেন্দ্রে অধ্যাপক আমিরুলের উপস্থিত থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন উদয়ন নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ নওশীন বানু। কিন্তু মামলার এজাহারে শ্লীলতাহানির ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে— একই দিন বেলা সাড়ে ১১টায়। এ সংক্রান্ত সকল নথিপত্র প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

সাক্ষীদের এফিডেভিট

রাবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক আব্দুস সালাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ভিজিলেন্স টিমের সদস্যের উপস্থিতিতে প্রশ্নপত্র খোলা এবং পরীক্ষা শেষে তার উপস্থিতিতেই উত্তরপত্র জমা নিয়ে সিলগালা করা হয়। সেগুলো নিয়ম মতোই সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রে শিক্ষক আমিরুলের উপস্থিত না থাকার কোনো তথ্য নেই।

কলেজ পরিদর্শক দফতরের দু’জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যতদূর জানি- তিনি সেদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেন্দ্রে ছিলেন। ডিউটি করেছেন এবং উত্তরপত্র সংগ্রহ করে তবেই ফিরেছেন। কিভাবে একই সময়ে বিভাগে এসে ছাত্রীর শ্লীলতাহানি করলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

মামলার এজাহার, বাদী, সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা ও আসামি পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে মামলার এজাহারের আরও অনেক অসামঞ্জস্যতার তথ্য। অভিযোগ উঠেছে- চারুকলা অনুষদে আসন্ন ডিন নির্বাচন ও বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল তৈরির ইজারা পাওয়া নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট। বাদী পক্ষকে উস্কানি দিয়ে মামলা করিয়ে প্রতিপক্ষ শিক্ষকদের গ্রুপ অধ্যাপক আমিরুলকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছে। চারুকলা অনুষদের অন্তত পাঁচজন সিনিয়র-জুনিয়র অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলেও মিলেছে শিক্ষকদের অন্তর্কোন্দলের সত্যতা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর চন্দ্রিমা থানায় রাবির গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলা ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল মোমেনীন চৌধুরীর বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রী।

শিক্ষক আমিরুলের ভিজিলেন্স টিমের সদস্য থাকার নথি

মামলায় অভিযোগ করা হয়— চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি চারুকলার মেইন বিল্ডিংয়ে বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ফ্যাশন অ্যান্ড কস্টিউম ডিজাইন পরীক্ষা চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মহিলা বাথরুমের সামনে পথরোধ করে ছাত্রীর শরীরে হাত দেন এবং পরনের জামা ধরে টানাটানি করেন শিক্ষক আমিরুল মোমেনীন। সে সময় ছাত্রী চিৎকার দিলে তার সহপাঠী মিঠুন কুমার মোহন্ত (২৩), মাহাবুব হাবিব হিমেল (২৩), উম্মে সালমা বৃষ্টি (২২), সংঘ মিত্রা রায় (২৩) ও মোসা. সুরভীসহ তৃতীয় বর্ষের সকল শিক্ষার্থী ও আশেপাশের লোকজন সেখানে জড়ো হন। কিন্তু বিবাদী ঘটনা কাউকে জানাতে নিষেধ করে ‘মৃত্যুর’ ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে চলে যান। এছাড়া বিভাগে ভর্তির পর থেকে তাকে ক্লাসের ভেতরে ও যাওয়া-আসার সময়ে কুপ্রস্তাব দেন তিনি।

মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী করা হয়- শিক্ষার্থী মিঠুন, মাহাবুব, উম্মে সালমা, সংঘ মিত্রা ও মোসা. সুরভীকে। তবে খোদ সাক্ষীদেরই দাবি- ঘটনার দিন বিভাগে শিক্ষক আমিরুল মোমেনীনকেই দেখেননি তারা। কিভাবে তাদের ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী করা হলো তাও জানেন না তারা। মামলা রুজু করার পর গত ৪ মার্চ আদালতে হাজির হয়ে বাদীর পাঁচজন সাক্ষীই একশত টাকা মূল্যমানের স্ট্যাম্পে নিজেদের ছবি ও স্বাক্ষর সম্বলিত এফিডেভিট জমা দেন। ওই দিনই আদালত থেকে জামিন নেন অধ্যাপক আমিরুল মোমেনীনও।

সাক্ষী মিঠুন মোহন্ত বলেন, সেদিন আমরা আমিরুল স্যারকে দেখিনি। চিৎকার শুনে সেখানে ছুটে যাওয়ার কোনো ঘটনাও ঘটেনি। বানোয়াট একটি এজাহারে কিভাবে আমাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাও জানি না। যখন জেনেছি, তখনি মামলার বাদী আমাদের সহপাঠীকে কয়েক দফা কল করলেও সে রিসিভ করেনি। পরে বাধ্য হয়ে আদালতে এফিডেভিট করে সাক্ষীর তালিকা থেকে আমি ও অপর চারজন সাক্ষী নাম প্রত্যাহারের আবেদন করেছি।

মাহবুব হাবিব হিমেল বলেন, ‘ওই দিন আমাদের পরীক্ষা ছিল। আমিরুল স্যারকে আমি দেখিনি। কোনো চিৎকারের শব্দও শুনিনি।’ মোসা. সুরভী বলেন, ‘মামলায় যা লেখা হয়েছে তা ঘটতেও দেখিনি, শুনিওনি। কিভাবে সাক্ষী হলাম তাও জানি না।’

আরেক সাক্ষী উম্মে সালমা বৃষ্টি বলেন, ‘মামলায় যা লেখা হয়েছে, তেমন ঘটনার কথা আমি জানি না। এমন অভিযোগের কথাও শুনিনি।’ বাদীর অপর সাক্ষী সংঘ মিত্রা রায়ও বলেন একই কথা। তারা মামলায় তাদের না জানিয়ে সাক্ষী করায় বাদী ও তার স্বামীর প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ঘটনার দিন অভিযুক্ত যে কলেজে কর্তব্যরত ছিলেন সেই কলেজের অধ্যক্ষের প্রত্যয়নপত্র

বাদীর পাঁচ সাক্ষী ছাড়াও ওই দিন কস্টিউম ডিজাইন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আরও চারজন শিক্ষার্থী, ভবনের দায়িত্বে থাকা প্রহরী এবং শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেও এজাহারে বর্ণিত ঘটনার ন্যূনতম সত্যতাও মেলেনি। বরং কেউ কেউ বিস্ময়ও প্রকাশ করেছেন।

খোদ মামলার সাক্ষীদেরই এমন বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়ার পর বাদী গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের ওই ছাত্রীর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলব না। আমার স্বামী সব জানে, তার সাথে কথা বলেন। বলেই কল কেটে দেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর ছাত্রীর স্বামী ফেরদৌস হোসেন প্রতিবেদককে নিজেই কল করেন। সশরীরে দেখা করে তিনি দাবি করেন, ঘটনার পর তার স্ত্রীর কাছ থেকে বিষয়টি জেনে ওই শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। শিক্ষক তার স্ত্রী ও তার কাছে মাফও চেয়েছেন। তবে শিক্ষককে উচিত শিক্ষা দিতে মামলা করেছেন তার স্ত্রী।

অভিযুক্ত শিক্ষক আমিরুল মোমেনীন মামলার এজাহারে বর্ণিত ঘটনা মিথ্যা দাবি করে বলেন, ঘটনার দিন সকালে আমি বিভাগে যাইনি। বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ওরা আমার কাছ থেকে একাডেমিক কাজ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফিগার আঁকার জন্য ছবি চাইতো। মাঝেমধ্যে আমি ওদের আমার মোবাইলও দিয়ে দিতাম। নিজেরা বেছে বেছে নিজেদের ইনবক্সে বিভিন্ন ছবির ফিগার সেন্ড করে নিতো। সেগুলোকে হাতিয়ার করে এবং কতিপয় শিক্ষকের প্ররোচণায় পড়ে তারা এগুলো করছে।

অভিযুক্ত শিক্ষক অভিযোগ করেন, ঘটনার পর ওই ছাত্রীর স্বামী তার সঙ্গে দেখা করে ফেসবুকে কিছু কনভারসেশন নিয়ে ব্লাকমেইল করার হুমকি দেন। ভয়-ভীতি দেখান এবং ‘সম্মান’ বাঁচাতে চাইলে তার স্ত্রীকে শিক্ষক বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি চান। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থও দাবি করেন।

টাকা চাওয়া ও স্ত্রীকে শিক্ষক বানিয়ে দেওয়ার অনৈতিক দাবির অভিযোগ বিষয়ে ছাত্রীর স্বামী ফেরদৌস বলেন, অপরাধ করে বাঁচার জন্য তিনি এখন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথা বলছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর চন্দ্রিমা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ বলেন, সাক্ষীদের সঙ্গে আমার বিস্তারিত কথা হয়নি। একজনের সঙ্গে একেবারে প্রাথমিক কথাবার্তা হয়। ঘটনার সময় শিক্ষক অন্য পরীক্ষা কেন্দ্রে ছিলেন মর্মে কাগজপত্র আমিও পেয়েছি। মামলার তদন্তে সেগুলোও ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তদন্ত শেষে জানা যাবে— আসল ঘটনা কী। এর বেশি এখন আর কিছু বলা সম্ভব নয়।

রাবির চারুকলার শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

আপনার মতামত লিখুন :