করোনার পরীক্ষামূলক ওষুধ তৈরি হবে বাংলাদেশে

ফাতিমা তুজ জোহরা, নিউজরুম এডিটর. বার্তা২৪.কম
ছবিঃ প্রতীকী

ছবিঃ প্রতীকী

  • Font increase
  • Font Decrease

মহামারি করোনাভাইরাস বিশ্বের ১৮৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো পর্যন্ত এটির কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে করোনার ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলমান। তবে এর মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে— ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন (এইচসিকিউ) ও ক্লোরোকুইন (সিকিউ) ওষুধ।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, স্পেন, জর্ডানসহ বেশ কয়েকটি দেশে করোনা চিকিৎসায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইন ও ক্লোরোকুইন ব্যবহার করছে।

এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর দেশীয় কোম্পানিগুলোকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশের বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস, জিসকা ফার্মাসিউটিক্যালস প্রভৃতি ওষুধ কোম্পানিগুলোও এ ওষুধ তৈরি করবে বলে।

অনুমোদন দেওয়া ওষুধগুলোর তালিকায় আছে— ফ্যাভিপিরাভির, ওসেল্টামিভির ও ইভারমেকটিন, রেকোনিল প্রভৃতি। এর মধ্যে ফ্যাভিপিরাভির তৈরি করেছে বিকন ফার্মা। রেকোনিল, ভিপিরাভির, রিটোনাভির/লোপিনাভির ককটেল তৈরি করবে ইনসেপ্টা ফার্মা। ফ্যাভিপিরাভির, ওসেল্টামিভির ও ইভারমেকটিন তৈরি করবে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস। ফ্যাভিপিরাভির তৈরি করবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।

গত ৫ এপ্রিল বাংলাদেশের করোনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে ম্যালেরিয়ার ক্লোরোকুইন ওষুধ দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

তিনি বলেন, অনেক উন্নত দেশে এ ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরাও করবো। আমরা পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রেখেছি। ম্যালেরিয়ার ক্লোরোকুইন ওষুধ দিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সেবা দেওয়া হবে।

সোমবার ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে ইনসেপ্টাও এখন বৃহৎ পরিসরে ওষুধটি তৈরি করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইনসেপ্টা থেকে এই ওষুধটি আমদানি করতে চাচ্ছে, কিন্তু দেশের স্বার্থ বিবেচনায়, দেশের মানুষের কথা মাথায় রেখে ইনসেপ্টা বর্তমানে এই ওষুধের রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।

ইতোমধ্যে দেশের সব ওষুধের দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেকোনিলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, যেন দেশের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায়। দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকের নাগালের মধ্যে রাখার জন্য ইনসেপ্টা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো—সিএমএসডি) ৩০ লাখ রেকোনিল ট্যাবলেট সরবরাহ করেছে। এমনকি ডিরেক্টর জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে (ডিজিডিএ) ৩ লাখ রেকোনিল ট্যাবলেট বিনা মূল্যে হস্তান্তর করেছে।

চীনের চিকিৎসকরা বলছেন, দেশটিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ১৩৪ জন রোগীর পরীক্ষার জন্য ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি রোগীদের অসুস্থতার তীব্রতা কমাতে কার্যকর ছিল। তবে এই ফলাফল এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সরকারি টাস্কফোর্সের নেতৃত্বদানকারী চীনা শ্বাস-প্রশ্বাস বিশেষজ্ঞ ঝং নানশান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, এ সংক্রান্ত ইতিবাচক প্রতিবেদনগুলো দ্রুত সর্বত্র প্রচার করা হবে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, করোনার প্রতিষেধক হিসেবে চারটি ওষুধ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি হলো— ড্রাগ ককটেল। ইবোলার ওষুধ রেমডেসিভির, দুটি এইচআইভি ড্রাগ— লোপিনাভির ও রিটোনাভির সংমিশ্রণ; লোপিনাভির ও রিটোনাভির প্লাস ইন্টারফেরন বিটা’র আরেকটি ককটেল; এবং অ্যান্টিম্যালেরিয়া ড্রাগ ক্লোরোকুইন।

ফ্রান্সে ডিডিয়ার রাউল্টের নেতৃত্বে আইএইচইউ-মেডট্রিয়ানি ইনফেকশনের একটি দল চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ৩৩ জন কোভিড-১৯ রোগীর ওপর একটি গবেষণা চালিয়েছে। সেখানে তারা জানতে পারে, ক্লোরোকুইন গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ এসব রোগীরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। এটি অ্যাজিথ্রোমাইসিনের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছিল। যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক যা গৌণ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ দমনে ব্যবহৃত হয়।

ক্লোরোকুইন (এইচসিকিউ ও সিকিউ) ওষুধ ল্যাবের পরীক্ষাগারে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে সক্ষম প্রমাণিত হয়েছে। সেল ডিসকভারি নামে এক সংবাদমাধ্যম জানায়, গত সপ্তাহে একটি চীনা গবেষণা দলের প্রকাশিত গবেষণায় এর ইতিবাচক কার্যকারিতার কথা জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভারসাইডের কোষ জীববিজ্ঞানের প্রফেসর কারিন লে রোচ এক ব্যাখ্যায় বলেন, এইচসিকিউ ও সিকিউ দুটোই দুর্বল ঘাঁটি, যা মানুষের কোষের অংশের পিএইচ উন্নত করে যাকে অর্গানেলস বলা হয়— যা প্রাণীদেহের অঙ্গগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ও অ্যাসিডযুক্ত।

চীনে করোনাভাইরাস মহামারি আকারে বিস্তার করার পর রোগীদেরকে এ ওষুধ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ফ্রান্সেও এর ব্যবহার হয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও করোনা আক্রান্ত রোগীদের ওপর এ ওষুধ প্রয়োগ করার কথা বলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের ইনফেকশাস ডিজিজ বিভাগের প্রধান অ্যান্থনি ফাওসি বার্তা সসংস্থা এএফপি-কে বলেন, যদিও এ ওষুধ ভিট্রোতে (অণুজীব, কোষ বা জৈবিক অণু দিয়ে সম্পাদিত) কাজ করেছিল। আমি এখনো ভিট্রোতে ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা দেখতে বৃহৎ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলোর ফলাফলের অপেক্ষা করছি।

তবে কয়েকটি গবেষণা এও বলছে, এ ওষুধ ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। এ নিয়ে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রাক্তন কমিশনার পিটার পিটস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ক্লোরোকুইনের ব্যাপক ব্যবহার এমন ফল আনতে পারে যেখানে এ ওষুধের ঘটতি দেখা দিতে পারে। অনেকে নিজে কিনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এটি সেবন করতে পারে। সে অবস্থায় তার শরীরে অন্য কোনো রোগ আছে যা কিনা এ ওষুধ সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর ধারাবাহিকতায় কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে সতর্কতা অবলম্বন করেছে। যেমন: স্পেন ‘বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া পর্যন্ত’ বাত ও লুপাস রোগীদের মধ্যে ক্লোরোকুইন ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী অলিভিয়ার ভেরান বলেছেন, কেবল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের চিকিৎসার জন্য ক্লোরোকুইন ব্যবহার করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের জেনেটিক কার্ডিওলজিস্ট মাইকেল অ্যাকারম্যান এএফপিকে বলেন, হার্টের সমস্যার কারণে প্রায় এক শতাংশ মানুষ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আকস্মিক মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই মেডিকেল দলগুলোকে এ ওষুধ ব্যবহারের আগে তাদের ঝুঁকি বিশ্লেষণকে অবহিত করতে ইলেক্ট্রো-কার্ডিওগ্রাম করাতে হবে।

ক্লোরোকুইন মূলত ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ওষুধ মূলত সিনচোনা নামক গাছ থেকে তৈরি হয়। ক্লোরোকুইন অন্ত্রের বাইরে ঘটছে এমন অ্যামোনিয়ার সংক্রমণের জন্য ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে এ ওষুধ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও লুপাসের মতো রোগে প্রদাহবিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১২৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। মারা গেছেন ১২ জন।

আপনার মতামত লিখুন :