কর্মস্থলে নেই নির্বাহী প্রকৌশলী, টাকা ছাড়া কাজ হয় না

আল মামুন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ব্রহ্মণবাড়িয়া
আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ/ছবি: বার্তা২৪.কম

আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ/ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

লকডাউন সময়ে সরকারি অফিসের কোনো কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী তার অফিস এলাকা ত্যাগ না করার নির্দেশনা থাকলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম ৯ দিন যাবৎ অফিসে আসছেন না। যোগদানের পর থেকেই তিনি অফিস করেন না নিয়মিতভাবে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে যান সাংবাদিকদের সাথে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে ঘুষ নিয়ে কাজ করার অভিযোগ। পাশাপাশি ঝড়ের কারণে কোনো ট্রান্সমিটার নষ্ট হলে প্রতি ট্রান্সমিটারে ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে নতুন ট্রান্সমিটার লাগিয়ে দেন তিনি। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে গ্রাহকদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছরের ২৩ মার্চ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের আশুগঞ্জ কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। যোগদানের পর থেকেই নানান অনিয়মের সাথে যুক্ত হন তিনি। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয়না তার টেবিলে। নতুন মিটার লাগানো, ট্রান্সমিটার প্রতিস্থাপনসহ সকল কাজেই তাকে দিতে হয় টাকা। উপজেলার বিভিন্ন রাইসমিলের নতুন সংযোগে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য তাকে এক হাজার করে টাকা দিতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার কয়েকজন রাইসমিল মালিক জানান, নতুন কোনো বাণিজ্যিক মিটার নিতে চাইলে তাকে কিলোওয়াট প্রতি এক হাজার করে টাকা দিতে হয় তাকে। এছাড়াও গত ২০ মে রাতে উপজেলার আলমনগর এলাকায় সরকার রাইসমিলের সামনে একটি ট্রাক ঘুরাতে গিয়ে ট্রান্সফরমারের খুঁটিতে লেগে যায়। এসময় ট্রান্সফরমারের বুশিং ভেঙে সামান্য ক্ষতি হয়। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের লোকজন এসে ট্রাকটিসহ অফিসে নিয়ে যেতে চায়। পরে ট্রাকচালক টাকা দিতে দেরি করায় উপজেলাসহ আড়াইসিধা, যাত্রাপুর, তারুয়া এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না ১৮ ঘণ্টা। পরে এলাকার লোকজনের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা নিয়ে বিষয়টি মোবাইল ফোনে সুরাহা করেন নির্বাহী প্রকৌশলী।

অন্যদিকে আশুগঞ্জ বিদ্যুতের শহর হলেও সামান্য বৃষ্টি হলেই উপজেলা থাকে অন্ধকারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকে না বিদ্যুৎ। কাজের অজুহাতে বন্ধ করে রাখা হয় সকল এলাকার নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। এসব বিষয়ে বিতরণ বিভাগের অভিযোগের জন্য দেয়া মোবাইল ফোনে অভিযোগ করেও কোনো ফল মেলে না। এছাড়া অনেক সময় মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে উপজেলার আড়াইসিধা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের একটি ট্রান্সমিটার গত ২৭ তারিখ রাতে কোনো কারণ ছাড়াই নষ্ট হয়ে যায়। এ নিয়ে তাদের সাথে যোগাযাগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী ২০ হাজার টাকা দাবি করেন এলাকাবসীর কাছে। টাকা তুলে তার কাছে পাঠাতে দেরি হওয়ায় ২৯ তারিখ সকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নতুন ট্রান্সমিটার লাগানো হয়নি। এতে করে এই এলাকার লোকজন দুর্ভোগে পড়েছেন।

আড়াইসিধা এলাকার মো. নাঈম জানান, ট্রান্সমিটার সমস্যা হওয়ার পর আমরা নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে মোবাইলে কথা বলি। পরে তার কথা মতো আমরা এলাকার লোকজনের কাছ থেকে টাকা তুলে নিয়ে যাই। কিছু টাকা কম হওয়ার কারণে তারা আমাদের ফিরিয়ে দেয়। এরপর একজন জনপ্রতিনিধি দিয়ে কল করালেও কোন সুরাহা হয়নি। এই এলাকার লোকজন মারাত্মক দুর্ভোগে রয়েছেন।

এদিকে ২১ মে (বৃহস্পতিবার) থেকে নিজ অফিসে অনুপস্থিত রয়েছেন বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম। কয়েকবার তার অফিসে গিয়েও তার দেখা পাওয়া যায়নি। অফিসের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় তিনি ২১ মে থেকে অফিসে এক মিনিটের জন্যও আসেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিতরণ বিভাগের একাধিক লোক জানায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী অফিসে আসছেন না। এতে করে গুরুত্বপূর্ণ অফিসের বিভিন্ন কাজ জমে আছে। পাশাপাশি তিনি যোগদানের পর থেকেই তার ব্যবহারে অতিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

সরেজমিনে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের অফিসে একাধিকবার গিয়েও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে তার সাথে কথা হলে তিনি সকল অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রমাণ চান। প্রমাণ আছে বলতেই তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তিনি অফিসে আছেন কিনা জানতে চাইলে সাংবাদিকদের এই কথা জানার অধিকার নাই বলে তিনি ফোনটি কেটে দেয়।

এসব বিষয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজিমুল হায়দারের সাথে কথা হলে তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কোনো অফিসার কর্মস্থলে না আসলে খোঁজ নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :