সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া ছয় কিশোর উদ্ধারের গল্প

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জয়, সাইমুন, জুবায়ের, মাঈনুল, রহিম ও ইমরান। ছয় জনেরই বয়স ১৬-১৭। ঈদ উপলক্ষে বুধবার (২৭ মে) সকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগরে বেড়াতে আসে।

সকাল ১০টা। ধানসাগর লাগোয়া এলাকায় বনরক্ষীদের অফিস রয়েছে। পাশেই একটি ছোট খাল। খালটি পার হওয়ার জন্য রয়েছে একটি কাঠের পুল। তবে সেটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়। সুন্দরবন পাহারা দিতে যাওয়া বনরক্ষীরাই কেবল পুলটি ব্যবহার করেন।

ছয় কিশোর লোক চক্ষুর অন্তরালে পুল পাড় হয়ে খালের ওপারে চলে যায়। এরপর গল্প করতে করতে তারা সুন্দরবনের ভেতরে হাঁটতে থাকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তাদের যে ফিরতে হবে, সেই ভাবনা নেই। বিকেলে দূর থেকে ভেসে এলো আছরের আজানের শব্দ। এবার তাদের ফেরার কথা মনে হলো।

যেপথে তারা এসেছে, সেই পথে উল্টো দিকে কিছু দূর হাঁটল। এরপর পথ হারিয়ে ফেলল। বেরিয়ে আসার পরিবর্তে উল্টো বনের গহীনে যেতে লাগলো। এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বেরুনোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না তারা।

তাদের সাথে ছিলো তিনটি মোবাইল ফোন। তাতে নেটওয়ার্ক আসে যায় অবস্থা। এক পর্যায়ে মোবাইল ফোনে পরিবারকে নিজেদের দুর্দশার কথা জানায় কিশোররা। হারিয়ে যাওয়াদের দলের একজন বুদ্ধি করে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ ফোন করে। সঙ্গে সঙ্গে শরণখোলা থানার সাথে তাকে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়। এদিকে নৌ-পুলিশকেও বিষয় অবহিত করা হয়। নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়ে কিশোর তাদেরকে উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের কাছে অনুরোধ জানায়।

খবর পেয়ে পুলিশ উদ্ধার অভিযানে নেমে পড়ে। কিন্তু এত বড় সুন্দরবনে কারো অবস্থান জানা সহজ নয়। অন্যদিকে, কিশোররা বনের ঠিক কোনো অংশে থেকে হারিয়ে গেছে সেটিও নির্দিষ্ট না। এরমধ্যেই ওই কিশোরদের সাথে থাকা দুটি ফোনের চার্জ শেষ হয়ে জাওয়ায় বন্ধ। একটি ফোন খোলা। সেটির মাধ্যমেই তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল পুলিশ। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ওই অংশে বাঘের চলাচল থাকায় কিশোরদের বনের মধ্যে হাঁটা-চলা না করে গাছে চড়ে বসার জন্য পরামর্শ দেয় পুলিশ।

উদ্ধার অভিযান শুরু করার সাথে সাথে শুরু হলো বৃষ্টিরও। এতে বনের মধ্যে এক গুমোট অন্ধকারের সৃষ্টি হলো। অন্ধকার পরিবেশে আরো ভড়কে গেলো কিশোররা। এরমধ্যেই তাদের সাথে থাকা সচল ফোনটিরও নেটওয়ার্ক চলে গেল।

উদ্ধার হওয়া কিশোররা

এদিকে, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যায় পুলিশ। এক পর্যায়ে কিশোরদের ফোনে নেটওয়ার্ক ফিরে আসায় পুলিশ তাদের সাথে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। কথা বলার এক পর্যায়ে তারা জানায়, মাইকে এশার আজানের শব্দ শুনেছে তারা।

কিন্তু সুন্দরবনের ওই এলাকার পাশের লোকালয়ে দুই পাশে দুটি মসজিদ আছে। কাজেই, কোন মসজিদের মাইকের আজানের শব্দ শুনতে পেলো, সেটি জানতে পারলে তাদের অবস্থানের ব্যাপারে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। এবার একপাশের মসজিদের মাইক দিয়ে তাদের ডাকা হলো। আর মোবাইল ফোনে জানতে চাওয়া হলো, আওয়াজ শোনা যায় কিনা? জবাব এলো, খুবই কম। এবার বনের অন্য পাশের মসজিদের মাইক দিয়ে ডাকা হলো। এবার মোবাইল ফোনে কিশোরেরা জানালো, তুলনামূলক স্পষ্ট শব্দ শুনতে পাচ্ছে তারা। এটার মাধ্যমে বনের মধ্যে তাদের অবস্থানটি কিছুটা আঁচ করে নিলো পুলিশ। সুন্দরবনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে ৩-৪ কিলোমিটার পর্যন্ত শব্দ শোনা যায়। আর রাতে সেটি আরো গহীন থেকে শোনা যায়। তাই, পুলিশ সুন্দরবনের ৪-৫ কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এগুতে থাকে।

সুন্দরবনের ভেতর হাঁটা সহজ নয়। কেওড়ার শ্বাসমূলের সাথে লতাগুল্ম। ঝোপঝাড় আর নানা ধরনের কাঁটা। রাতের অন্ধকারের সাথে বৃষ্টি। পিচ্ছিল পথে এক কণ্টকাকীর্ণ যাত্রা। কয়েক ঘণ্টা ধরে সেই পথ পাড়ি দিয়ে বনের আরো ভেতরে গেল পুলিশ। এবার মোবাইল ফোন ওই কিশোরদের পুলিশ বললো, আমরা হাঁক তুলবো। শুনতে পেলে তোমরাও হাঁক তুলবে। পুলিশ বনের মধ্যেই হাঁটতে হাঁটতে হাঁক তুললো। কিন্তু ওই পাশ থেকে সাড়া নেই। ঘণ্টা খানেক পর ওপাশ থেকেই হাঁকের জবাব এলো। এবার পুলিশ বুঝতে পারলো, কাছাকাছি চলে এসেছে তাঁরা। অবশেষে রাত তিনটায় হারিয়ে যাওয়া কিশোরদের খুঁজে পায় পুলিশ।

পরে পুলিশ তাদের থানায় এনে প্রাথমিক শুশ্রূষা প্রদানের পাশাপাশি খাবার খেতে দেয় পুলিশ। এরপর সকালে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কিশোরদের স্ব স্ব পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেয় পুলিশ। সন্তানদের ফিরে পেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারা।

এক কিশোর পুলিশকে লক্ষ্য করে বলে, 'বনের ভেতরে যখন হারিয়ে গিয়েছিলাম, তখন বারবার মনে হয়েছে এ জীবনে আর ফেরা হবে না। কিন্তু পুলিশের কারণে আমরা ছয়জন আবার নতুন জীবন পেলাম। আমি পড়াশোনা করে পুলিশ হতে চাই। বিপদে এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।'

আপনার মতামত লিখুন :