লিবিয়া ট্র্যাজেডি: প্রবাসী ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় মা

জাহিদ হাসান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, যশোর
ছেলের জন্য মায়ের আহাজারি, ছবি: বার্তা২৪.কম

ছেলের জন্য মায়ের আহাজারি, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাড়ে তিনমাস আগে লিবিয়ায় পড়ি জমান যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের ইসরাইল হোসেন ও মাহেরুনর নেছা দম্পতির ছেলে রাকিবুল ইসলাম রাকিব (২০)। কিন্তু গত ২৬ মে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারী চক্র। এদেরই একজন রাকিবুল। হত্যার ৯ দিন পার হলেও ছেলের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়নি। প্রবাসী ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছেন মা মাহেরুন নেছা।

লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর চাপের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহতদের দাফন করেছে। এরপরও ছেলের মরদেহ দেশে ফেরত আনার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাকিবুলের মা বলেন, ‘আমি আর কিছু চাই না, শুধু ছেলের মুখ দেখতে চাই। আমার ছেলেরে এই মাটিতে কবর দিতে চাই। আমার সবই চলে গেছে, আর কিছু যাওয়ার নাই। এখন শুধু ছেলের মরদেহ চাই।’

একটু সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন রাকিবুল। সম্পত্তি বিক্রি আর জমানো টাকা খরচ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন ইসরাইল হোসেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণ তো দূরের কথা সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ রাকিবুলের বাবা ইসরাইল ও মা মাহেরুন নেছা।

প্রবাসী রাকিবুলের মৃত্যুতে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম

দালালের মাধ্যমে রাকিবুলকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। দালাল চক্র লিবিয়ার একটি শহরে ছেলে রাকিবকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুঠোফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের লোকজন টাকা দিতে রাজি হলেও দালালচক্র রাকিবুলকে গুলি করে হত্যা করে।

রাকিবুলের মা বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ভাইবোনের মধ্যে রাকিবুল ছিল সবার ছোট। সংসারে নানা অভাব অনটনের মধ্যেও তার আবদার ছিল বেশি। আমরা মেটানোর চেষ্টাও করেছি। ও চেয়েছিল বিদেশ যেয়ে জীবনে সচ্ছলতা ফিরাবে। ভালো কাজের জন্য দালালের মাধ্যমে তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু শুরু থেকেই দালালেরা তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকে। এক সময়ে রাকিবুলসহ ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে দালাল চক্রটি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ছেলের মরদেহ দেশে আনার জন্য অনেক জায়গায় যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর চাপের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের দাফন করেছে। দাফন হয়েছে বা মরদেহ কোথায় আছে সেটাও জানি না। আমার মতো আরও অনেক মায়ের বুক যারা খালি করেছে, তাদের দ্রুত বিচার দাবি জানাই।’

রাকিবুলের বাবা ইসরাইল হোসেন বলেন, ‘ছেলের জন্য মায়ের চোখে পানি শুকিয়ে গেছে। এখন শুধু ছেলের মরদেহ দেখার জন্য ছটফট করছে তার মা। জানি না এই অপেক্ষা কবে শেষ হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘যশোর ২ ঝিকরগাছা-চৌগাছা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনিরের মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু ওই দেশে মরদেহ দাফন হওয়ায় নাকি বাংলাদেশে আনা সম্ভব হবে না।’

ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন বাবা ইসরাইল হোসেন

ছেলের মরদেহ ফিরে পেতে বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বাবা ইসরাইল হোসেন ও মা মাহেরুন নেছা।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করে পাচারকারী চক্রটি। তার মধ্যে যশোরের এক যুবকও রয়েছে। প্রবাস থেকে মরদেহ আনা-নেওয়া প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কাজ। লিবিয়ার মিজদা শহরে জায়গাটি স্থানীয় মিলিশিয়াদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর চাপের মুখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের দাফন করে। মরদেহ আনার ব্যাপারে রাকিবুলের পরিবার কোনো আবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে করেনি।’

আপনার মতামত লিখুন :