রইছউদ্দিনের প্রশ্নের উত্তর কে দেবে?

রফিকুল ইসলাম মন্টু, স্পেশালিস্ট রাইটার
আম্পান বিপন্নতায় ডুবে আছে ঘরবাড়ি/ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

আম্পান বিপন্নতায় ডুবে আছে ঘরবাড়ি/ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘দুর্যোগে সব শেষ হয়ে যায়। আবার শুরু করি নতুন করে। এ ভোগান্তি মানুষের সৃষ্টি। কারও না কারও অবহেলার দায় অযথাই আমরা বয়ে চলেছি যুগের পর যুগ। ভাসছি দিনের পর দিন। এভাবে কি বাঁচা যায়? আমরা কি অপরাধ করেছি? আমাদের কি শান্তিতে বসবাসের অধিকার নেই? আমরা কি এদেশের নাগরিক নই?’--ক্ষোভ ঝরে রইসউদ্দিন তরফদারের গলায়। যতই বোঝানোর চেষ্টা করি, প্রাকৃতিক বিপদে তো কারও হাত নেই। কিন্তু তিনি মানলেন না। তার অভিযোগ, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা-অবহেলার ফাঁদে পড়ে আছি আমরা। বাঁধ ঠিক করে দিলে, শক্ত করে বাঁধ নির্মাণ করে দিলে, আমাদের এই ভোগান্তি থাকতো না। বিপদের সময় এখন আমাদের পাশে কেউ নেই।

ডুবন্ত গ্রাম তরফদার পাড়া। এটি পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ী ইউনিয়নের একটি গ্রাম। দু’দিন ধরে দেখছি গ্রামটি ডুবে আছে পানির তলায়। বাঁধ ভাঙা পানি গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে পিচের সড়ক উপচে পড়ছে। পিচের সড়ক ভেঙে জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে; ভাটায় বের হচ্ছে শো শো আওয়াজে। দিনের জোয়ারের পানিতে দুপুর-বিকেল জুড়ে পানির চাপ। সন্ধ্যের দিকে পানি কিছুটা কমে। ভাটায় সব পানি সরতে না সরতেই রাতের জোয়ার শুরু হয়ে যায়। রাতে জোয়ারের পানির ভয় একটু বেশি। শনিবার (৬জুন) দ্বিতীয় দিনের মত সরেজমিন গ্রাম ঘুরে চোখে পড়ে এক বিপন্ন চিত্র। শ্যামনগর উপজেলা সদর থেকে কাশিমাড়ীর ঝাপালি পর্যন্ত পিচ ঢালা সড়কের অনেক এলাকা জোয়ারের সময় হাঁটু পানির তলায় থাকে।

তরফদার পাড়ার মসজিদ লাগোয়া পথ ধরে ফিরছিলাম। কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি। ঝুলিতে জমেছে অনেক গল্প। কিন্তু এ পাড়ায় শহুরে খবরওয়ালাদের প্রবেশের খবরটা এলাকার সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি রইছউদ্দিনের নজর এড়াতে পারেনি। ডুবন্ত গ্রামে নিজের বাড়ির সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পথের ধারে। লুঙ্গিটা খানিক উপরের দিকে ওঠানো। উদোম শরীর। ধবধবে সাদা দাঁড়ি-চুল। শরীরে বয়সের ছাপ। কাছে যেতেই ৮৩ বছর বয়সী মানুষটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। পানি বন্দি জীবনটা আর টেনে নিতে পারছেন না। সারাজীবন বনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন। দু’বার স্ট্রোকের পরেও আছেন বেশ শক্ত। চলাফেরা করতে পারেন ভালোভাবেই। জীবনের শেষ বয়স এসে এই দুর্যোগের অভিঘাত তাকে বেশ কষ্ট দিচ্ছে। সকাল-দুপুর-বিকেল হাবুডুবু খাচ্ছেন পানিতে।

পানি বন্দি রইছউদ্দিন তরফদার./ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখি, তার জন্য আলাদা একটি ঘর। চারপাশ খোলা। তার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা নাতি নিয়ে থাকেন অন্য আরেক ঘরে। বাড়ির তৃতীয় ঘরটিতে থাকে ছোট ছেলে মাসুদুজ্জামান ও তার বউ। খোঁজ নেয় না বলে বড় ছেলে আজাদ হোসেনের ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেন। ছোট ছেলে মাসুদুজ্জামান থাকেন তার সঙ্গেই। আম্পান প্রলয়ের ক্ষত বাড়ি জুড়ে। ঘরে খাটের অর্ধেকটা ডুবে থাকে পানির নিচে। বাড়ির উঠোন ডুবে আছে পানিতে। সেই পানিতে ভাসছে ছোটদের খেলনা, বইয়ের পাতা, প্লাস্টিকের পুতুল।

দিনের পর দিন পানি বন্দি থাকার কষ্ট থেকে যে প্রশ্নটি রইছউদ্দিন করেছেন, একই প্রশ্ন আম্পান বিপন্ন এলাকার আরও অনেকের। সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুর, আটুলিয়া, কাশিমাড়ী, খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণবেদকাশী, উত্তরবেদকাশী, মহারাজপুরে বাঁধ বিপন্ন এলাকার মানুষেরা প্রশ্ন তুলেছেন- কেন শক্ত বাঁধ হচ্ছে না? আমরা কেন এভাবে বিপন্ন অবস্থায় থাকবো? আসলে এই প্রশ্নটা আমারও, ষাটের দশকে করা বাঁধ যুগের পর যুগ নাজুক রাখার ফলে যে ক্ষতি হয়ে গেল, তার দায়দায়িত্ব কে নিবে? যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে এ প্রশ্নের ‘সংক্ষিপ্ত’ উত্তর রয়েছে- পরিকল্পনা দাখিল করা হলেও শক্ত-মজবুত বাঁধ নির্মাণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া যায় না।

হাঁটছিলাম তরফদার পাড়ার পথ ধরে। ইট বিছানো পথ ডুবে আছে পানির তলায়। বাড়িগুলোতে মানুষজন আছেন অতিকষ্টে। কেউ কেউ ঘরের ভেতরে চৌকি বানিয়ে, কেউবা খাটের ওপরে থাকছেন। জোয়ারের পানি বাড়লে ভোগান্তির শেষ থাকে না। পানি বন্দি বাড়িগুলোতে ডুবে গেছে রান্নার চুলো। রান্নাবান্না করে আনতে হয় অন্য বাড়ি থেকে। রান্নার ব্যবস্থা কীভাবে হয়- প্রশ্নের উত্তরে পানি বন্দি ইশার আলীর বউ শামীমা বেগম বলছিলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর থেকে চুলো পানির তলায়। রান্না করে আনেন শুকনো এলাকায় থাকা বাবার বাড়ি থেকে। মাটির ঘরের দেওয়াল রক্ষা করতে বাবার বাড়ি থেকে আনা টিনের প্রতিরোধ গড়েছেন। তাতেও ঝুঁকি কমছে না। ঘরের সামনে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে শামীমার সঙ্গে কথা বলার সময় কষ্টের কিছু কথা বলতে এগিয়ে এলেন আজাহারুল তরফদারের কলেজ পড়ুয়া মেয়ে মনিরা পারভীন। কী সমস্যা- জানতে চাইলে খানিক দূরে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখালেন। খাবার রান্না করে আনেন একটু দূরে তার নানান ঘর থেকে। মাটির ঘর যে কোন সময় ধ্বসে যেতে পারে। রান্না করা খাবার, সুপেয় পানি আর টয়লেটের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে এই পাড়ায়; যোগ করেন মনিরা।

কাশিমাড়ী ইউনিয়নের প্রধান সড়ক পানির তলায়/ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

নয়নখালী খালের গা ঘেঁসে ফার্নিচার মিস্ত্রি আবদুল মাজেদ রতফদারের ঘর। ছোট ছেলের ঘর, যেখানে আবদুল মাজেদ থাকেন, সে ঘরের চারপাশ পাকা বলে সমস্যা কম। কিন্তু পাশেই বড় ছেলে মতিনুর রহমানের মাটির দেওয়ালের ঘর বেশ নড়বড়ে হয়ে গেছে। পানির চাপে অনেক স্থান ক্ষয়ে যাচ্ছে। সেই ঘরের সামনের বারান্দায় উঁচু করে ইট বিছিয়ে দিচ্ছিলেন মতিনুরের মা মরিয়ম বেগম। এই বাড়িটায় রয়েছে বেশকিছু গাছপালা। বেল, লেবু, বেদানা, কুল, আম, লেবু গাছে লবণের গ্রাস। ঘরের সামনে মুরগির ঘরটি পরিত্যক্ত। মুরগিগুলো বেচে দিয়েছেন। যে উঠোন ছিল শিশুদের খেলার স্থান, যেখানে বিকেলে নারীদের আড্ডা বসতো, খেলা করতো হাঁস-মুরগি, তা এখন পানির তলায়। মানুষগুলোর এই দুর্বিষহ জীবন দেখে প্রকৃতিই যেন কাঁদছে। আবদুল মাজেদ বলছিলেন, করোনার সঙ্গে আম্পানের ভোগান্তি যুক্ত হয়েছে। এবার আমাদের ঈদ হয়নি। আাগের বছরগুলোতে ঈদের দিনের যে সকালটা এই গ্রামে উৎসব বার্তা নিয়ে আসে; এ বছর সে দিনটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। ঘরে আসেনি নতুন কাপড়, রান্না হয়নি সেমাই।

কাশিমাড়ী ইউনিয়নের বড় অংশ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পরের দিন থেকেই পানির তলায়। চিংড়িখালী খালের গোঁড়ায় বাঁধ ধ্বসে ঢুকে পড়েছে পানি। এলাকার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় এক কিলোমিটার রিং বাঁধ দিলেও মাত্র একদিন আগে তার আবার ধ্বসে যায়। রিং বাঁধের ১১টি স্থান ভেঙে যায়। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হিসাবে আম্পানের পরের দিন থেকে ভাঙন এলাকায় পাহারায় আছেন আবদুল গাফফার। তিনি জানালেন, চিংড়িখালী, টেপাখালী আর চড়াগাঙ এই তিনটি নদীর মিলিত স্রোতের প্রবল ধাক্কায় খোলপেটুয়া নদী তীরের মূল বাঁধ ধ্বসে গিয়েছিল। একই স্থান দিয়ে তিন নদীর পানি প্রবাহিত হওয়ায় রিং বাঁধও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

প্রধান সড়ক ধ্বসে পানি প্রবেশ/ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

বাঁধের এই বিপন্নতায় কাশিমাড়ী ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা পানি বন্দি রয়েছে। সে কথাই বলছিলেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এস এম আবদুর রউফ। তিনি বলেন, শক্ত মজবুত বেড়িবাঁধ না থাকার কারণে খোলপেটুয়া নদীতীরের বাঁধ ভেঙে যায়। প্রায় এক কিলোমিটার রিং বাঁধ দেওয়া হলেও তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। ঝাপালী নূরুল ইসলামের দোকানের সামনে তার সঙ্গে আলাপে শংকা কথা তুলে ধরে বলেন, বেড়িবাঁধ এখনই রক্ষা না হলে শ্যামনগরের কাশিমাড়ী, আটুলিয়া, ভুরুলিয়া, মৌতলা, ছনগা এবং কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর, বিষ্ণুপুর, মথুরাপুরের প্রায় ৩ লাখ লোক পানিতে ভাসবে। তিনি বলেন, যথাসময়ে মজবুত বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় এ ধরণের বিপর্যয় নেমে আসে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বাঁধ মজবুত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক হিসেব তুলে ধরে আবদুর রউফ বলেন, এই ১১ বছরে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হওয়া প্রায় ৭৫ কোটি টাকা পানিতে ভেসে গেছে। এগুলো আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে। শুরু করতে হবে শূন্য থেকে। অথচ এই অপচয় রোধে মাত্র তিন-চার কোটি টাকা একসঙ্গে বরাদ্দ দিলে বেড়িবাঁধ ঝুঁকিমুক্ত হতো। এত মানুষকে পানিতে ভাসতে হতো না; এত পরিমাণ স্থাপনার ক্ষতি হতো না।

পানি বন্দি শামীমা বেগম/ ছবি: র, ই, মন্টু, বার্তা২৪.কম

ভরা পূর্ণিমার জো চলছে। জো শুরু হয়েছে আরও একদিন আগে। ঝাপালী বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে খোলপেটুয়ার ওপারে চোখে পড়ে গোলাকার চাঁদ। এ যেন চাঁদ নয়, কাশিমাড়ীর বাসিন্দাদের কাছে ভয়। দুর্যোগকালে পূর্ণিমা আর অমাবস্যার জো বাড়তি বিপদ নিয়ে আসে। যেমনটা এসেছে এবারের পূর্ণিমা। অমাবস্যার আগে পানি বাড়ে; কিন্তু পূর্ণিমার পানি বাড়ে পরে। আম্পান প্রলয়ের পর থেকে সকাল-বিকেল-দুপুর মানুষগুলো যখন পানি কমার আশায় থাকেন; তখন পূর্ণিমার জো তাদের শংকা বাড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রকৃতির নিয়মেই আসে জোয়ার-ভাটা, ফুলে ওঠে খোলপেটুয়া। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। মসজিদে আজান পড়ে। পানের পিক ফেলে রাস্তা ধরে হাঁটাচলা করে মানুষজন, ঘরে দেয়াল ঘড়ির কাটা চলতে থাকে টিকটিক করে, কোকিলের কুহু ডাক নাগরিক মনে দোলা লাগে। তবুও রইছউদ্দিনের কষ্টগুলো থেকে যায় একই মাত্রায়। ঝুলে থাকে কতগুলো প্রশ্ন।

আপনার মতামত লিখুন :