‘আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল পুনরুদ্ধার করব’

শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানী ঢাকাকে সাজাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সম্প্রতি বার্তা২৪.কমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তার সেই পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মেয়র বললেন,‘আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে পুনরুদ্ধার করব।’


বার্তা২৪.কম: আপনি তো করোনা মহামারির মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছেন। এই সংকটে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেছেন?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: হ্যাঁ-করোনা মহামারির মাঝেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছি এবং কাজ করে চলেছি। আমাদের কার্যক্রম মহামারির কারণে অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তারপরেও কিছু কাজকে অগ্রাধিকার দিয়েছি যা প্রথমে করব। এর মধ্যে কোনটা দীর্ঘমেয়াদী, কোনটা মধ্যমেয়াদী-এভাবে ভাগ করে নিয়েছি। অগ্রাধিকারটা নিশ্চিত করেছি। আপনারা জানেন জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মশকের বড় প্রকোপ থাকে। গত কয়েক বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। আমরা সেটাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে মশক কার্যক্রম ঢেলে সাজিয়েছি। গতানুগতিক ধারা ভেঙে দিয়েছি।

বার্তা২৪.কম’র একান্ত সাক্ষাৎকারে মেয়র শেখ তাপস

বার্তা২৪.কম:মশক নিধন কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাটা আসলে কি?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: মশক নিধন কার্যক্রমে বড় সহযোগিতা পেয়েছি। সরকারের নির্দেশনায় আগেই মূল কীটনাশক আনা হয়েছিল। এবারের কীটনাশকের মান অত্যন্ত ভালো। এক্ষেত্রে খুব বড় সহযোগিতা পেয়েছি। তাছাড়া ‘রেডি ফর ইউজ’ মিশ্রনটা যেখানে করে থাকে সেই কীটনাশক কারখানাগুলো আমি নিজে পরিদর্শন করেছি। কারাখানাগুলোর মধ্যে যাদের সক্ষমতা নেই তাদের বাদ দেয়া হচ্ছে।

মশক নিধনে মহাপরিকল্পনা নিয়ে বলেন, আগে গতানুগতিক নিয়ম ছিল ভোর ৮ টায় এক ঘণ্টার মতো শুধু লার্ভিসাইডিং করা হতো। আবার এটা তদারকি করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ঢাকাবাসী ঘুম থেকে ওঠার আগেই এ কার্যক্রম শেষ হতো। এক ঘণ্টার জায়গায় এ কার্যক্রমকে ৪ ঘণ্টা করেছি-সকাল ৯টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত। সুনির্দিষ্ট মশক কর্মী নিয়োগ করেছি। একটি ওয়ার্ডে ৮ জন করে দায়িত্ব পালন করছেন। বিকেলে বা মাগরিবের সময় লোক দেখানো একটি গদবাধা নিয়ম ছিল। মাগরিবের সময় মশা যখন উড়ে যায় তখন ফগিং করে ধোয়া দিয়ে মশক নিধন করা হত। এটাকে ঢেলে সাজিয়েছি। কারণ মশা একবার উড়ে গেলে তখন ফগার মেশিন দিয়ে লাভ হয় না। সেক্ষেত্রে বিকেল আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা বা মাগরিব পর্যন্ত করেছি। যাতে করে মশা বিভিন্ন জায়গায় থাকাকালীনই যেন ওষুধটা দেওয়া হয় তাদের গায়ে লাগে। এটার ব্যাপক সুফল পাচ্ছি। এখন ডেঙ্গুর প্রকোপ তো দূরের কথা তেমন কোন আক্রান্তও শোনা যাচ্ছে না।

বার্তা২৪.কম: ঢাকার খাল, জলাশায় নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই একটা রশি টানাটানি হচ্ছে এ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: আমাদের এখনো অনেক জলাশয় আছে, সেগুলো পরিষ্কার করছি। এখানে বড় প্রতিকূলতা হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নিজস্ব জলাশয়। সেগুলো মশকের প্রজননের একটি বড় উৎস স্থল। ময়লা আবর্জনায় ভরা। এটা আমাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। তারপরও সেগুলো বাদ দিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়গুলো আমরা আয়ত্তে নিচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রে সংস্থার জলাশয়ও পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আমরা চাই এটার দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত। আমরা চাই জলাশয়গুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে। না হলে দেখা যাবে আজকে পরিষ্কার করলাম, আগামী বছরের মধ্যে জলাশয়টা আবার বন্ধ হয়ে গেছে বা ভরে গেছে আবর্জনায়। এজন্য সেগুলোকে নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণে নিতে চাই।

আমরা চাই জলাশয়গুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে

বার্তা২৪.কম: খাল উদ্ধারে আপনার পরিকল্পনা কি?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: আমরা মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম হাতে নিয়েই উপলব্ধি করতে পেরেছি ঢাকাতে এখনো অনেক খাল রয়েছে, অনেক জলাশয় রয়েছে। আমাদের মূল নদী বুড়িগঙ্গা, সেটার একটি আদি চ্যানেল ছিল কামরাঙ্গীর চরের ভেতরে, যার সংযোগ ছিল আবার হাজারীবাগ খালে। এরইমাঝে সেই আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। মিলিটারি ইনস্টিটিউটকে (এমআইএসটি) পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি। তারা কার্যক্রম শুরু করেছে। আমরা সেই আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে পুনরুদ্ধার করব। সাথে সাথে কামরাঙ্গীর চর নিয়েও একটা মহাপরিকল্পনা করছি। যদি আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল প্রবাহটা ‍পুনরুদ্ধার করতে পারি তাহলে তার সাথে হাজারীবাগ খাল সংযোগ হয়ে যাবে। এভাবে আরো কিছু পরিকল্পনা নিয়ে ১০টি অঞ্চলের আওতায় আমরা প্রথম পর্যায়ে একটি করে বড় জলাশয় বা খাল পরিষ্কার করব এবং রক্ষণাবেক্ষণ করব। সেই সঙ্গে নান্দনিকতায় এটি যেন জনগণের ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় যেতে পারে সেই ব্যবস্থাও নেব।

বার্তা২৪.কম: খাল উদ্ধার নিয়ে আগে সব সময় সমন্বয়হীনতার কথা বলা হতো এবং নানারকম চ্যালেঞ্জ ছিল সেগুলো কিভাবে মোকাবিলা করবেন?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: এখানে অনেক বড় প্রতিকূলতা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় যে সকল জলাশয় বা খাল আছে সেগুলো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি, এ সকল খাল-জলাশয় বিভিন্ন সংস্থা তাদের নিজ দায়িত্বে নিয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব তারা সঠিকভাব পালন করছে না। যার কারণে এগুলো যেমনি বদ্ধ হয়ে থাকে তেমনি আবর্জনার ভাগাড় হয়ে যায়। সেই জায়গাটাতে কাজ করতে চাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে প্রথম বছরে ১০টি জলাশয় বা খালকে চিহ্নিত করেছি। আমি আবেদন করব সরকারি উচ্চ পর্যায়ে এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে যে- ঢাকা দক্ষিণের যত জলাশয় আছে খাল আছে এগুলো আমাদের কাছে হস্তান্তর করার যাতে আমরা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে পারি। আমাদের দায়িত্ব এবং আমাদের সম্পত্তি আমাদের কর্তব্য। ২০০৯ সালের আইনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনই ঢাকার অভিভাবক। এটা আইনগতভাবে আমাদেরই দেখার দায়িত্ব-কর্তব্য। ওয়াসা ‍শুধু পয়ঃনিষ্কাশন করবে। কিন্তু শুধু ওয়াসা নয় গণপূর্তের অনেক জলাশয় রয়েছে রাজউকের কাছে, কিন্তু তারা সেগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছে না। আমরা চাইব পুরোটাই আমাদের দেয়া হোক।

আমরা চাই কিছু রাস্তা শুধু উন্মুক্ত থাকবে, মানুষ হেঁটে চলবে, কিছু রাস্তায় ধীর গতির যানবাহন চলবে, কিছু রাস্তায় দ্রুতগতির যানবাহন চলবে

বার্তা২৪.কম: খাল আপনাদের আয়ত্তে নিতে যারা ঊর্ধ্বতন রয়েছেন তাদের সঙ্গে আপনাদের কথা হয়েছে?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: অন্য সংস্থার সাথে কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে বিষয়গুলো তুলে ধরব। আমরা আগে চিহ্নিত করছি, পরে প্রকল্প আকারে গ্রহণ করছি। দীর্ঘ মেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও আমরা নিবো।

বার্তা২৪.কম: সিটিকে যানজট মুক্ত করার পরিকল্পনাগুলো কি কি?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: খুবই দুঃখজনক যানজট নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। নির্বাচনী ইশতিহারে বলেছি সচল ঢাকা গড়ে তুলতে হবে। আনিসুল হক যে পরিকল্পনা নিয়েছিল তা অত্যন্ত প্রশংসিত পদক্ষেপ। সেটাকে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করব। করোনা মহামারির কারণে আলোচনার সুযোগটা কমেছে। আশা করি ঈদের পর আগস্ট মাস থেকে সুযোগ হলে এ ব্যাপারে কার্যক্রম নিতে পারব।যানজট নিয়ে একটি  ‍কৃর্তপক্ষ করা হচ্ছে; সেটা অবশ্য সড়ক জনপদ বিভাগের অধীনে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একটি কমিটি করা হয়েছে ঢাকা দক্ষিণের মেয়রকে যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা সেটা নিয়ে কাজ শুরু করছি। আমরা কিছু রাস্তার কার্যকারিতা নির্ণয় করতে চাই। একটি সড়কে কতগুলো গণপরিবন দরকার, সেই রাস্তার বা সেই এলাকার জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য, তাদের চলাচলের জন্য সেগুলো জরিপ করা, কার্যকারিতা নির্ণয় করা দরকার। জরিপ অনুসারে সেখানে গণপরিবহন দেব। আমরা চাই কিছু রাস্তা শুধু উন্মুক্ত থাকবে, মানুষ হেঁটে চলবে। কিছু রাস্তা থাকবে যেখানে ধীর গতির যানবাহন চলবে, কিছু রাস্তায় দ্রুতগতির যানবাহন চলবে। যে রাস্তা মেট্রোরেল চালু হচ্ছে, তখন সেই রাস্তায় অন্য গণপরিবহন কতটা প্রয়োজন সেটাও নির্ণয় করতে হবে।

বার্তা২৪.কম: পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আলাদা পরিকল্পনার কথা বলছেন। আপনি বিভিন্ন সময় বলেছেন আগের মেয়াদে তেমন কাজ হয়নি। অথচ ডিএসসিসিতে ঢুকতেই দেখা যায় ‘পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশ্বরেকর্ডের অংশীদার আপনার’ ব্যানার। আপনার কথার সাথে এটার যৌক্তিকতা কতটুকু?

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: আমি যদি ওটা সড়িয়ে ফেলতাম তাহলে মানুষ বলত যে পুরান মেয়রের সব বাদ দিয়ে দিচ্ছি। দু’জনকে বাদ দিয়েছি আমার লোক আনার জন্য ওরকম শুনেছি, ব্যানারটা সরিয়ে ফেললে সবাই বলত আমার ছবি টাঙানোর জন্য সরিয়েছি। তবে ব্যানারটা আছে থাকুক আর কিছুদিন। মানুষ মনে করুক যে কি ছিল। নগর ভবনের পরিবেশটা দেখেছেন কি নোংরা করে রেখেছে। ভেতরে যান আরো নোংরা। পেছনে আবর্জনার স্তুপ। বাস টার্মিনাল হিসেবে ফুলবাড়িয়া সড়কটা  ব্যবহার করা হয় সেটার অবস্থাও যত্রতত্র। আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি আব্দুল গণি সড়কটা সচল করার। কিছুদিনের মধ্যে সেটা বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। নগর ভবনটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কবর কারণ বিদেশিরা আসলে যেন ভালো পরিবেশ দেখে।

বার্তা২৪.কম: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে বার্তা২৪.কম’ র পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস: আপনার মাধ্যমে বার্তা২৪.কম’র সকলকে ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন:‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ না করলে সংস্থা চালাতে পারবেন না

আপনার মতামত লিখুন :