সুকীর্তির মধ্যে গুঞ্জরিত হবেন বাবু ভাই

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম 
সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু

সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু

  • Font increase
  • Font Decrease

সাংবাদিক রাশীদ উন নবী বাবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ও সম্পর্ককে 'নিবিড়' বলা যাবেনা। আবার 'আলগা' বলারও উপায় নেই। এই দুইয়ের মাঝামাঝিতে নৈকট্য ও সামাজিক সদ্ভাবের সুস্থতায় চিহ্নিত করা যায় সেই সম্পর্কের ধরণকে।

শুরুটা মধ্য আশি দশকে। ঢাকার সাংস্কৃতিক ভূগোলের পরিধি তখন অচেনা জগতের দিকে প্রলম্বিত ছিলনা। মোটের উপর কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক তথা লেখালেখির মানুষগুলো কয়েকটি এলাকা ও হাউসের মধ্যেই আবর্তিত হতেন। ফলে সবাই কমবেশি চেনাজানার আওতায় ছিলেন।

বাবু ভাইকেও দেখেছি, কথাবার্তা হয়েছে। আমি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তিনি তার ছোট বোনের ভর্তির বিষয়ে কয়েকবার ক্যাম্পাসে এলেন। সজ্জন, সপ্রতিভ মানুষের সেই সঙ্গ সহজে বিস্মৃত হওয়ার নয়।

পরে, ইত্তেফাক ভবনে সাপ্তাহিক 'রোববার' পত্রিকায় কাজের সময় তাকে পেয়েছি পাশের ইনকিলাব হাউজের সাপ্তাহিক 'পূর্ণিমা'য়। ইনকিলাব নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত হলেও 'পূর্ণিমা' ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। 'রোববার'-এর অন্যতম কুশীলব, ফরিদপুরের মানুষ, কবি আতাহার খানের সুবাদে 'পূর্ণিমা' লেখালেখিতে জড়িত নানা মতের মানুষের প্রিয় আড্ডাস্থল ছিল। সেখানে বাবু ভাইকে একমনে কাজ করতে দেখেছি।

তারপর আমি চট্টগ্রামে চলে আসি নব্বই দশকের শুরুতে। তখন দৈনিক বাংলার বিখ্যাত সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন আমাকে 'চট্টগ্রাম নোটবুক' নামে একটি সাপ্তাহিক ফিচার করতে বলেন। সেখানে বাবু ভাইকে দেখলাম বার্তা সম্পাদক।

বলতে গেলে সেটাই তার সঙ্গে শেষ প্রাতিষ্ঠানিক দেখা। তারপর অনেক বার আকস্মিক ও অনির্ধারিত ভাবে  দেখা হয়েছে পথেঘাটে, চলার পথে, শাহবাগে, আজিজে, বইমেলায়। সামান্য কুশল বিনিময়, হ্যালো, হাই ইত্যাদিতে পুরনো পরিচয় উদযাপন করতে হয়েছে উভয়ের ব্যস্ততার মধ্যে।

ততদিনে তিনি আরো অনেক জায়গায় কাজ করেছেন বলে খবর পেয়েছি। চার দশকের বেশি সময়ে সাংবাদিকতায় থাকা বাবু ভাই আজকের কাগজ, দৈনিক বাংলা. ইত্তেফাক, সমকাল, যুগান্তর, আমার দেশ, ইনকিলাব, বাংলার বাণী, দেশ বাংলায় কাজের সূত্রে বার্তা সম্পাদক, নির্বাহী সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। কয়েকটি ‘মিডিয়া হাউজ’ গঠনেও তার ভূমিকার কথা শুনেছি।

শেষ দিকে তিনি দৈনিক সকালের খবরের সম্পাদক ছিলেন এবং সর্বশেষে প্রকাশিতব্য দৈনিক আমার দিন পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন এনটিভি ও চ্যানেল ওয়ানে বার্তা বিভাগের শীর্ষ পদেও কাজ করেছেন।

সন্দেহ নেই, সাংবাদিকতার চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই চলেছেন তিনি। যদিও তার পেশার শুরু অনামা ও ছোট কাগজে।  ১৯৫৬ সালের ১২ মার্চ বগুড়ায় জন্ম ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর ১৯৭৪ সালে বগুড়ার দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকা দিয়ে তার সাংবাদিকতার শুরু। তারপর ঢাকায় তার শুরুটিও খুব উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু তিনি পরিশ্রম ও কর্ম গুণে উল্লেখ্যযোগ্য হতে সক্ষম হয় এবং দেশের নেতৃস্থানীয় মিডিয়ায় নিজের গুরুত্বপূর্ণ স্থান আদায় করে নেন।

তার এই উত্তরণ ও বিকাশের দিকটি আমি মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছি। আরেকটি বিষয় আমার চোখে পড়েছে, তাহলো তিনি কোথাও দীর্ঘদিন থাকেননি। এটা তার স্থিরতার অভাব, গতি, নাকি অন্যকিছু, আমি জানি না। কারণ, তার সঙ্গে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই এবং পেশাগতভাবেও আমি তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম না। ফলে তার কর্মকীর্তির সবলতা ও দুর্বলতার বিষয়গুলো আমার অজানা, অদেখা। তার ও তাকে ঘিরে ঘটনাক্রমের রসায়ন সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল নই আমি।

তদুপরি তার মতো একজন পুরনো চেনা, সজ্জন মানুষের মৃত্যুতে (৮ জুলাই) আমি স্বাভাবিকভাবেই  শোকাভিভূত হয়েছি। তবে তার সম্পর্কে মূলস্রোতের কোনো মিডিয়ায় বিশেষ কোনো স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নমূলক লেখা আমার চোখে না পড়লেও  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভক্ত, সুহৃদ, সহকর্মীদের অনেক পোস্ট চোখে পড়েছে। ৬৫ বছরের জীবনে প্রায়-চল্লিশ বছরের পেশাকালে তিনি অনেককে তার সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছেন, এটা কম পাওয়া নয়।

বাবু ভাইয়ের মৃত্যুতে আমার মনে পড়েছে স্মরণীয় পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র 'মেঘে ঢাকা তারা'র কথা। কিশোরগঞ্জের মাস্টার মশাইয়ের রিফিউজি পরিবারের শঙ্কর, নীতা, গীতা, মন্টুর বাঁচার  লড়াই কলকাতার উদ্বাস্তু কলোনির দমবন্ধ পরিবেশে আবর্তিত হয়েছে যে মর্মস্পর্শী সিনেমায়, তাতে অনেক সম্ভবনা মেঘের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা আছে। আর আছে মহাকালের রথের চাপায় ইতিহাসের অনেক অধ্যায়ের হারিয়ে যাওয়ার বিষাদ।

জানিনা, মহাকাল বা ইতিহাস বাবু ভাই ও তার মতো লড়াই করতে করতে এগিয়ে যাওয়া সাংবাদিকদের কথা কতটুকু মনে রাখবে! কেউ তো জানেনা, ইতিহাস কাকে মনে রাখবে, কাকে রাখবেনা। ইতিহাসের এই রহস্য না জেনেই মানুষকে পাড়ি দিতে হয় জীবনের প্রান্ত থেকে মৃত্যুর উপান্তে।

তারপরও, মানুষের সুকীর্তির পরিসমাপ্তি কখনোই ঘটেনা। কোনো না কোনোভাবে সেগুলো জাগরিত থাকেই। বাবু ভাইও নিশ্চয় তার সুকীর্তির মধ্যে গুঞ্জরিত হবেন।

আপনার মতামত লিখুন :