মানব ও অর্থ পাচাররোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মানব ও অর্থ পাচারের মত সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা ও তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার এবং সচেতনতা তৈরিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য।

নির্ধারিত ক্ষেত্রগুলোতে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তার পাশাপাশি অপরাধ মোকাবেলায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও মতামত প্রদানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় নাগরিক সমাজ কার্যকর অবদান রাখতে পারে।

রোববার (১২ জুলাই) ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও কুয়েত ট্রান্সপারেন্সি সোসাইটি (কেটিএস) আয়োজিত 'সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলায় নাগরিক সমাজের ভূমিকা' শীর্ষক এক যৌথ ভার্চুয়াল সেমিনারে আলোচকরা এসব মন্তব্য করেন।

সেমিনারের সূচনা বক্তব্যে টিআই চেয়ারপার্সন ডেলিয়া ফ্যারাইরা রোবিও দুর্নীতি ও অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং)-এর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ এবং এমন অপরাধ মোকাবেলায় টিআই'র নানাবিধ কার্যক্রম ও উদ্যোগ তুলে ধরেন। এসময় তিনি বলেন, 'দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে অর্থ পাচার বন্ধ করতেই হবে। সম্মিলিত ও আন্তঃদেশীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এধরণের সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন করা সম্ভব। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে সঠিক নীতি-কাঠামো ও আইন এবং সেগুলোর যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ জরুরি। বিশেষ করে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সকল প্রকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। এজন্য কর্তৃপক্ষের আইনি ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে'।

কেটিএস এর চেয়ারপার্সন জনাব মাজিদ আল মুতাইরি সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহুল আলোচিত ও প্রচারিত অর্থ ও মানব পাচার, অবৈধ সুবিধা লাভ এবং আত্মসাৎের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এ ধরণের অপরাধ প্রতিরোধে কেটিএস-এর নানা প্রয়াস তুলে ধরেন। কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের অর্থ ও মানব পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'কূটনৈতিক দায়মুক্তি না থাকলে হয়তো কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও আটক করা হতো'।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান 'অর্থ ও মানব পাচারে জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ: প্রভাব ও সম্ভাবনা' বিষয়ে আলোচনা করেন। এসময় তিনি জাতীয় সংসদের প্রায় ৬২ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ার তথ্য উল্লেখ করে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অধিক মাত্রায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তিনি আরও বলেন, 'কুয়েতে আটক বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ছাড়াও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের একাধিক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ ও মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্যাসিনো ব্যবসা ও নানা অবৈধ পন্থায় অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ আছে। অর্থ ও মানব পাচারের মত অপরাধে কুয়েতে একজন বাংলাদেশি সংসদ সদস্যের আটক হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর। এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে দুর্বৃত্তায়নের একটি অসম্মানজনক দৃষ্টান্তও বটে। এতে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রবাসে বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ নষ্ট হওয়া এবং তাদের চাকুরিচ্যুতির আশংকা তৈরি করেছে। যার ফলে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির আশংকাও অবাস্তব নয়'।

অর্থ ও মানব পাচারের মত সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের ও আন্তর্জাতিক আইন ও বিধিসমূহের উল্লেখ করে ড. জামান আরো বলেন, এজন্য নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সবধরনের পরিচয়, ভয়-ভীতি, চাপ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে থেকে বাংলাদেশ ও কুয়েত উভয় দেশের সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব যেন উভয় দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও কুয়েতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপর না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থেকে অপরাধ মোকাবেলায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অফ কুয়েতের সাবেক সদস্য ড. হাস্সান জোহার সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে আইনসভার সদস্যদের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা করেন। এসময় তিনি অর্থ ও মানব পাচারের ঘটনায় কুয়েতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তদারকি সংস্থাগুলোর এ ধরণের অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা পালনে অক্ষমতা এবং দুর্নীতির মামলায় কুয়েতের সংসদ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, 'দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্বে নিয়োজিতরা সুস্পষ্টভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের পুরো ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো জোরদার করতে হবে'।

ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) এর সম্মানসূচক প্রেসিডেন্ট জনাব সাবের হোসেন চৌধুরী, এমপি বলেন, 'দুর্নীতিও কোভিডের মতই একধরনের ভাইরাস। উৎস থেকেই এই ভাইরাস নির্মূল করতে না পারলে সাধারণ জনগণও দুর্নীতিতে আক্রান্ত ও সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই উৎস থেকেই দুর্নীতি নির্মূলে তৎপর হতে হবে। এজন্য কাউকে ছাড় দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের অনেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাই দুর্নীতির ঘটনা এবং তা প্রতিরোধে আন্তঃদেশীয় অভিজ্ঞতা বিনিময় জরুরি; বিশেষ করে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে তা খুবই কার্যকরী হতে পারে।

কুয়েত ইউনিভার্সটি- ল স্কুলের ড. দালাল আল সাইফ 'আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন চুক্তি' বিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশন বাস্তবায়নে কুয়েতের ফৌজদারি আইনের ঘাটতি সম্পর্কে আলোচনা করেন। এসময় তিনি সাম্প্রতিক মানব ও অর্থ পাচারের ঘটনায় কুয়েতি নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরে কুয়েতের প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের অপরিহার্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।