কাঁদো বাঙালি কাঁদো

রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষে ঐতিহাসিক মুজিবর্ষের এই বিষাদময় আগস্ট মাসে বাঙালি জাতির প্রতিটি সদস্যের হৃদয় হু হু করে কাঁদে সুতীব্র বেদনায়। বাঙালির ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের কলঙ্ক-লিপ্ত আগস্ট মাসের পনের তারিখ আজ। ১৯৭৫ সালের এই কালো দিনে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে।

জাতির পিতাকে পরিবার ও স্বজনসহ হারানোর বেদনায় মথিত ভয়ঙ্কর শোকের মাস আগস্ট। আগস্টের এই দুঃসহ দিনে এক বুক বেদনা আর শোকের স্মৃতি ঘিরে রাখে প্রতিটি বাঙালিকে। আগস্টে বাঙালি শোকে মুহ্যমান হয়। সর্বত্র ধ্বনিত হয়, “কাঁদো বাঙালি কাঁদো।”

আগস্ট মাসে শুধু বাঙালির ভাগ্যাকাশেই নেমে আসে না দুর্যোগের ঘনঘটা, সমগ্র বাংলাদেশের মানচিত্রেই পড়ে শোকের গাঢ় ছায়া। বাঙালির সমস্ত হদয়ে পুঞ্জীভূত হয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বেদনার স্রোত। সবার অন্তরে জাগে শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রতীতি। জাগে প্রতিশোধের দুর্নিবার স্পৃহা।

কারণ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু অন্য সকল মৃত্যুর চেয়ে আলাদা, অন্যরকম, বড় বেদনার, বড় কষ্টের। বঙ্গবন্ধু মৃত্যু বরণ করেননি। তাকে হত্যা করা হয়েছে রাতের অন্ধকারে, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, কাপুরুষোচিত আক্রমণের দ্বারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অকুতোভয়। নৈতিকভাবে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। নীতিতে ছিলেন অটল। রাজনৈতিক আদর্শে অবিচল। তিনি ছিলেন হিমালয়ের মতো সমুন্নত। কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য অসম্ভব। এমনকি, মৃত্যুকেও তিনি কোনোদিন ভয় পাননি। ভয় পাননি জেল জুলুমকে। নিজের কথা, পরিবার পরিজনের কথা ভাবেননি। ভেবেছিলেন শুধু দেশের কথা। দেশের মানুষের কথা। বাংলাদেশ ও বাঙালির কথা।

পুরো পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু দেশ জুড়ে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছেন। মানুষকে জাগ্রত করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উজ্জীবিত করেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে আবার জনসভায় যোগ দিতেন। আবার গ্রেপ্তার হতেন। কখনো দেখা যেত জেল থেকে বের হয়ে জেলগেটেই জনতার উদ্দেশ্যে জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার ফাঁসি হতে পারত। ১৯৭১ সালে তার ফাঁসি হতে পারত পাকিস্তানের কারাগারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনো মৃত্যুভয়ে পিছপা হননি।

১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর বর্বর আঘাতে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল তখন হত্যা, ধর্ষণ লুটতরাজের প্রতিবাদে ঝলসে উঠল বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মাত্র নয় মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এদেশ স্বাধীন করেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ও তাদের এদেশীয় দোসররা পরাজয় মেনে নিলেও এই পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারেনি। ধ্বংসস্তূপ থেকে যখন বাংলাদেশ উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে, বাংলার মানুষ যখন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে, তখনই স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত অপশক্তি বর্বর আঘাত হানে। নীল নকশার অংশ হিসেবে পঁচাত্তরের পনের আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে পরিবার ও স্বজনসহ। সেদিন ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে হত্যা করা হয় বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে। হত্যা করা হয় ছেলে শেখ জামাল, শেখ কামাল, শেখ রাসেলকে, হত্যা করা হয় পুত্রবধু সুলতানা কামাল, রোজী জামালকে। হত্যা করা হয় সুকান্ত বাবু, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, আরজু মনিকে।

ঘৃণ্য পনের আগস্টের আক্রমণ শুধু বিপথগামী উচ্চাভিলাসী সেনা কর্মকর্তাদের আক্রমন ছিল না, এর পেছনে ছিল দেশি বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়াও ছিল সেই চক্রান্তের অন্যতম অংশ। বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমতায় আনাই ছিল পনের আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য।

কিন্তু বিশ্ব বিবেক, বাঙালি জাতি এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রুখে দাঁড়িয়েছে। হত্যাকাণ্ডের যে খলনায়কদের বিচার না করে পুরস্কৃত করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছে। জাতিকে করেছে কলঙ্কমুক্ত।

পনের আগস্টের ঘাতকচক্র এখনো হত্যা ও ষড়যন্ত্রের পথে চলছে। বোমা ও গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে রক্তাক্ত করছে। পনের আগস্টের শোককে তাই শক্তিতে পরিণত করতে হবে সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রত্যয়ে। যার কারণে আমরা পেয়েছি একটি নতুন দেশ, পেয়েছি লাল সবুজের কাঙ্ক্ষিত পতাকা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সেই মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হয়েছে এদেশের ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে পড়ে। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি সেই হত্যাকারী-ষড়যন্ত্রকারীদের কোনোদিনও ক্ষমা করবে না। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নিহত সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি বাঙালি জাতি হত্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রুখে দাঁড়ানোর শপথে বলীয়ান হয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করবে।