পার্টি নিয়ে আগ্রহ, অবহেলায় এরশাদ



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

  • Font increase
  • Font Decrease

১৪ জুলাই সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। করোনা মহামারির কারণে প্রথম মৃত্যু যথাযথভাবে পালন করার সুযোগ ছিল না। একই কারণে দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকীও সীমিত পরিসরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করার খবর পাওয়া গেছে।

জাতীয় পার্টি এরশাদের দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে পনের দিনব্যাপী নানান কর্মসূচি পালন করে আসছে। জাপার অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনগুলো পালা করে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আসছে। ১৪ জুলাইও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে। অন্যদিকে রওশন এরশাদ বিগত বছরের মতো এ বছরও তার গুলশানের বাসায় দোয়া মাহফিলের আয়োজনের রেখেছেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট এরশাদের বারিধারার বাসভবনে পৃথকভাবে কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন।

কেমন ছিল এরশাদের শেষ দিনগুলি

২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর ইমানুয়েল কনভেনশন সেন্টারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সামনে সবশেষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য রেখেছিলেন এরশাদ। এরপর অসুস্থতার কারণে আর কোনো কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায় নি। ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর গাড়িতে করে বনানী অফিসের সামনে এলেও রাস্তার উপর গাড়িতে বসেই কথা বলে চলে যান। ১০ ডিসেম্বর চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান এরশাদ। ভোটের মাত্র ৩ দিন আগে ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরলেও নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে যোগ দেননি। এমনকি নিজের ভোটও দিতে যেতে পারেননি সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।

ভোটের পর পৃথক সময়ে হুইল চেয়ারে করে গিয়ে শপথ নেন। ২০ জানুয়ারি ফের সিঙ্গাপুরে যান চিকিৎসার জন্য। ৪ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে সংসদ অধিবেশনে মাত্র একদিনের জন্য হাজির হয়েছিলেন হুইল চেয়ারে ভর করে। এরপর বাসা হাসপাতালের মধ্যে আসা যাওয়া ছিল। সর্বশেষ ২৬ জুন (২০১৯) স্বাস্থ্যের অবনতি হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন। ১৪ জুলাই ভোর রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর দাফন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়, প্রথমে বলা হয় বনানীতে সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। রংপুরের জনগণের আন্দোলনের মুখে র্ংপুর পল্লী নিবাসে দাফন করা হয়।

অনেকে ধারণা করেছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর বিভক্ত হয়ে পড়বে জাতীয় পার্টি। অনেকটা শুরুও হয়েছিল সেই প্রক্রিয়া। বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য দেখা যায়। জিএম কাদের নিজে হতে চেয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। আবার রওশন এরশাদও স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দিয়েছিলেন। এতে টানাপোড়েন শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এরশাদের মৃত্যুকে শূন্য হওয়া জাতীয় সংদের বিরোধীদলীয় নেতার পদে রওশন এরশাদেই নিয়োগ পান। ওই সময়ে পার্টি ভেঙে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সেই ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয় দলটি।

তবে ইদানিং নানা কানঘুষা চলছে নতুন পার্টি গঠনের বিষয়ে। সেখানে নাকি জিএম কাদেরকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হতে পারে। বিশেষ করে স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং তালাকপ্রাপ্তা বিদিশা সিদ্দিক নতুন পার্টি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জোর গুঞ্জন রয়েছে। বিদিশা সিদ্দিক অবশ্য ইদানিং মিডিয়াতে খোলাখুলিই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। রওশন এরশাদকে সঙ্গে নিয়েই পার্টি করতে চান বলে জানিয়েছেন। তবে এখন পর‌্যন্ত রওশন এরশাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি।

এরশাদের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় পার্টির কাউন্সিলে জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান হন। আর রওশন এরশাদকে করা হয় প্রধানপৃষ্ঠপোষক। সেই পদবী কোনদিন ব্যবহার করতে দেখা যায় নি রওশন এরশাদকে। এরপর থেকে পার্টির কোনো কর্মসূচিতেই তাকে দেখা যায় নি। জনশ্রুতি রয়েছে প্রধানপৃষ্ঠপোষক পদটি তার মোটেই পছন্দের নয়।

এরশাদের মৃত্যুর পর তার পার্টি নিয়ে যতোটা আগ্রহ অন্যান্য ইস্যুতে ততোটাই অবহেলা লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে এরশাদের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি সবকিছু শেষ হলেও ঝুলে রয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবদ্দশায় বইটির প্রচ্ছদসহ সবকিছু চূড়ান্ত করে এনেছিলেন। তখনেই প্রিন্টে দেওয়ার কথা, সপ্তাহ খানেক সময় পেলে প্রিন্ট করেই ফেলতেন। সেই বইটির বিষয়ে জিএম কাদের, না রওশন, না আছে বিদিশার কোনো উদ্যোগ।মৃত্যুর পর এরশাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে রংপুরে মিউজিয়াম করার ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই আলোচনাও হাওয়ার মিলিয়ে গেছে। এরশাদ জীবদ্দশায়  সমস্ত স্থাবর অস্থাবর দিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট গঠন করেন। সেই ট্রাস্টের আয় দিয়ে এরিখ এরশাদ ভরণপোষণ ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে। সে কারণে জাতীয় পার্টি কিছুটা আর্থিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এরশাদের মৃত্যুর পর বিদিশা সিদ্দিক কৌশলে ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

এরশাদের পৈত্রিক নিবাস ছিল ভারতের কুচবিহারের দিনহাটায়। ১৯৩০ সালে ২০ মার্চে নানার বাড়ি কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (পেয়ারা)। ভাইদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন এরশাদ। এরশাদ এসএসসি পাশ করেন পৈত্রিক নিবাস দিনহাটা থেকেই। এসএসসি পাশের পর রংপুর কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে ভারতে প্রশিক্ষণকালীন সময়ে পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল ও উপ-সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চে সামরিক শাসকের প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হন। তার ক্ষমতাগ্রহণ নিয়ে দুই ধরণের বক্তব্য রয়েছে। এরশাদ দাবি করতেন, প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারের অনুরোধক্রমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। আর বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে বন্দুকের নলের মুখে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

সামরিক শাসক থাকা অবস্থায় ১৯৮৪ সালে নির্বাচন দেন। তখন সব রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জণ করলে স্থগিত হয়ে যায় নির্বাচন। এরপর ১৯৮৬ সালে ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।  এরশাদের দাবি ছিলো, তিনি ব্যারাকে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু রাজনৈতিকদলগুলো অংশ না নেওয়ায় সংকটের কারণে নিজে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। আটক হয়ে টানা ৬ বছর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হন। ১৯৯০ সালে জেলে থেকেও রংপুরের ৫টি আসনে জয়ী হন।

২০১৪ সালে অনেক নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে রংপুর থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের (মন্ত্রী মর্যাদায়) দায়িত্ব পালন করেন। চলতি সংসদে রংপুর -৩ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন।