দেবর-ভাবির সমঝোতা, জাপার আনুষ্ঠানিকতার কাউন্সিল

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বারতা২৪.কম, ঢাকা
জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ

জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ

  • Font increase
  • Font Decrease

দেবর জিএম কাদের ও ভাবি রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতা হওয়ায় জাতীয় পার্টির (জাপা) কাউন্সিল এখন অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা মনে করা হচ্ছে। দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদ পেতে যাচ্ছেন রওশন আর চেয়ারম্যান তথা প্রধান নির্বাহী থাকছেন জিএম কাদের। গঠনতন্ত্রের নতুন সংশোধনী কাউন্সিলে তোলা হবে। অনুমোদিত হলে আগামীতে দেবর-ভাবি পরামর্শ করে জাতীয় পার্টি পরিচালনা করবেন। এমন স্বত্বই থাকছে বলে জানা গেছে।

এরশাদ বিহীন জাতীয় পার্টির প্রথম কাউন্সিলে শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) এমন সিদ্ধান্ত আসছে—এটা প্রায় নিশ্চিত করে বলা চলে। প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত, ৮ হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেট কাউন্সিল অধিবেশনে উপস্থিত থাকবেন। এর বাইরে দলের অন্যান্য কর্মীদের ডাকা না হলেও ঢাকা ও তার আশপাশ থেকে জিএম কাদেরের সমর্থনে একটি গোপন শোডাউনের প্রস্তুতির কথা জানা গেছে।

এরশাদ জীবদ্দশায় পার্টির ভবিষ্যত চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করে গেছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণার সাংগঠনিক আদেশে এরশাদ বলে গেছেন, আমার মৃত্যূর পর কাউন্সিলররা যেন জিএম কাদেরকেই পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করেন। এখনও সেটাই হতে যাচ্ছে। তবে মাঝে রওশন এরশাদ বাগড়া দেওয়ায় প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রওশন এরশাদ আমৃত্যু পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক থাকবেন। তার অবর্তমানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই পদটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

দেবর-ভাবির মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই দূরত্ব বেড়ে যায়। এরশাদের সঙ্গে একাট্টা হয়ে ওই নির্বাচন বর্জন করেছিলেন জিএম কাদের। আর রওশন এরশাদ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে থেকে যান। ভোটের পর পুরো মেয়াদে একইসঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকে জাপা। এই পন্থার সমালোচনায় মুখর ছিলেন জিএম কাদের। এতে রওশনের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

ওই সময়েই ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে জিএম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। পরে রওশনপন্থীদের চাপের মুখে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর ২০১৮ সালে যখন জিএম কাদেরকে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন তখন রওশনপন্থীদের চাপের মুখে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এরশাদ। পরে রংপুরের নেতাদের আন্দোলনের মুখে ছোটো ভাই জিএম কাদেরকে দ্বিতীয় দফায় ভারপ্রাপ্ত ও ভবিষ্যত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন তিনি।

এরশাদের মৃত্যুর পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার মনোনয়ন প্রশ্নে দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়ে পড়ে। জিএম কাদের ও রওশন দুজনেই বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ার নিয়ে টানাটানি শুরু করেন। অবশেষে জয়ী হন রওশন। প্রকাশ্য গ্রুপিং না থাকলেও ভেতরে ভেতরে একটি চাপা ক্ষোভ বিরাজমান।

কাউন্সিল নিয়ে নানা রকম রশি টানাটানি শুরু হয়ে যায়। অবশেষে সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি ঠাণ্ডা হয়েছে বলে পার্টি সূত্র জানিয়েছে। আগের দুই পদের সঙ্গে নতুন করে আরও ৫টিসহ মোট ৭ জন থাকছেন কো-চেয়ারম্যান। এসব পদে প্রেসিডয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম শোনা যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও অধিকাংশ নেতাকর্মী জিএম কাদেরের পক্ষে একাট্টা। তারা জিএম কাদেরকেই চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান। কৌশল হিসেবে কাউন্সিলের শো-ডাউন থেকে সরে এসেছে জাতীয় পার্টি। শুধু ৮ হাজার কাউন্সিলর-ডেলিগেটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে ভোট করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন জিএম কাদের। পাশাপাশি মহাসচিব পদ নিয়ে জটিলতায় জড়াতে চায় না জাপা। কাউন্সিলে মহাসচিব পদে ঘোষণা না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

 ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। ওই জোটের শরিক ছিল— জনদল, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বিএনপি (শাহ) মুসলিম লীগ (সা)। জাতীয় ফ্রন্ট গঠনের ৪ মাস ১৪ দিনের মাথায় (১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি) ফ্রন্ট বিলুপ্ত করে জাতীয় পার্টি আত্মপ্রকাশ করে। শরিক দলের নেতারা তাদের নিজেদের দল বিলুপ্ত করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন।

নবগঠিত পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং মহাসচিব নিযুক্ত হন অধ্যাপক এম এ মতিন। পার্টির কাউন্সিল না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আনোয়ার জাহিদ। ২১ প্রেসিডিয়ামসহ ৬০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়।

জাতীয় পার্টি শুরু থেকেই এরশাদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে আসছে। দুই-একবার যারাই এরশাদের সিদ্ধান্তে দ্বিমত করতে গেছেন তাদের দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক নেতা একাধিক দফায় শোকজ নোটিশ পেয়েছেন বা সাময়িক বহিষ্কারের শিকার হয়েছেন। শোকজের ক্ষেত্রে এরশাদ ছাড় দেননি আপন ভাই জিএম কাদের ও সহধর্মিনী বেগম রওশন এরশাদকেও।

নানা কারণে জাতীয় পার্টির মতো আর কোনো রাজনৈতিক দল সম্ভবত এতো বেশি দফায় ভাঙনের শিকার হয়নি। জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে গিয়ে প্রথম পৃথক জাতীয় পার্টি (মিম) গঠন করেন মিজানুর রহমান ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। দ্বিতীয় দফায় ভাঙনের শিকার হয় নাজিউর রহমান মঞ্জু ও কাজী ফিরোজ রশীদের নেতৃত্বে। সর্বশেষ পৃথক জাতীয় পার্টি গঠন করেন প্রয়াত কাজী জাফর আহমেদ। জাতীয় পার্টিতে বর্তমানে জাপা, জেপি, বিজেপি ও জাপা (জাফর) নামে ৪টি ধারা বিদ্যমান।

চারটি খণ্ডিত অংশের মধ্যে জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় পার্টি (জেপি) আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অপর দুই অংশ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও জাতীয় পার্টি (জাফর) বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত।

বিগত নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। জোট থেকে ২৬টি আসন দেওয়া হয়। আর ১৪৬টি আসন রাখা হয় উন্মুক্ত। জোটগত আসনে ২১টি, উন্মুক্ত ১টি নিয়ে মোট ২২টি আসনে বিজয়ী হন এরশাদের প্রার্থীরা। সংসদে দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা  ৪টি। মোট ২৬টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের চেয়ার অলংকৃত করে আসছে জাতীয় পার্টি।

আপনার মতামত লিখুন :