পদের ভারে ন্যুব্জ জাপার নির্বাহী কমিটি

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, বার্তা২৪.কম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, ঢাকা
জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি

জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রচলিত রীতি-নীতির বাইরে গিয়ে একেবারে ভিন্নতর একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেছে জাতীয় পার্টি। আর এটি করতে গিয়ে হাস্যস্পদ করে ফেলা হয়েছে পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো।

বলা যায় পদের ভারে ন্যুব্জ জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি। যার বেশিরভাগের নেই সুনির্দিষ্ট কোনো দায়-দায়িত্ব। কার্যত আলঙ্কারিক হয়ে পড়েছে এসব নেতাদের অবস্থান। সভা সমাবেশে সুযোগ পেলে বক্তৃতা দেওয়া আর না হলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রদর্শন করা ছাড়া তেমন কোনও কাজ দৃশ্যমান নয়।

যে গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে এসব আলঙ্কারিক পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই গঠনতন্ত্রেও এসব পদের বিষয়ে সুষ্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। নির্দিষ্ট চাঁদা প্রদান ছাড়া গঠনতন্ত্রেও আর কোনো দায়িত্বের কথা বলা হয়নি। বিশেষ করে ৪১ জন ভাইস চেয়ারম্যানের কাজ কি তা কারোরই জানা নেই।

জাপার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির কাঠামোতে রয়েছে, ১ জন চেয়ারম্যান, এরপরেই ৪১ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যের স্থান। এরপর যথাক্রমে ১ জন মহাসচিব, ৪১ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ১৬ জন যুগ্ম মহাসচিব, ৩১ জন সাংগঠনিক সম্পাদক, ২৩ জন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক।

এখানেই শেষ নয়, যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক রয়েছেন ৩১ ও যুগ্ম বিভাগীয় সম্পাদক রয়েছেন ২৩ জন। বিভাগীয় সম্পাদকমন্ডলী পদ রয়েছে ২৩টি, যুগ্ম বিভাগীয় সম্পাদকমন্ডলীতে রয়েছে ২৩ জন। আর নির্বাহী সদস্যের অনুমোদিত সংখ্যা রয়েছে ৯১টি।

মূল কাঠামোর বাইরে, প্রধান পৃষ্ঠপোষক, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত মহাসচিব উপদেষ্টা পরিষদ ও ১৫টি রয়েছে বিশেষ কমিটি। মর্যাদার দিক থেকে প্রেসিডিয়ামের পরেই রয়েছে উপদেষ্টা মন্ডলী। এই পরিষদে পার্টির চেয়ারম্যান যতখুশি সংখ্যক সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন।

বিশেষ কমিটিগুলো হচ্ছে-তথ্য গবেষণা ও প্রচার প্রকাশনা, অর্থ ও জাতীয় পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, খাদ্য ও কৃষি, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাহিত্য, শ্রম কল্যাণ ও শিল্প, যুব কল্যাণ, এনজিও বিষয়ক, কর্মসংস্থান ও পুর্নবাসন, দুর্যোগ ও ত্রাণ এবং সমাজ উন্নয়ন বিশেষ কমিটি।

সম্প্রতি শেষ হওয়া নবম জাতীয় কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধনীতে এই কাঠামোর বাইরে গিয়ে ৭ জন কো-চেয়ারম্যান এবং ৮ অতিরিক্ত মহাসচিব পদ তৈরি করা হয়েছে। যদিও সৃজিত এসব শীর্ষ পদ পার্টির মূল কাঠামোতে যুক্ত করা হয়নি। পার্টির চেয়ারম্যান চাইলে এসব পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। আর যদি প্রয়োজন না মনে করেন তাহলে নিয়োগ নাও দিতে পারেন।

সবচেয়ে হাস্যস্পদ বিষয় হয়েছে পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক পদ নিয়ে। পার্টির চেয়ারম্যানের উপরের মর্যাদায় বসানো হয়েছে তাকে। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের জন্যই এই পদটি সৃষ্টি করা হয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে পদটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অর্থ্যাৎ তাকে শান্তনা দেওয়ার জন্যই যে পদটি তৈরি করা হয়েছে এটি পরিষ্কার। যদিও এই পদের না আছে দায়, না আছে দায়িত্ব। শুধু সমাবেশে চেয়ারম্যানের পরে বক্তৃতা করবেন। পার্টির অভ্যন্তরীণ কোনো বৈঠকে সেই সুযোগ রোহিত করা হয়েছে।

চেয়ারম্যান প্রয়োজন মনে করলে জাতীয় ও দলীয় বিষয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ করবেন। এর বাইরে নিজের থেকে তার কিছুই করার নেই। একইভাবে কো-চেয়ারম্যানদের পার্টির মহাসচিবের উপর এবং অতিরিক্ত মহাসচিবদের প্রেসিডিয়ামের পরের মর্যাদা দেওয়া হলেও সংগঠনে তাদের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। পদের দায়িত্ব বন্টনের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অর্থাৎ ৪১ ভাইস চেয়ারম্যান, ৩১ সাংগঠনিক, ৩১ যুগ্ম সাংগঠনিক, ২৩ বিভাগীয় সম্পাদক ও ২৩ যুগ্ম বিভাগীয় সম্পাদকের কার কি দায়িত্ব তারা নিজেরাই জানেন না। যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও অন্যান্য বিভাগীয় সম্পাদকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে জাপার গঠনতন্ত্রের উপ-ধারা ৬ (ক) বলা হয়েছে- ‘যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও অন্যান্য বিভাগীয় সম্পাদকগণ তাহাদের স্ব-স্ব বিভাগের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করিবেন। নিজ নিজ বিভাগের কার্যক্রম ও অগ্রগতি সম্পর্কে সম্পাদকমন্ডলীর মাসিক সভায় মহাসচিবের নিকট পেশ করিবেন’।

(খ)-এ বলা হয়েছে- ‘দেশের বিভিন্ন বিভাগের ও বিভিন্ন বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম-মহাসচিবগণ ও সাংগঠনিক সম্পাদকগণ স্ব-স্ব বিভাগের নির্বাচনী অঞ্চলভিত্তিক এলাকা ও উপজেলা সমূহের সাংগঠনিক কাঠামো বিন্যাস, পার্টির কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শাখা সমূহের নিয়মিত কার্যক্রম তদারক করিবেন’।

এখানে দেখা যাচ্ছে, দেশের ৮ বিভাগ, সেখানে ২৩ বিভাগীয় সম্পাদক, ২৩ যুগ্ম বিভাগীয় সম্পাদক, ৩১ সাংগঠনিক, ৩১ যুগ্ম সাংগঠনিক কে কোথায় তদারকি করবেন তা স্পষ্ট নয়। দেখা যাবে এক উপজেলায় একাধিক নেতা রয়েছে, অন্য জেলা ফাঁকা। নেতারা ধরেই নিয়েছেন পদটি আলঙ্কারিক। যে কারণে, দায় দায়িত্বের ধারে কাছে কেউ নেই। এমনও রয়েছে কেউ কেউ নিজেই জানেন না তিনি কি পদে রয়েছেন।

একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, তিনি ২ জানুয়ারি দুপুরে তৃতীয়তলায় প্রেস সেকশনে গিয়েছিলেন নতুন কেন্দ্রীয় কমিটির জন্য ফরম নিতে। ওই সময় সেখানে অপর একজন নেতা ফরম পূরণ করছিলেন। বর্তমান পদের কলাম পূরণ করতে গিয়ে আটকে যান। পরে কাকে যেন ফোন করে জেনে নেন তার নিজের পদের বিষয়টি। এ সময় তিনি উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, তুমি নিশ্চিত তো আমি সাংগঠনিক সম্পাদক। আমি কিন্তু ফরম পূরণ করতেছি। দেখো কিন্তু।

সাংগঠনিক সম্পাদক পদের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ৩ বছর ধরে ধারণ করছেন একজন। অথচ তিনি নিজেই জানেন না তার পদবির কথা। খুঁজে দেখলে হয়তো আরও অনেক অসঙ্গতি পাওয়া যাবে। বিদায়ী কমিটিতেই এমন অবস্থা ছিল। নতুন করে যে পদ বাড়ানো হয়েছে, সেই কাঠামোর সঙ্গে না কোনো দল, না কোনো সমবায় সমিতি, না সমাজ সেবা সংগঠনের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার কাছে প্রশ্ন ছিলো পদের ভারে মাথাভারী হচ্ছে না তো? জবাবে তিনি বলেন, না অবশ্যই মাথাভারী হবে না।

পার্টির যুগ্ম মহাসচিব, বিভাগীয় সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থাকতে নতুন করে কেন অতিরিক্ত মহাসচিব প্রয়োজন হচ্ছে। আগের পদেই তো দায় দায়িত্ব স্পষ্ট নয়, আবার পালনও লক্ষ্যণীয় নয়। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের পদগুলোর বিপরীতে দায়-দায়িত্ব স্পষ্ট ছিল না, অতিরিক্ত মহাসচিবের বিষয়ে স্পষ্ট দায়-দায়িত্ব থাকবে। তারা পৃথক বিভাগের দেখভাল করবেন। এতে সংগঠন গতিশীল হবে।

কো-চেয়ারম্যান প্রসঙ্গে রাঙ্গা বলেন, ওনারা পার্টির চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করবেন। এখানে কোনো সমস্যা আমি দেখছি না।

আপনার মতামত লিখুন :