যে কারণে ক্ষয়িষ্ণু জাতীয় পার্টি!

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

যেসব কারণে জাতীয় পার্টি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে মনোনয়ন বাণিজ্য অন্যতম। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বাণিজ্যের ধরনটা অন্য দলগুলোর সঙ্গে মেলে না। বছরের পর বছর একজন শ্রম-ঘাম দিয়ে পার্টিকে সংগঠিত করেন আর ভোটের সময় চিলের মতো ছোঁ মেরে মনোনয়ন বাগিয়ে নেন অতিথি পাখিরা।

নতুন নেতার আর্বিভাব হলে ভালো হওয়ার কথা, যদি ভোটের পরে তারা দলের সঙ্গে থাকতেন। কিন্তু সমীকরণ বলছে এসব হায়ারিং নেতা একজন ছাড়া কেউই জাতীয় পার্টির সঙ্গে থাকেননি। ভোটের পরে কেউ দ্রুত, কেউ সময়ের ব্যবধানে হাওয়ার মিলিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে ত্যাগী মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারাও ক্ষোভে অভিমানে কেউ দল ছেড়েছেন। অন্যরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এতে জেলায় জেলায় এক ধরনের নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এভাবে দিনে দিনে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে জাতীয় পার্টি।

বাইরে থেকে লোক এনে প্রার্থী করাকে লোকজন হায়ার করা প্রার্থী বলে অভিহিত করেন। পার্টির সিনিয়র নেতারাও এমন মন্তব্য করে থাকেন। তবে মাঠের কর্মীরা একে বলেন মুরগি ধরা। ভোটের মুখে এসে টাকাওয়ালা দেখে মুরগি বানানো হয়। একেক সময় একেকজনকে মুরগি বানানো হয়। এখানে ধুয়া তোলা হয়, তার টাকা আছে, ভোটে খরচ করে ভালো ফল করতে পারবেন।

জাপার দুর্গ রংপুরও এই জ্বরে আক্রান্ত। ’৯০ সালে জেলে থেকে ৫টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন প্রয়াত এরশাদ। পরে উপ-নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বাইরে থেকে গিয়েও বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

’৯৬ সালেও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তার জনপ্রিয়তা ধরে রাখেন। উপ-নির্বাচনে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে বিএনপি নেতা নূর মোহাম্মদ মন্ডলকে হায়ার করে এনে প্রার্থী করা হয়। এতে অভিমানে পার্টি থেকে দূরে সরে যান উপজেলা জাপার ডোনার খ্যাত পরিবহন ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর সরকার ও প্রফেসর গোলাপ মিয়া।

সময়ের ব্যবধানে নূর মোহাম্মদ মন্ডল জাপাকে গুডবাই জানালে পীরগঞ্জ জাপায় নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। স্থানীয় নেতারা গফুর সরকারকে ডেকে এনে আবার নেতৃত্বে বসান। কিন্তু ছেঁড়া তারে সুর তুলতে ব্যর্থ হয় জাতীয় পার্টি। নূর মোহাম্মদ মন্ডল একা জাতীয় পার্টিতে এলেও ছেড়ে যাওয়ার সময় জাপার বিশাল কর্মী বাহিনী নিয়ে চলে যান।

অনেকটা অভিন্ন চিত্র দেখা যায় রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে। এই আসনে মাঠের নেতা ছিলেন সোলায়মান আলম ফকির। ২০০১ সালে নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে হায়ারিং প্রার্থী (আরডি মিল্কের মালিক ফকর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর) মাঠে নামানো হয়। অভিমানে জাপা ছাড়েন দুর্দিনের পরীক্ষিত নেতা সোলায়মান ফকির। এরপর আসনটি হারিয়ে জাতীয় পার্টি আর ফিরে আনতে পারেনি।

রংপুরের বাইরে ঢাকা-৫ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক ফুটবলার মীর আব্দুস সবুর আসুদ। পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ বিভিন্ন সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু ২০১৪ সালে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে ব্যবসায়ী নূরু হাজীকে মনোনয়ন দেন। অনেক ঘটনা রটনার পরে মীর আব্দুস সবুর আসুদকেই বহাল করা হয়। সেই হাজী নূর হোসেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-নির্বাচনে দলের প্রার্থী থাকলেও হঠাৎ করেই ব্যান্ড শিল্পী সাফিন আহমেদকে এনে প্রার্থী করা হয়। ভোটের দিনগুলোতেও তার তেমন তৎপরতা লক্ষণীয় নয়। না ছিল পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ। ফলাফলও যা হওয়ার তাই হয়েছে। ভোটের পরে যথারীতি সাফিন আহমেদ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে সাবেক আমলা নেওয়াজ আলীকে ধরে এনে মেয়র প্রার্থী করা হয়। লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করেন জাপার এই প্রার্থী। ভোটের পরে তিনিও বাতাসে মিশে গেছেন। গুঞ্জন রয়েছে তিনি নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করে পাট চুকিয়ে দিয়েছেন।

খুলনা সিটি করপোরেশনে বিএনপির সাবেক নেতা মশফিকুর রহমানকে এনে মেয়র প্রার্থী করা হয়। এতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে স্থানীয় নেতারা অনেকেই পদত্যাগ করেন। ভোটের পাশাপাশি মহানগরের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়। তিনিও ভোটের পর জাপাকে গুডবাই জানিয়েছেন। যাওয়ার সময় মনোনয়ন বাণিজ্যসহ একরাশ অভিযোগ তুলেছেন।

এখানে তার চলে যাওয়া এবং ত্যাগীদের দল ছাড়ায় নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয়। সেই খরা এখনও কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে খুলনা জাতীয় পার্টি। ফলে এবার সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও লজ্জাজনক পরাজয়।

ফেনীর ত্যাগী নেতাদের ফেলে স্টারলাইন গ্রুপের মালিক টাইগার আলাউদ্দিনকে কোলে তুলে নেন এরশাদ। পার্টির দুর্দিনে লাঙ্গল ফেলে নৌকার পালে হাওয়া দিচ্ছেন। সারা দেশে এমন অনেক ঘটনার নজির রয়েছে। যার একটিও ভালো উদাহরণ খুঁজে বের করা কঠিন। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।

পার্টির নেতাদের ভাষায় এসব মুরগি অভিযানে দল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চেয়ারম্যানের আশপাশে থাকা নেতারা ঠিকই লাভবান হয়েছেন। কখনও কখনও খোদ পার্টির চেয়ারম্যান সুবিধা পাওয়ার কথা ওপেন সিক্রেট বিষয়।

জিএম কাদের পার্টির চেয়ারম্যান হওয়ার পর দীর্ঘদিনের এই রেওয়াজ বন্ধ হয়ে যাবে এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন নেতাকর্মীরা। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে বেড়ে গেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও মেয়র প্রার্থী করা হয়েছিল প্রার্থী হায়ার করে এনে। যদি সেই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াতেই বাতিল হয়ে যান।

নতুন করে সমালোচনা উঠেছে গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪ আসনের উপ-নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে। দু’জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে হায়ার করে এনে। বেশি আপত্তি উঠেছে বাগেরহাট-৪ আসনের প্রার্থী নিয়ে। এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজন কুমার মিস্ত্রীকে। যাকে পার্টির কেউই চেনেন না। অথচ এই আসনে জেলা জাতীয় পার্টির পরীক্ষিত নেতা হাবিবুর রহমান মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

জাতীয় পার্টিতে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে পার্টি করে একজন আর মনোনয়ন দেওয়া হয় আরেকজনকে। যে কারণে পার্টির নেতারাও দলের জন্য খুব একটা খরচ করতে চান না। এভাবে জেলায় জেলায় ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে জাতীয় পার্টি।

জাপার দুর্গখ্যাত বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসনে জয় পেয়েছে জাতীয় পার্টি। তাও আবার সবগুলোতেই আওয়ামী লীগের ওপর ভর করে, অর্থাৎ মহাজোটের শরিক হয়ে। যেখানেই উন্মুক্তভাবে নির্বাচন করেছে জাতীয় পার্টি সেখানেই ভরাডুবি হয়েছে দলটির প্রার্থীদের।

ভোটের সমীকরণেও শুধুই হারাবার পালা। গণআন্দোলনের মুখে বিদায়ের পর প্রথম নির্বাচনে (১৯৯১ সাল) কাস্টিং ভোটের ১১.৯২ শতাংশ পেয়েছিলো জাতীয় পার্টি। ১৯৯৬ সালে ১০.৬৭ শতাংশ, ২০০১ সালের ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভোট পায় ৭.২৫ শতাংশ। আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে পেয়েছে মাত্র ৭.০৪ শতাংশ।

সারাদেশে মাত্র একজন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদেও ধরাশায়ী জাপার প্রার্থীরা।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আলম রুবেল বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, এভাবে হায়ার করে প্রার্থী দিলে ত্যাগীরা অভিমানে দল থেকে দূরে থাকেন, আর হায়ারিং প্রার্থীদেরও নার্সিং না করায় পার্টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের একাধিক সভায় বলেছেন, জাতীয় পার্টি ক্ষয়িষ্ণু নয়। জাতীয় পার্টি একটি বর্ধিষ্ণু দল। যে কারণে বিভিন্ন দলে থেকে লোকজন যোগদান করছে।

আপনার মতামত লিখুন :