শেষের ধাক্কায় চুরমার "ফাইনাল" জয়ের স্বপ্ন

আপন তারিক, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, নাগপুর (ভারত) থেকে
ব্যাট হাতে দুরন্ত মোহাম্মদ নাঈম শেখ

ব্যাট হাতে দুরন্ত মোহাম্মদ নাঈম শেখ

  • Font increase
  • Font Decrease

আর কতো লিখতে হবে দুঃখগাথা? তীরে এসে তরী ডোবার গল্প তো অনেক হয়েছে। কিন্তু 'ফাইনাল' নামের দুঃস্বপ্ন যে কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না! আরও একবার প্রত্যাশার বেলুন ফের চুপসে গেল! এশিয়া কাপে হয়নি, নিদহাস ট্রফির ফাইনালেও এই ভারতের বিপক্ষে হতাশায় মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ। এবার ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের অলিখিত ফাইনালেও লেখা হলো সেই একই শোকগাথা! টাইগারদের জন্য শিরোপা শুধুই সোনার হরিণ।

নাগপুরের মাঠে রোববার রাতে টস ছাড়া আর কিছুই জেতা হলো না মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের। সফরকারীদের ৩০ রানে হারিয়ে সিরিজের ট্রফি থাকল ভারতেরই। প্রথম ম্যাচটা হারলেও পরের দুটো জিতে হাসিমুখেই সিরিজের ট্রফি হাতে তুলে নিলেন রোহিত শর্মা।

নাগপুরের বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের মাঠে টস জিতে ভারতকেই প্রথমে ব্যাট করতে পাঠান মাহমুদউল্লাহ! কিন্তু স্লো উইকেটে তার সেই সিদ্ধান্তটা বোলাররা যৌক্তিক করতে পারলেন কোথায়? ভারত ২০ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে তুলে ১৭৪ রান। জবাব দিতে নেমে বাংলাদেশ নড়বড়ে শুরুর পর দাপটের সঙ্গে ম্যাচে ফিরলেও শেষের ভুলে ১৯.২ ওভারে অলআউট হয়ে দল তুলে ১৪৪ রান।

দল তো জয়ের পথেই ছিল। মনে হচ্ছিল তরুণ মোহাম্মদ নাঈম শেখের ব্যাটে লেখা হবে ভারত জয়ের গল্প। কিন্তু শেষের দিকে এসে সর্বনাশ। পরপর দুই বলে উইকেট, এক ইনিংসে তিনবার, বিস্ময়কর! তারপর কী আর বিজয় গাথা লেখা যায়?

যদিও বাংলাদেশ হারলেও হারেননি নাঈম শেখ। এই তরুণ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়লেন মাথা উঁচু করে। তার ব্যাটে ৮১। অন্যরা ব্যর্থতার পসরা সাজিয়ে ফিরে গেলেন সাজঘরে। তার পথ ধরেই সঙ্গী হলো আক্ষেপ-হতাশা!

চ্যালেঞ্জিং স্কোরের সামনে দাঁড়িয়ে শুরুটাই ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। পাওয়ার প্লে-তে কিছুই করতে পারেনি বাংলাদেশ। পারেননি লিটন দাস আর সৌম্য সরকার। দুই বাউন্ডারিতে শুরু করলেও এরপরই ছন্দপতন! দিপক চাহারের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে আউট লিটন। ৮ বলে ৯ রান আসে তার ব্যাটে।

তারপর গোল্ডেন ডাক মারেন সৌম্য সরকার। উইকেটে এসে প্রথম বলেই আউট। দিপক চাহারের অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন শিবম দুবের হাতে। টানা দুই বলে উইকেট হারায় দল। টি-টোয়েন্টিতে এই নিয়ে ৮ বার শূন্য রানে আউট। আর গোল্ডেন ডাক মোট চারবার। তারপরও দলে টিকে যান বারবার। ভাগ্যবান তো বটেই!

এরপর মোহাম্মদ মিঠুনকে নিয়ে লড়ে যান তরুণ নাঈম। তাদের জুটিতে ম্যাচে ফেরে টাইগাররা। মনে হচ্ছিল দুঃখগাথা নয়, ভারতের মাঠে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ের গল্পটাই লিখতে পারবো। মিঠুন ২৯ বলে ২৭ রান তুলে ধরেন সাজঘরের পথ। নাঈমের সঙ্গে গড়েন ৯৮ রানের জুটি।

ব্যস, এরপর একপ্রান্তে শুধু থাকলেন নাঈম, অন্যপ্রান্তে শুধুই উইকেটে আসা-যাওয়ার মিছিল! হতাশ করেন মুশফিকুর রহিম। মিঠুন ফিরতেই উইকেটে গিয়ে ব্যর্থ তিনি। তারপর নাঈম দারুণ এক ইনিংস খেলে শিবম দুবের ইয়র্কারে বোল্ড।

তার আগে খেলেন ১০ চার ও ২ ছক্কায় ৪৮ বলে ৮১ রানের অসাধারণ এক ইনিংস। তিনি ফিরতেই আফিফ হোসেন গোল্ডেন ডাক। এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও শফিউল টানা দুই বলে ফিরলে টাইগারদের হার শুধুই সময়ের ব্যাপার হয়ে যায়।

কতো সুন্দর এক লড়াই শেষের ব্যর্থতায় হেরে গেল বাংলাদেশ। ভারতের হয়ে দিপক চাহার নেন ৩.২ ওভারে ৭ রানে ৬ উইকেট। এটিই তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। শেষ দিকে দারুণ এক হ্যাটট্রিক করলেন চাহার। ৭ রানে ৬ উইকেট নিয়ে গড়েন রেকর্ড।

এর আগে রোহিত শর্মাকে দ্রুত ফেরালেও টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বড় স্কোর গড়ে ভারত। নাগপুরে রোববার ছুটির দিনে ভারত অধিনায়ক ৬ বলে করেন মাত্র ২! কোহলির পর শিখর ধাওয়ানকেও ফেরান শফিউল। ১৬ বলে ১৯ রান তুলেন ধাওয়ান।

তারপরই বিদায় নিতে পারতেন শ্রেয়াস আইয়ার। হতে পারতেন শফিউলের তৃতীয় শিকার। কিন্তু শূন্য রানে সহজ ক্যাচ দিয়েও টিকে যান ভারতীয় এই ব্যাটসম্যান। শফিউলের লেংথ বলটি চলে যাচ্ছিল অফস্ট্যাম্পের বাইরে দিয়ে। তখনই শ্রেয়াস দাঁড়িয়ে শট নেন। বল চলে যায় পয়েন্টে। কিন্তু সহজতম ক্যাচটাও হাতে জমাতে পারেননি আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। এরপর লোকেশ রাহুল ও শ্রেয়াস দলকে দেখালেন পথ। তৃতীয় উইকেট জুটিতে তারা ফিফটি করেন ৩৩ বলে।

লোকেশ রাহুল দ্রুত গতিতে তুলে নেন ফিফটি। স্লো উইকেটে দুর্দান্ত খেললেন তিনি। ফিফটি করেন ৩৩ বলে। যা কীনা টি-টোয়েন্টিতে তার ষষ্ঠ ফিফটি। অবশ্য এরপরই আল আমিনের লেগ কাটারে আউট হয়ে ফেরেন সাজঘরে। তার আগে করেন ৩৫ বলে ৫২। ভাঙে ৫৯ রানের জুটি।

তারপর সুযোগটা কাজে লাগালেন আইয়ার। প্রাণ পেয়ে ২৭ বলে করেন ফিফটি। অন্য প্রান্তে রিশব পান্ত (৬) ফের ব্যর্থ। তাকে সাজঘরের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন সৌম্য সরকার। একইভাবে আইয়ারও অনিয়মিত এই বোলারের শিকার। যে ব্যাটসম্যান ফিরতে পারতেন শূন্য রানে তিনিই তুলে নিলেন ৩৩ বলে ৬২ রান। শেষটাতে এসে মনিশ পান্ডে দ্রুত ১৩ বলে ২২ রান তুলে দলকে এনে দেন বড় সংগ্রহ। ম্যাচে দৃষ্টিকটু ফিল্ডিংয়ে হতাশ করেছেন আমিনুল ইসলাম। শ্রেয়াসের পর তার হাত ফস্কে যায় শিবম দুবের তুলে দেওয়া ক্যাচও।

সব মিলিয়ে ভারতের বিপক্ষে আরেকটি ফাইনালে হারল বাংলাদেশ। এশিয়া কাপ, নিদহাস ট্রফির পর এবার টি-টোয়েন্টি সিরিজেও তীরে এসে ডুবল টাইগারদের তরী।

সংক্ষিপ্ত স্কোর-

ভারত: ২০ ওভারে ১৭৪/৫ ( রোহিত ২, ধাওয়ান ১৯, রাহুল ৫২, শ্রেয়াস ৬২, পান্ত ৬, মনিশ ২২*, দুবে ৯*; আল আমিন ১/২২, শফিউল ২/৩২, মুস্তাফিজ ০/৪২, আমিনুল ০/২৯ ও সৌম্য ২/২৯)।

বাংলাদেশ: ১৯.৫ ওভারে ১৪৪/১০ (লিটন ৯, নাঈম ৮১, সৌম্য ০, মিঠুন ২৭, মুশফিক ০, মাহমুদউল্লাহ ৮, আফিফ ০, আমিনুল ৯, শফিউল ৪, মুস্তাফিজ ১, আল আমিন ০*; চাহার ৬/৭, চাহাল ১/৪৩, দুবে ৩/৩০)।

ফল: ভারত ৩০ রানে জয়ী।

ম্যাচ সেরা: দিপক চাহার।

আপনার মতামত লিখুন :