সৃজনে ও মননে পরিশুদ্ধ শিক্ষাবিদ



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
খালেদা হানুম

খালেদা হানুম

  • Font increase
  • Font Decrease

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রথম শিক্ষক হিসেবে যাঁরা এই প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেছিলেন, তাঁদের নাম লিপিবদ্ধ থাকলেও প্রথম মহিলা শিক্ষক/অধ্যাপকের তথ্য চোখে পড়েনি। তবে অর্ধ-শতাব্দী পেরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে অগ্রণী ও বরিষ্ঠা নারীমুখ, পরিশুদ্ধ শিক্ষাবিদ, প্রফেসর ড. খালেদা হানুম সকলের কাছেই একটি সুবিদিত নাম। চবির আদি শিক্ষকদের একজন, ইংরেজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও পরবর্তীতে উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী ছিলেন তিনি। ছিলেন বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারপার্সন।

প্রফেসর মোহাম্মদ আলী গত ২৪শে জুন পরলোকগমনের ১১ দিনের মাথায় তাঁর জীবনসঙ্গীনী প্রফেসর ড. খালেদা হানুম চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের আইসিউতে রোববার (৪ জুলাই) ভোর ৪টা বেজে ৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

প্রফেসর ড. খালেদা হানুমের জন্ম চল্লিশের দশকের ব্রিটিশ-বাংলায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার নানুপুর গ্রামে। শিক্ষাজীবনের শুরু সরকারি কর্মকর্তা পিতার কর্মস্থল বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুরে। ঢাকার বাংলাবাজার বিদ্যালয়ে তিনি স্কুলের পড়াশোনার শেষ ধাপ অতিক্রম করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন ও বাংলায় অনার্স করেন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করে ১৯৬৯ সালে তিনি প্রভাষক রূপে অধ্যাপনা জীবন শুরু করেন।

শিশু-কিশোর বয়সেই প্রফেসর ড. খালেদা হানুম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে গায়ক আব্বাসউদ্দিন ও লেখিকা শামসুর নাহার মাহমুদের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৫১ সালে তাঁর প্রথম লেখা কলকাতার 'সত্যযুগ' পত্রিকার ছোটদের মজলিশে প্রকাশ পায়। ১৯৬১ সালে তিনি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ও নজরুল জন্ম-হীরকজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হন।

১৯৭৫ সালে প্রফেসর ড. খালেদা হানুম স্বামী প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এক বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন এবং দেশে ফিরে 'বাংলাদেশের ছোটগল্প' বিষয়ে পিএচডি গবেষণা সম্পন্ন করেন। তিনি ফরাসি ভাষায় ডিপ্লোমা অর্জন করেছেন এবং নজরুল বিষয়ক গবেষণায় 'নজরুল: বৈচিত্র্যে বৈভবে' গ্রন্থ রচনার জন্য সমধিক প্রসিদ্ধ।

প্রফেসর ড. খালেদা হানুমের প্রকাশিত প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ রুডলফ বেসিয়ার-এর বিশ্ববিশ্রুত নাটক 'দ্য ব্যারোটেস অব উইমপোল স্ট্রিট'-এর অনুবাদ 'সহসা জীবন' প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। দুটি গল্পগ্রন্থ মিলিয়ে তাঁর রচিত সর্বমোট গল্পসংখ্যা কুড়ি। গল্পগুলোকে মোট চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন কবি ও গবেষক প্রফেসর ড. মহীবুল আজিজ। তা হলো, ১. প্রেম, ২. সম্পর্কজটিলতা, ৩. অস্তিত্বসংকট, ৪. সংগ্রামশীলতা। ড. মহীবুল আজিজ 'খালেদা হানুম: সৃজন ও মনন' নামে একটি 'অপ্রাতিষ্ঠানিক গদ্য গ্রন্থ' রচনা করেছেন, যাতে এই লেখিকা-অধ্যাপিকার জীবন ও কর্মের বিস্তারিত মূল্যায়ন স্থান পেয়েছে।

শুধু ছোটগল্প নয়, কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ, স্মৃতিকথা, গবেষণা, অনুবাদ ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রফেসর ড. খালেদা হানুম অনবদ্য অবদান রেখেছেন। সৃজনে ও মননের ঋদ্ধতা ও পরিশুদ্ধিতে তিনি অতি স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর করেছেন নিজের যাপিত জীবন। তাঁর আত্মস্মৃতি 'স্মৃতির লেখা' তথ্য ও বর্ণনার বর্ণাঢ্য আবহে উন্মোচিত করেছে এক নান্দনিক জগতের, যেখানে এক আপাদমস্তক অ্যাকাডেমিক সুস্নিগ্ধ দম্পতির সৌরভ বহমান।

প্রবীণ শিক্ষাবিদ প্রফেসর মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে নানা অনুষ্ঠানে একাধিক বার দেখা-সাক্ষাত এবং আলাপ হলেও প্রফেসর ড. খালেদা হানুমের সঙ্গে একবারই আমার কথা হয় ঢাকার ইকবাল রোডে তাঁদের বাসায়। ২০০০ সালের প্রথম দশকে প্রফেসর আলী তখন ঢাকায় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রফেসর আলী ও প্রফেসর হানুমের সঙ্গে সেই সুদীর্ঘ আলাপচারিতায় জীবন, জগৎ আর সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে অনিন্দিত অনুভবে ঋদ্ধ হওয়ার স্মৃতি আজও অম্লান।

মহান আল্লাহপাক এই দুই গুণী শিক্ষককে জান্নাতবাসী করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের শোক স‌ইবার শক্তি দান করুন।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম