আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ



ফরিদ কবির
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

২৫ মার্চ সকাল থেকেই শুনছি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

সকালে আব্বুজি আম্মাকে বললেন, তুমি ফরিদ-শরিফরে লয়া আইনথা চইলা যাও। শুনে আম্মা বললেন, কী কও? নিজের ঘর রাইখা আমি যামু না। এর চাইতে এক কাম করো, তুমি ফরিদ-শরিফরে আইনথায় রাইখা আসো। আইন্তা কেরানিগঞ্জের একটা ছোট্ট গ্রাম। বুড়িগঙ্গার ওপারেই।

আমাদের যাওয়া নিয়া দুজনে কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কে জড়িয়ে গেলে কায়কোবাদ কাকা বললেন, ভাবী, আপনে আর দাদায় বাচ্চাগো লয়া আইনথায় যান গা। আমি বাড়ি পাহারা দিমুনে।

আম্মা কিছুতেই যাবেন না। তিনি বলেন, সংসার রাইখা আমি যামু না।

শেষ পর্যন্ত আম্মা গেলেন না। দুপুরের দিকে আমার নানা এসে হাজির। বললেন, সবতে আমার লগে চল। ঢাকা টাউনে থাকনের কাম নাই।

কিন্তু আম্মা যেতে রাজি হলেন না। তিনি আমাকে আর শরিফকে পাঠিয়ে দিলেন।

আমরা ২৫ মার্চ দুপুরে খেয়ে-দেয়েই নানার সঙ্গে কেরানিগঞ্জে নানাবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। জিন্দাবাহার থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক বেশ দূরেই। কিন্তু নানা আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে হেঁটেই রওনা হলেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাস লোহার পুল হয়ে নারায়ণগঞ্জ যেত। আমরা মার্চের তীব্র গরমের মধ্যেই হেঁটে এসে ভিক্টোরিয়া পার্কের বাসস্টেশনে পৌঁছলাম। বাস স্টেশন ছিল লোকে লোকারণ্য। একটা করে বাস আসে, আর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাতে। নানা আমাদের দু ভাইকে নিয়ে অনেক কষ্টে একটা বাসে উঠলেন। আমরা কোনো সিট পেলাম না। শরিফের তখন মাত্র ৭-৮ বছর বয়স। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে ও হাঁসফাঁস করছিল। নানা সিটে বসে থাকা একটা লোককে বললেন, বাবা, আমার নাতিটাকে আপনার কোলে দেই?

লোকটা শরিফের দিকে এক নজর দেখে বললো, আচ্ছা, দেন।

নানা শরিফকে সেই লোকের কোলে বসিয়ে দিলেন। আমাকে বললেন, চল, সামনে কুনু বাসস্টপে সিট খালি হইলে তরে বসায়া দিমুনে।

নানা এক হাতে বাসের হাতল ধরলেন অন্য হাতে আমাকে।

বাস এসে মুন্সিখোলায় নামল। আমরা কোনো বাসস্টপেই লোকজন ঠেলে খালি সিটে বসতে পারলাম না।

মুন্সিখোলা থেকে বুড়িগঙ্গা পার হতে হবে আমাদেরকে। নদীর ওপার থেকে মাইল দেড়েক হাঁটাপথ। গ্রামের নাম আইন্তা। ছোট্ট একটা গ্রাম। এর মধ্যে ভূঁইয়া বাড়িই তুলনায় বড়।

আমার নানার পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একদম বড়টাকে আমরা দেখিনি। পরের জন থাকেন পুরোনো ঢাকার কায়েৎটুলিতে। বাকি তিন ভাই তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আইন্তায়ই থাকেন।

আমরা যখন মুন্সিখোলায় নামি তখন বিকেল। কিন্তু মার্চের বিকেল। সূর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়লেও তার তেজ এতোটুকু কমেনি। তীব্র গরমে আমরা বেশ কাহিল। শরিফকে খুবই বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। ও এমনিতেই শুকনো, চিকনা-চাকনা। সেই দুপুরে আমরা খেয়ে-দেয়ে জিন্দাবাহার থেকে বেরিয়েছি। পথে আমাদের মুখে আর কিছু পড়েনি। শরিফের মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

মুন্সিখোলা ঘাটেও অসম্ভব ভিড়। অনেকবার আমি এ পথে নানাবাড়ি গেছি। এত ভিড় কখনো দেখিনি। আমি শুধু এটুকু শুনেছি, আজ রাতে ভয়ংকর একটা কিছু ঘটতে চলেছে। কী ঘটবে, কেন ঘটবে তার কিছুই জানি না।

কায়কোবাদ কাকা আর আব্বুজির কথা থেকে জেনেছি আর্মিরা হামলা করতে পারে। তখন থেকেই আমার মনে একটাই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, আমরা কী দোষ করেছি? আর্মি আমাদের ওপর কেন হামলা করবে? এর উত্তর জানা নাই। আম্মা আর আব্বুজি ঢাকা টাউনে রয়ে গেছেন। রয়ে গেছেন কায়কোবাদ কাকাও। তাদের কোনো বিপদ হয় কিনা—এ নিয়ে একটা ভয় থেকে থেকেই আমাকে বিষণ্ণ করে ফেলছে।

অনেকক্ষণ হলো আমরা মুন্সিখোলা ঘাটে এসেছি। গিজগিজ করছে লোকে। নানান বয়সী। অনেকের সঙ্গেই বিশাল বিশাল ব্যাগ। দেখে মনে হবে পুরো সংসারটাই সঙ্গে নিয়ে ফিরছেন। ঈদ-পার্বণের সময় এমনটা দেখা যায়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সবাই গ্রামের বাড়িতে আসেন। কিন্তু তখন সবার চোখে-মুখে যেমনটা হাসি-খুশি ভাব থাকে, আজ তেমনটা মনে হচ্ছে না। সবার চোখে-মুখেই কেমন আতঙ্কের ছাপ। অবশ্য সেটা বড়দের মধ্যেই। তাদের সঙ্গে থাকা ছোটরা ঠিকই নদীর পাড়ে খোলামেলা জায়গা পেয়ে ছুটোছুটি করছে।

ব্যতিক্রম শুধু শরিফ। ও চুপচাপ আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। একবার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, আমরা কখন যামু?

আমি বলেছিলাম, দেখছ না, নাওয়ে অনেক ভিড়।

সূর্য যখন প্রায় ডুবুডুবু তখন আমরা একটা নৌকায় উঠতে পারলাম। নৌকার মাঝি নানারই পরিচিত কেউ। তাকে দেখেই মাঝি চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, খসরু বাই, আমার নাওয়ে আহেন।

নানা তার চিৎকার শুনেই আমাকে আর শরিফকে নিয়ে দ্রুত সেই নৌকার দিকে এগোলেন। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি ওঠা যায়! নৌকা পাড়ে ভিড়তেই ভিড় সেদিকে হামলে পড়ল। মাঝি এক হাতে ভিড় ঠেলে আমাদেরকে নৌকায় ওঠার জন্য আরেকটা হাত বাড়িয়ে দিলেন।

মাঝি যখন নৌকা ছাড়লেন তখন সেটা প্রায় ডুবুডুবু অবস্থা। নানার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি বিড়বিড় করে সুরা পড়ছেন। আমার কেন জানি মনে হলো, আমাদের নৌকাটা ডুবে যাবে। নানার দেখাদেখি আমিও সুরা পড়তে শুরু করলাম। দুটো সুরা তখন আমার মুখস্ত ছিল। সুরা ফাতিহা আর সুরা ইখলাস। আমি সে দুটোই পড়তে শুরু করলাম।

ঠিক সে সময় একটা লঞ্চ আমাদের প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। সদরঘাটের দিকে যাচ্ছে সেটা। লঞ্চের একটা বিশাল ঢেউ এগিয়ে আসছে আমাদের নৌকার দিকে। সন্ধ্যের আবছা আলো-ছায়াতেও বুড়িগঙ্গার ঢেউকে মনে হলো সমুদ্রের এক বিশাল ঢেউ। সমুদ্র আমি সামনাসামনি কখনো দেখিনি। সমুদ্র সম্পর্কে আমার ধারণা জোছনা খালাম্মার বাড়িতে টেলিভিশন দেখে। আমি চোখ বুঝলাম। মনে হলো, শক্ত একটা কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আমাদের নৌাকাটা। তারপর থেমে গেল। সেই ধাক্কায় টাল সামলাতে না পেরে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। কেউ একজন আমাকে ধরে ফেলল। চোখ খুলতে দেখি, একটা লোক মিটমিট করে হাসছে।

নৌকা ডোবেনি। সেটা পাড়ে এসে লেগেছে। আমি হাঁফ ছাড়লাম।

আইন্তায় যখন এসে পৌঁছলাম তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকতেই নানি ঘরের ঠিলা থেকে পিতলের একটা গ্লাসে পানি ঢেলে শরিফের দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর নানার দিকে তাকিয়ে বললেন, আহা রে, আমার নাতিটার মুখ এক্কেরে হুগায়া গেছে গা। অরে আপনে কিছু খিলান নাই?

নানা বিরক্তমুখে বললেন, আরে, রাস্তায় কিছু আছে নিহি। মানু জান লয়া পলাইতাছে।

শরিফ পানি খাওয়া শেষ করলে নানি আমাকেও এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন। তারপর নানাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনেরও যেমুন কথা। নাতি গো একটা লেবেঞ্চুশও তো মানু কিনা দেয়। কন যে বুইলা গেছিলেন গা।

নানা এসব কথার কোনো জবাব না দিয়ে পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বললেন, হুমায়ুন ফিরছে?

হুমায়ুন আমাদের একমাত্র মামা। তিনি শ্যামপুরের সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন।

নানি বললেন, না ফিরে নাই তো। আপনে ইট্টু গিয়া দেখেন না, গোলে আইছে নিহি।

গোলে মিয়া আমাদেরই কী রকম আত্মীয়। আমরা ডাকি গোলে ভাই। গোলে ভাইও সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতেই কাজ করেন।

নানা পাঞ্জাবিটা আবার পরে নিলেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

আমিও জামাকাপড় বদলে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নানি জিজ্ঞেস করলেন, কী তর সইতাছে না? আগে খায়া-দায়া ল, তারপর যাইছ।

আমি বললাম, আপনে খাওন বাড়তে থাকেন আমি অহনই আইতাছি। এক লৌড়ে যামু, আরেক লৌড়ে আমু।

নানি বললেন, হ তর লৌড় তো জানা আছে। আক্কু-মুজাহিদ গো পাইলে তর তো আর উঁশ থাকব না। আমি কই, খায়া-দায়া তারপর বাইরে যা। নানি সাহিদা খালাম্মার উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, সাহিদা, ফরিদ-শরিফ রে খাওন দে।

আমি নিজের জামা-কাপড় বদলালেও নানি শরিফের শার্ট খুলে ওকে একটা গেঞ্জি পরিয়ে দিলেন।

খেয়ে দেয়েই আমি ছুটলাম মুজাহিদের খোঁজে। মুজাহিদ আমারই সমবয়সী। আক্কু, মানে আকতারও আমার সমবয়সী। আকতার সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। আমার মায়ের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। মুজাহিদ আর আক্কু দুজনকেই পাওয়া গেল।

আমরা ভূঁইয়া বাড়ির কবরস্থানের এক পাশে বসলাম। আমাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হলো আরো কয়েকজন।

রাতে হুমায়ূন মামা ফিরলেন না। নানিকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, হুমায়ূন মনে অয়, তগো বাড়িতই গেছে।

আমি হুমায়ূন মামার ঘরেই ঘুমুতে গেলাম।

অনেক রাতে হৈ-চৈ আর গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙল। আমি উঠে বসলাম। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হচ্ছে। ঘরের বাইরে অনেক লোকের কথা শোনা যাচ্ছে। আমি উঠে দরোজা খুললাম। ঘরের বাইরে অসংখ্য মানুষ। আমরা সবাই ‘বন্দে’ চলে গেলাম। সেখানে আশেপাশের বাড়ির মানুষেরাও ভিড় করেছে। দূরে ঢাকা টাউনের যতটুকু দেখা যায়, সেখানে কিছুক্ষণ পরপরই আগুনের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে দ্রিম-দ্রিম-টা-টা-টাস-টাস শব্দে গুলি আর বোমার আওয়াজ। শহরের একটা জায়গায় আগুনের শিখা আকাশ ছুঁয়েছে। দাউ-দাউ করে বাড়িঘর পুড়ছে! কোথায় আগুন লেগেছে, কারা গুলি করছে, কাদের করছে কিছুই বুঝতে পারছি না।

হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে সেন্টুকে দেখলাম। সেন্টু সম্পর্কে আমার মামা। আমার মায়ের চাচাতো ভাই। বয়সে আমার বেশ কিছুটা বড় হলেও আমি ওকে নাম ধরেই ডাকি। ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কী অইছে রে? এত্তো গুল্লি কারা মারতাছে?

সেন্টু আমার কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল, আর্মি গুল্লি করতাছে। ডাকা টাউনের সবতেরে মাইরা ফালাইতাছে।

মাইরা ফালাইতাছে! ক্যান? আমি অবাক হয়ে গেলাম।

সেন্টু ভয়ার্ত গলায় বললো, শেখ মুজিবরে যারা ভোট দিছে, তাগো সবাইরেই নাকি মাইরা ফালাইতাছে! দ্যাখতাছস না, বাড়ি-গরে আগুন লাগায়া দিছে।

শুনেই আমার বুক ধরাস করে উঠল। আমার আম্মা-আব্বুজি তো ঢাকায়! তাদেরকেও মেরে ফেলবে নাকি আর্মি?

কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব সেন্টু দিতে পারবে না। আমি দৌড়ে ঘরে ফিরলাম। নানা-নানি কেউ ঘরে নেই। শরিফ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো, কী অইছে, ভাইয়া?

আমি বললাম, কিছু অয় নাই। তুই ঘুমা। আর্মিরা গুল্লি করতাছে। ঘর থেইকা বাইর অইছ না কলাম। ঘরে থাকিছ। আমি নানিরে বিছরায়া লয়া আইতাছি।

ঘরের বাইরে বের হতেই পুঁটি খালাম্মাদের আঙিনায় দেখা গেলো একটা ভিড় জমাট বেঁধে আছে। সেখানে গিয়ে নানির দেখা পাওয়া গেল। তবে তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি মাটি থাপড়াতে থাপড়াতে চিৎকার করে কাঁদছিলেন আর কিছুটা সুর করে গাইছিলেন, আমার মিনার কী অইবো রে খোদা। আমার হুমায়ূনের কী অইবো...!

উপস্থিত লোকজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, আরে, মিনার কিছু অইবো না। আপনে আল্লা আল্লা করেন। আয়াতুল কুরসি পড়েন। আরেকজন তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন। মুখে বলছিলেন, ও ফুপু, গরে চলেন, মিনা আপার কিছু অইবো না। চলেন, গরে চলেন।

নানি কিছুতে উঠবেন না। তিনি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলেন।

নানির কান্না দেখে আমার কিছুটা ভয় লাগতে শুরু করলো। আম্মা-আব্বুজি ঠিক আছে তো? কায়কোবাদ কাকা? হুমায়ূন মামা?

বুকের ভেতরটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

আমি ভয় আর আশঙ্কা নিয়েই এক সময় ঘুমুতে গেলাম। কিন্তু ভূঁইয়া বাড়ির মানুষ সারা রাত ঘুমুল না। সারা রাতই ঘরের চারপাশে তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল গোলাগুলি আর অসংখ্য মানুষের কথাবার্তা শুনে। বিছানা থেকে উঠে দেখি দরোজা খোলা। বিছানা ছেড়ে দরোজার বাইরে গিয়ে দেখি, বাড়ির সবাই জেগে। কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে আছে এখানে সেখানে। আমাকে দেখে আক্কু এগিয়ে এসে বলল, তুই গুমাইতাছোস? পাকিস্তান আর্মি তো ঢাকা টাউনে হাজার হাজার মানু মাইরা ফালাইছে। তারপর আস্তে আস্তে এইদিকে আইতাছে। লোকজন ঢাকা ছাইড়া পলাইতাছে।

আমি বললাম, লোকজন পলাইতাছে ক্যামনে বুঝলি?

আক্কু বললো, আমার লগে আয়।

আক্কুর পেছনে পেছনে আমি বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালাম।

অসংখ্য মানুষের সারি ভূঁইয়া বাড়ির লাগোয়া সড়কে। নদী পার হয়ে তারা ছুটছে। কারো কারোর শরীরে গুলি লেগেছে। ছেলে-বুড়ো সবার চোখেই আতঙ্ক।

পাকিস্তান আর্মি কেন নির্বিচারে সবাইকে মারছে এটা বুঝতে আমার আরো কয়েকদিন লাগল। এও জানলাম, বাঙালিদের নেতা শেখ মুজিবকে আটক করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে আর্মিরা। তিনি জীবিত আছেন, নাকি তাকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে কেউ কলতে পারছে না।

সেদিন দুপুরের মধ্যেই ভূঁইয়া বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল।

শুনলাম ঢাকায় কার্ফিউ চলছে। কার্ফিউ কী জানতাম না। মুজাহিদকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, কার্ফিউ মানে অইলো, কেউ গরের থন বাইর অইতে পারব না। বাইর অইলেই আর্মি তারে গুল্লি কইরা মাইরা ফালাইব।

নিজেকে খুব বোকা বোকা লাগল! কত কিছুই যে জানি না আমি!

সন্ধ্যার একটু পরেই একটা খ্রিস্টান পরিবার আমাদের ভূঁইয়া বাড়িতে এলো। ভদ্ররোকের নাম অশোক খান। ‘খান’ কিভাবে খ্রিস্টান হয় ভেবে পেলাম না। শুনলাম তিনি সাত্তার ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। হুমায়ূন মামার বস। সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী, দুই ছেলে মিখায়েল ও প্রিন্স, আর এক মেয়ে ঝর্না। ঝর্না আর মিখায়েল আমাদেরই বয়সী। প্রিন্স কিছুটা ছোট।

তা হোক, আমাদের বন্ধুদের দল ভারি হয়ে গেল।

দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ূন মামা ঢাকা থেকে ফিরতে পারলেন না। আমরা ভয়ানক দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লাম। পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের মধ্যে তারা বেঁচে আছেন কিনা আমরা জানতে পারছি না।

যুদ্ধ শুরু হবার ছয় দিনের মাথায় হুমায়ূন মামা আইন্তায় ফিরে এলে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। তিনি জানালেন, ঢাকায় আম্মা-আব্বুজিসহ আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভালো আছেন। তবে, হাজার হাজার লোক মারা গেছে। হুমায়ূন মামা আসার সময় কতগুলি লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছেন তার বিবরণ দিলেন। গ্রামের লোকজন ভিড় করে তার গল্প শুনছিল।

ভূঁইয়াবাড়ির লাগোয়া সড়ক দিয়ে ঢাকা থেকে হাজার হাজার মানুষের মিছিল দিন দিন বাড়ছিলোই। নদী পার হয়ে এ পথে ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছিলেন অসংখ্য মানুষ।

কিন্তু আম্মা আর আব্বুজি গ্রামে এলেন না। তারা থেকে গেলেন ঢাকা শহরেই।
জুন মাসের শেষের দিকে আমরা ঢাকা ফিরলাম।

আমাদের বাসার দরোজায় দেখলাম, লাল কালি দিয়ে উর্দু ভাষায় বিশাল করে লেখা আছে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ তার একটু ওপরে আরবিতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’ আব্বুজির হাতের লেখা।

অনেকদিন পর ঢাকায় নিজের বাসায় ফিরে বেশ ভালো লাগছিল।

আমাদের বাসায় কোনো রেডিও ছিল না। বাসায় এসে দেখি আমাদের টেবিলের ওপর রাখা আছে নতুন একটা রেডিও। ফিলিপস ব্রান্ডের।

হঠাৎ রেডিও কেনা হলো কেন তা সন্ধ্যে হতেই বোঝা গেল।

কায়কোবাদ কাকা অনেক কসরৎ করে একটা স্টেশন ধরলেন। শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সেটা।

রাজনীতি বিষয়ে আমার বিশেষ কোনো জ্ঞান বা উৎসাহ কিছুই সে বয়সে ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির নির্বিচার হত্যাকাণ্ড আর অত্যাচার-নির্যাতনের নানা বর্ণনা আমার কানে আসছিল। ফলে পাকিস্তান বাহিনীর প্রতি একটা ঘৃণা মনের মধ্যে কিভাবে যেন জায়গা করে নিচ্ছিল।

আইন্তায় থাকতেই কারোর মুখে শুনেছিলাম, আর্মিদের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের মানুষ যুদ্ধ করছে। কোনো কোনো জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে, কত পাকবাহিনী মারা যাচ্ছে তার খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করা হয়।

আইন্তায়, মানে নানাবাড়ি থাকতে স্বাধীন বাংলা কেতার কেন্দ্র কখনো শোনা হয়নি। কার ঘরে কখন রেডিও ছেড়ে এই স্টেশনের খবর শোনা হয় তা আমরা কখনো জানতে পারিনি! হয়তো খুব গোপনে এই স্টেশন শোনা হয়। অবশ্য গ্রামে থাকতে আমরা এসব খবর শোনার ব্যাপারে খুব যে আগ্রহী ছিলাম তাও না। সন্ধ্যের পর আমরা সমবয়সীরা নানান খেলায় মেতে উঠতাম। স্কুল নেই, পড়া নেই। আমাদের তখন আনন্দ আর আনন্দ।

জিন্দাবাহারে নিজেদের বাসায় ফিরে আসার পর আমাদের বাইরে যাবার উপায় ছিল না। ঘরেই থাকতে হতো। ফলে, কায়কোবাদ কাকা যখন স্বাধীন বাংলা বা বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকা ধরতেন আমরাও তখন তা শুনতাম। আমাদের ছোট ঘরটিতে রেডিও শোনার জন্য আশেপাশের অনেক মানুষ জড়ো হতেন। পাশের বাসার সাহিদা আপার বাবা মনছুর খলিফা অবধারিতভাবেই উপস্থিত থাকতেন। কায়কোবাদ কাকার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতেন।

কায়কোবাদ কাকা খুব মনোযোগ দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানগুলো শুনতেন। খবর আর গান ছাড়াও শুনতেন চরমপত্র ও জল্লাদের দরবার।

কায়কোবাদ কাকা আর মনছুর খলিফার আলাপ আমিও কেন জানি না মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাদের আলাপ থেকেই জেনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় পাকসেনারা ‘গাবুর মাইর’ খাচ্ছে।

আব্বুজি স্বাধীন বাংলার খবর খুব একটা বিশ্বাস করতেন না। তিনি বলতেন, এইগুলি একদমই ফালতু খবর। পাক আর্মিরা অনেক শক্তিশালী। তাদের কাছে আছে আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র। কোনো ট্রেনিং ছাড়া বাঙালিরা তাদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে এটা কিছুতেই বিশ্বাসযোগ্য না।

কায়কোবাদ কাকা বলতেন, দাদা, গেরিলাযুদ্ধের কাছে কুনু কিছুই টিকব না। আপনের পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আর মিলিশিয়ারা দেইখেন ক্যামনে জান লয়া পলায়।

কয়েক মাস পার হতেই কায়কোবাদ কাকার কথাই সত্যি প্রমাণ হতে শুরু করল। সারা দেশে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে এবং বিভিন্ন জায়গায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পন করার খবর শুনছিলাম।

বিজয়ের দিন

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা আবার আমরা নানাবাড়ি আইন্তাতেই ফিরে গেলাম। মার্চের দিকে যখন এসেছিলাম তখন মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক দেখেছিলাম সেটা আর নেই। মানুষ অপেক্ষা করছে, কখন পাকিস্তানি হানাদাররা সারেন্ডার করে।

ডিসেম্বরের তের-চৌদ্দ তারিখের দিকে পাকসেনাদের ওপর বিমান হামলাও তীব্র হয়ে উঠল। সাঁ-সাঁ করে যখন মিগ টুয়েন্টি ওয়ান উড়ে যেতো মানুষ উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠত। কেউ কেউ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে উঠত।

১৫ ডিসেম্বর আইন্তা ভূঁইয়া বাড়িতে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে আশ্রয় নিলেন। তারা আমাদেরই দূরসম্পর্কের আত্মীয়-স্বজন। হুমায়ূন মামাকে দেখলাম, তাদের সঙ্গে গল্প করছেন। এক সময় দেখা গেল তিনি তাদের একজনের কাছ থেকে একটা লাইট মেশিনগান নিয়ে সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। আমি তার পাশে গিয়ে বললাম, মামা, আমি একটু দেখি?

মামা বললেন, মাম্মা, এইটা তো আপনে তুলতে পারবেন না। অনেক ভারী।

আমি বললাম, পারমু।

মামা আমার দিকে মেশিন গানটা এগিয়ে দিলেন। আমি সেটা নিতে গিয়ে বুঝলাম, বেশ ভারী। হুমায়ূন মামা অস্ত্রটা আমার হাত থেকে নিয়ে যার অস্ত্র তাকে ফিরিয়ে দিলেন।

আগে কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখিনি। ঢাকায় আমার বন্ধুরাও কখনো মুক্তিযোদ্ধা দেখেনি। এরকম কাছ থেকে কোনো অস্ত্রও তারা দেখেনি। আমিও হাত দিয়ে কখনো কোনো অস্ত্র ধরে দেখিনি। আজ একই সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর কয়েকজনকে দেখে এবং নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে ভেতরে কেমন একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম।

আমার পাশে আক্কু আর মুজাহিদ দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের বললাম, চল আমরাও মুক্তিবাহিনীর খাতায় নাম লেখাই।

ওরা আমার কথা শুনে রাজি হয়ে গেল। আক্কু বলল, অরা তো আমগো নিব না। আঠারো বছর অইলে নিত। আমি হুনছি, আঠারো বচ্ছর বয়স অইলে মুক্তিবাহিনিতে যাওন যায়।

ওর কথা শুনে আমাদের মনের কথা মনেই রয়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় ভূঁইয়াবাড়ির উঠোনে একটা নাটক মঞ্চস্থ হলো। গত কয়েক মাস ধরেই এর রিহার্সাল চলছিল। নাটকের নাম: নবাব সিরাজুদ্দৌলা। হুমায়ূন মামাও এতে অভিনয় করলেন। তিনি হলেন লর্ড ক্লাইভ।

অনেক রাত পর্যন্ত নাটক চলল।

তখন তেমন কারোর কাছে ঘড়ি ছিল না। কিংবা আমাদের ঘড়ি দেখার কেনো প্রয়োজনও ছিল না। রাত দশটা হোক কিংবা দুটো। দুটোই আমার কাছে সমার্থক। ভূঁইয়া বাড়িতে আমরা সমবয়সীরা সংখ্যায় নেহায়েৎ কম না।

সারাদিন আমাদের তাস খেলে, দাড়িয়াবান্ধা কিংবা হাডুডু খেলে কাটত। এই তাস অবশ্য বড়দের তাস ছিল না। আমরা খেলতাম সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে। কিংস্টর্ক, সিজর্স, প্যারট, ক্যাপস্টান- এসব সিগারেটের খালি প্যাকেট সংগ্রহ করে আমরা খেলতাম।

নাটক শেষ করে আমরা প্রায় ভোরের দিকে ঘুমুতে গেলাম। পরের দিন একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙল। নাস্তা করছি এমন সময়ে দেখলাম, বাইরে বেশ হৈ-চৈ হচ্ছে। কে একজন বলল, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!

আইন্তা গ্রামটা একটা অদ্ভুত গ্রাম। বেশিরভাগ মানুষই এখানে অশিক্ষিত। আমি যখনই গ্রামে এসেছি, কোনো না কোনো গুজব আমি শুনেছি।

মার্চে যখন এখানে এসেছিলাম, তখনও শুনেছিলাম, শেখ মুজিবকে পাকবাহিনী মেরে ফেলেছে। পরে, শুনেছি তাকে বন্দী করে পাকিস্তান নিয়ে গেছে! অবশ্য কোনটা যে ঠিক আমরা তখনও জানি না।

তবে, চারদিকে বেশ গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে সড়কে একটা ছোটখাটো মিছিলও বের হতে দেখলাম। মিছিল থেকে স্লোগান উঠছে, বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। জয় বাংলা।

আমরাও সেই মিছিলে মিশে গেলাম।

মিছিল নিয়ে আমরা দোলেশ্বর চলে গেলাম। দোলেশ্বরে গিয়ে দেখা গেল একটা লঞ্চ বুড়িগঙ্গার তীরে অপেক্ষা করছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ অনেক মানুষ তাতে গিজগিজ করছে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র থেকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছিলো আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিল।

আমরাও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে লঞ্চে উঠে পড়লাম। বুড়িগঙ্গা দিয়ে যেসব নৌকা ও লঞ্চ যাচ্ছিল সেগুলো থেকেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান চারদিক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর আমাদের লঞ্চও চলতে শুরু করল। লঞ্চে মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ছিল শ খানেক মানুষ। বিভিন্ন বয়সের শিশু-কিশোরও ছিল দশ-বারোজন।

লঞ্চ বিকেলের দিকে সদরঘাটে এসে ভিড়ল। আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে নামতে যাচ্ছিলাম, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের নামতে দিল না।

মুক্তিযোদ্ধাদের নেতাগোছের একজন চিৎকার করে সকলের উদ্দেশে বললেন, দয়া কইরা আপনারা কেউ নামবেন না। সবাই লঞ্চে থাকেন।

আমরা ডেকে এসে দাঁড়ালাম। মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন লঞ্চঘাটে নেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একটা লোককে চোখ বেঁধে ঘাটের একপাশে এনে দাঁড় করাচ্ছে। তার দু হাত পিছমোড়া করে বাঁধা।

নিশ্চয়ই রাজাকার কিংবা আল বদর।

আমরা লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। কী ঘটতে যাচ্ছে আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার পাশেই দাঁড়িয়েছিল আক্কু। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, লোকটারে কি অহন মাইরধর করব?

আক্কু বিজ্ঞের মতো ভঙ্গি করে বললো, দেখ না কী অয়! চোদনাটারে মনে অয় ভালোই ঠেঙ্গানি দিব।

আক্কুর কথা শেষ না হতেই গুলির আওয়াজ হলো। প্রথমে পিস্তলের একটা গুলি ছুটল। পর মুহূর্তেই এলএমজি টা-টা-টা করে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দিল। আমাদের চোখের সামনেই চোখ আর হাত-পা বাঁধা লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। একজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দিলেন।

এত কাছ থেকে কাউকে মেরে ফেলার দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। আমার বুকটা ঢিবঢিব করতে লাগল।

লঞ্চ যখন সদরঘাটে এসে ভেড়ে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম, আমি এখানে নেমে যাব। সদরঘাট থেকে জিন্দাবাহার সেকেন্ড লেনে আমাদের বাসা আধাঘণ্টার পথ। আম্মা-আব্বুজি আর কায়কোবাদ কাকাকে দেখতে খুব মন চাইছিলো। তা ছাড়া, ঢাকায় আজ অনেক কিছু ঘটবে। সেসব দেখার ইচ্ছেটাও মনের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। আমার পা লঞ্চে কেউ যেন পেরেক দিয়ে আটকে দিয়েছে। বেশ কিছু লোক লঞ্চ থেকে তখন নেমে গেলেও আমি নামতে পারলাম না।

কিছুক্ষণ পরই লঞ্চ ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে লঞ্চটা তখন ঘাট ছেড়ে আবার দোলেশ্বরের দিকে যাত্রা করেছে। একটু পরেই সদরঘাট টার্মিনাল আমার চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। তখনো লঞ্চের মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে বিজয় উদযাপন করছে।

কিন্তু আমার চোখের সামনে অচেনা এক রাজাকারের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বারবার ভেসে উঠতে লাগল।

দেশ স্বাধীন হবার পরের দিনই আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম।

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;