ফ্রাঞ্জ কাফকার পুনরুদ্ধারকৃত গল্পগুচ্ছ : স্বীয় সময়ে শুরু হবে পরিত্রাণের পালা



অনুবাদ: মামুনুর রশিদ তানিম
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ধারণা করা হয়, ফ্রাঞ্জ কাফকার জীবনের শেষ সময়ে লেখা হয়েছে এই ছোটগল্পগুলো। এই চারটি ছোটগল্পকে প্রশংসা স্বরূপ “ক্লস্ট্রোফোবিক জেম” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জার্মান ভাষা হতে ইংরেজি ভাষায় গল্পগুলো অনুবাদ করেছেন মাইকেল হফম্যান। কাফকার হারিয়ে যাওয়া লেখা হিসেবেই একরকম উদ্ধার হয় গল্পগুলো। পরবর্তীতে জানা যায়, এই চারটি গল্পের প্রথম গল্পটি “দ্য কমপ্লিট স্টোরিজ” সংকলনগ্রন্থেও আছে। এবং এই চারটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদই ১৯৫৪ সালে “ডিয়ারেস্ট ফাদার: এন্ড আদার রাইটিংস”-এ প্রকাশিত হয়েছিল বর্তমানে যার কোনো প্রিন্ট অবশিষ্ট নেই। তাই বলা যায়, নতুন করেই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে গল্প চারটি। চারটি গল্পের মাঝে শেষের গল্পটিকে কেন্দ্র করেই, “দ্য রেস্কিউ উইল বিগিন ইন ইটস ওউন টাইম”—এই নাম দ্বারা গল্পগুলোকে সংঘবদ্ধ করেছে দ্য নিউ ইয়র্কার। - অনুবাদক

আজ ফ্রাঞ্জ কাফকার জন্মদিনে তাঁর পুনরুদ্ধারকৃত চারটি গল্পের বাংলা অনুবাদ বার্তা২৪.কম-এ প্রকাশ করা হলো। - বিভাগীয় সম্পাদক



★★★

পৌরাণিক কাহিনী ব্যাখ্যাতীতকে, ব্যাখ্যায় ধরার একটি প্রচেষ্টামাত্র। সত্যের ভিত্তিপ্রস্তর হতে উদিত হবার মতো করেই উদীয়মান হয় এটি, ব্যাখ্যাতীতে পরিসমাপ্তি ঘটাই যার নিয়তি।

প্রমিথিউস সম্বন্ধে চারটি পুরাকথা আমাদের মাঝে প্রচলিত আছে। সেগুলোর প্রথমটি অনুযায়ী, মানুষের তরে দেবতাদের ধোঁকা দেওয়ার শাস্তিস্বরূপ তাকে ককেশাস পর্বতচূড়ায় শৃঙ্খলিত করে রাখা হয়, এবং দেবতা জিউস বাজপাখি পাঠাতেন, যেটি প্রমিথিউসের কলিজা খুবলে খুবলে খেত এবং পুনরায় সে-স্থানে নতুন কলিজা জন্মাত।

দ্বিতীয় পুরাকথা অনুযায়ী, ধারালো ঠোঁটের সেই ব্যথা প্রমিথিউসকে পাথরগাত্রের আরো গভীরে নিপতিত করতে থাকে রোজ, যতদিন না তিনিও পাথর হয়ে যাচ্ছিলেন।

তৃতীয় পুরাকথা অনুযায়ী, তার ধোঁকার বিষয়টি সহস্র বছরের সময়ের চক্রে ভুলে যাওয়া হয়: দেবতারা ভুলে গিয়েছিলেন, ঈগলও ভুলে গিয়েছিল, এমনকি তিনি নিজেও ভুলে গিয়েছিলেন।

আর চতুর্থ পুরাকথা অনুযায়ী, শাস্তির এই একই রকম প্রক্রিয়ায় সবাই ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল এবং কারণটাও একসময় ফিকে হয়ে গিয়েছিল। দেবতারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, ঈগলও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, এমনকি ক্ষতও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ওই পর্বতগুলোই আসল রহস্যধারী।


★★★

পাউরুটির একটি বড় ঢেলা টেবিলে পড়ে ছিল। এটিকে দুভাগ করবে বলে বাবা একটি ছুরি নিয়ে আসলো। ছুরিটি ছিল বড় এবং তীক্ষ্ণ, ওদিকে পাউরুটি খুব বেশি নরম বা শক্ত কোনোটিই ছিল না, কিন্তু তারপরেও ছুরি দিয়ে এটিকে খণ্ডায়িত করা গেল না। আমরা সন্তানেরা, বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে বাবার দিকে চাইলাম। তিনি বললেন, “তোমরা অবাক কেন হচ্ছো? কোনোকিছু ব্যর্থ না হয়ে যদি সফল হতো সেটি কি আরো অবাক করার মতো নয়? শুতে যাও; হতে পারে, পরে আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করে ফেলব।” আমরা শুতে চলে গেলাম, কিন্তু রাতের গোটা সময়টায় কিছুক্ষণ পরপর, আমাদের মাঝ থেকে একজন বা অন্যজন উঠত আর বকের মতো গলা বাড়িয়ে বাবাকে দেখত। ডান পা পেছনে নিয়ে বাম পায়ের সাথে ঠেকানো, লম্বা কোট গায়ে চড়ানো বড় মানুষটি, যিনি সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন আর পাউরুটির মাঝে ছুরি চালানোর উপায় খুঁজছেন। আমরা সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, বাবা তখন ছুরিটাকে পাশেই রাখছিলেন এবং বললেন, “এতই দুঃসাধ্য কাজ এটি, যে দেখো এখনো কিছুই ব্যবস্থা করতে পারলাম না।” আমরা নিজেরা একবার চেষ্টা করে কিছুটা পার্থক্য গড়তে চাইলাম এবং তিনি আমাদের সে অনুমতি দিলেন। কিন্তু আমরা ছুরিটাই ওঠাতে পারলাম না; রীতিমতো কুস্তি লড়তে হচ্ছিল হাতলটি ওঠাতে, যেটি তখনও জ্বলজ্বল করছিল বাবার অবিরত প্রয়াসের নিদর্শনস্বরূপ। বাবা হেসে উঠলেন এবং বললেন, “বাদ দাও। আমি বেরুচ্ছি এখন। রাতে ফের চেষ্টা করব। পাউরুটির একটা ঢেলা আমাকে নাস্তানাবুদ করবে, এ আমি হতে দেব না। এত স্বচ্ছন্দে নিজেকে কাটতে দেওয়ার মতো বাধ্যগত এটি নয়। এটিরও অধিকার আছে বিরোধ করার, তাই সে করছে।” বিস্ময়জনকভাবে এর পরপরই দেখা গেল, তিনি যেমন করে বললেন ঠিক তেমন করেই, একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের মুখের আকৃতির মতো পাউরুটিটি কুঁচকে যাচ্ছে এবং তারপর এটি আসলেই ছোট্ট একখণ্ড ঢেলা হয়ে পড়ে ছিল।


★★★

সড়কের ওপর একজন কৃষক আমার পথরোধ করে অনুনয় করেছিল, আমি যাতে তার সাথে তার বাড়িতে যাই। স্ত্রীর সাথে তার কলহবিবাদ হয়েছিল এবং তাদের এই ঝগড়া তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছিল, সম্ভবত আমি সাহায্য করতে পারতাম। তার কিছু সরলমনা ছেলেপুলেও ছিল, যারা জীবনে ভালো কেউ হয়ে উঠতে পারেনি। তারা হয় নির্বোধের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকত, নাহয় কোনো আপদ ঘাড়ে আনত। আমি বললাম, আমি সানন্দেই তার সাথে যাব। কিন্তু আমি যে একজন আগন্তুক মাত্র, তাকে কোনো উপায়ে সহায়তা করতে পারব কিনা সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ ছিল। ছেলেগুলোকে হয়তো কোনো দরকারি কাজ জুটিয়ে দিতে পারব, কিন্তু তার স্ত্রীর ব্যাপারে কোনো সহায়তার ক্ষেত্রে আমি সম্ভবত অপারগই হব। কারণ একজন স্ত্রীর কুঁজড়ামির কারণটা তার স্বামীরই কোনো দোষ বা গুণের মূলে থাকে এবং যেহেতু সে গোটা পরিস্থিতি নিয়ে অসুখী ছিল, তারমানে ইতোমধ্যেই সে নিজেকে পরিবর্তনের পীড়াদায়ক কাজটুকু হাতে নিয়েছে কিন্তু সফলতা পায়নি, তবে আমিই বা আর কিভাবে এরচেয়ে বেশি সফলতা এনে দিতে পারি? সর্বসাকুল্যে আমি যা করতে পারি তা হলো, তার স্ত্রীর ক্রোধটুকু নিজের ওপর টেনে আনতে। শুরুতে অবশ্য আমি তার সাথে কথা বলার চাইতে নিজের সাথেই বিড়বিড় করছিলাম বেশি। কিন্তু তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই ঝঁঝাট বহনের জন্য তিনি আমায় কী দেবেন। তিনি উত্তরে বললেন, যদি আমি কোনো কাজের প্রমাণিত হই তবে আমরা চটজলদিই কিছু একটাতে চুক্তিবদ্ধ হব, আর আমি যা খুশি তখন চাইতে পারি। এ পর্যায়ে এসে আমি থামলাম এবং বললাম, এই ধরনের অস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি আমায় সন্তুষ্ট করতে পারবে না। প্রতি মাসে তিনি আমাকে কী দেবেন তার একটা যথাযথ চুক্তি আমি চাইলাম। আমি তার কাছ থেকে মাসোয়ারার মতো কিছু দাবি করছিলাম দেখে সে ভারি অবাক হয়েছিল। তাকে বিস্মিত হতে দেখে, আমি নিজেই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। তবে কি সে ভেবেছিল, দুজন মানুষ সারা জীবন ধরে যে ভুল করে আসছিল তার নিষ্পত্তি আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টায় করে ফেলব? তবে কি সে প্রত্যাশা করেছিল ওই ঘণ্টা দুই শেষ হবার পর, এক বস্তা শুকনো মটরদানা আর কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে হাতে চুম্বনের লোভ আমাকে জোড়াতালি দেওয়া কাপড়ে নিজেকে আবদ্ধ করে তুষারে ছেয়ে থাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাবে? কক্ষনোই না। কৃষকটি মাথা নিচু করে নীরব থেকে, কিন্তু উদ্বিগ্নচিত্তে সবটা শুনল। আমি তাকে বললাম; গোটা ব্যাপারটি আমি যেভাবে দেখছি, সে-অনুযায়ী পরিস্থিতির সাথে পরিচিত হতে এবং সম্ভাব্য উন্নতি নিয়ে ভাবতে একটা দীর্ঘ সময় আমার তার সাথে থাকতে হতে পারে। তারপর আরো দীর্ঘ সময় থাকতে হতে পারে যথাযথ নির্দেশনা সৃষ্টিতে, যদি অমন কিছু আদৌ সম্ভবপর হতো আরকি। তারপর দেখা যেতে পারে আমি বৃদ্ধ এবং অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লাম, কোথাও আর তাই গেলাম না বরং তাদের সাথে থেকে গেলাম, বিশ্রাম নিলাম আর পরিবারের সকলের কৃতজ্ঞতা উপভোগ করলাম।

কৃষকটি বলে উঠল, “সে তো সম্ভব হবে না। আপনি তো উল্টো আমার ঘরেই থিতু হতে চাইছেন। হয়তোবা শেষে গিয়ে দেখা যাবে, আমাকেই ঘরছাড়া করছেন। তখন তো এখনকার চেয়ে আরো বড় বিপদে পড়ে যাব আমি।”

আমি বললাম, “দেখো, একে অপরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা ছাড়া আমরা কোনো চুক্তিতেই পৌঁছুতে পারব না। তোমার ওপর যে আমার বিশ্বাস আছে, তা কি আমি দেখাইনি? আমার কাছে শুধুমাত্র তোমার প্রতিশ্রুতিই আছে, তা কি তুমি ভাঙতে পারো না? তোমার ইচ্ছা মোতাবেক আমি যদি সবকিছুর ব্যবস্থা করি, তারপর তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারো না?”

কৃষকটি আমার দিকে চেয়ে বলল, “আপনি তা কখনোই হতে দেবেন না।”

আমি বললাম, “করো তোমার যা মর্জি এবং ভাবো আমাকে নিয়ে যেমন খুশি। কিন্তু আমি এই কথাটা তোমাকে বন্ধুত্বের খাতিরে নয়, বরং এক পুরুষ হয়ে আরেক পুরুষকে বলছি, যে আমাকে তোমার সাথে করে যদি না নিয়ে যাও তবে ওঘরে তুমি খুব বেশি সময় টিকতে পারবে না। ভুলে যেও না আমার এই কথাখানি। অমন স্ত্রী আর ছেলেপুলেদের নিয়ে কী করে সংসার করবে তুমি? আমাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সুযোগটা যদি তুমি হাতে না নাও, তবে বাড়ির এত ঝঞ্ঝাট ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে আমার সাথে আসছো না কেন? একই পথ ধরে হাঁটব আমরা দুজনে এবং তোমার সন্দেহগুলোকে তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করব না আর।”

“তা আমি করতে পারি না”, কৃষকটি বলে উঠল। “১৫ বছর ধরে আমি, আমার স্ত্রীর সাথে ঘর করছি। যথেষ্ট কঠিন কাজ ছিল এটা। এমনকি আমি নিজেও বুঝতে পারছি না, আমি কিভাবে হাল ধরে ছিলাম। কিন্তু সেটা সত্ত্বেও, তাকে সহ্য করা যায় এমন সকল কিছুর চেষ্টা করা ছাড়াই আমি তো তুড়িতেই আর তাকে পরিত্যাগ করতে পারি না। তারপর আপনাকে রাস্তা দিয়ে আসতে দেখে ভাবলাম, আপনাকে সাথে নিয়ে একটা শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। আপনি আসুন আমার সাথে, যা চান তাই-ই দেব আপনাকে। বলুন কী চান?”

“খুব বেশিকিছু আমি চাই না”, আমি বললাম। “তোমার অবস্থা আরো দুর্দশাপন্ন করার মতলব আমার নেই। আমি চাই, তোমার আজীবনের মজুর হিসেবে আমাকে তুমি নিয়ে যাবে। আমি সব ধরনের কাজেই সিদ্ধহস্ত। তাই তোমার বেশ কাজে লাগব বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু আমি অন্যান্য শ্রমিকদের মতো পরিগণিত হতে চাই না। তুমি আমাকে দিয়ে ফরমায়েশ খাটাতে পারবে না। আমার যে কাজ মনে লয়, সেটাই করার স্বাধীনতা আমি রাখব। হয়তো এটা হয়তো সেটা, নয়তো কিছুই না; যেমনটা আমার মনে লয়। তুমি আমাকে কিছু একটা করতে ততক্ষণই বলতে পারবে, যতক্ষণ তুমি ভদ্রোচিত ভাবে সেটা বলছো। এবং তারপর যদি দেখো, আমি সেটা করতে চাইছি না তবে তোমাকে তা মেনে নিতে হবে। আমার পয়সাকড়ি চাই না। কিন্তু চলতি মানের সাথে মিল রেখে কাপড়, অন্তর্বাস, বুট জুতা আমার চাই। এবং যখনই দরকার পড়বে, ওগুলো তখনই বদলে দিতে হবে। তোমার গ্রামে যদি এই জিনিসগুলো অলভ্য হয়, প্রয়োজনে তুমি শহরে যাবে ওগুলো ক্রয় করতে। তবে অত ভেবো না। আমার বর্তমান কাপড়গুলোতেই আরো বছরখানেক চলে যাবে। মজুরের যথাযথ মজুরি নিয়েই আমি খুশি থাকব। তবে আমি জেদ ধরব শুধু, রোজ মাংস খাওয়ার ব্যাপারে।”

কথার মাঝখানে বাগড়া দিয়ে সে বলল, “রোজ?” বাকি শর্তগুলো মেনে নিল যদিও।

“হ্যাঁ রোজ”, আমি বললাম।

আমার অদ্ভুত শর্তকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় সে বলে উঠল, “আমি খেয়াল করেছি আপনার দাঁতগুলো বড়ই অস্বাভাবিক।” এমনকি সে আমার মুখ অব্দি পৌঁছে গেল ওগুলো ছুঁয়ে দেখতে। “খুব ধারালো। একেবারে কুকুরের দাঁতের মতো,” সে বলল।

“সে যাকগে। প্রতিদিন মাংস চাই,” আমি বললাম। “এবং বিয়ার এবং মদও ততখানি চাই, যতখানি তুমি পান করো।”

সে বলল, “এ তো অনেক বেশি। আমি প্রচুর পান করি।” আমি বললাম, “যত বেশি তত ভালো। তারপর তুমি যদি বেল্ট আঁটসাঁট করো, আমিও করব আমারটা। তোমার অসুখী সংসারজীবনের জন্যই হয়তো তুমি এত বেশি মদ খাও।”

“না,” সে বলল, “ওটা কেন এটার সাথে সম্পর্কিত হতে যাবে? তবে আমরা দুজনে একসাথেই পান করব। আমি যতখানি পান করব, আপনিও ততখানি।”

“না,” আমি বললাম, “সঙ্গ নয়। বরং একা একা খেতে এবং পান করতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।”

কৃষক বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “একা? আপনার এতসব শর্ত আমার মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে।”

আমি বললাম, “এত বেশিও নয় এবং প্রায় শেষদিকেই চলে এসেছি। আমি প্রদীপের জন্য তেল চাই, যেটি রাতভর আমার পাশে জ্বলতে থাকবে। প্রদীপটি আমার সাথেই আছে। আকারে খুবই ছোট। ওই প্রদীপগুলোর মতো, যেগুলো চালিয়ে নেবার জন্য তেমন কিছুই লাগে না। উল্লেখযোগ্য কিছু যদিও এটি নয়। কিন্তু একটা সম্পূর্ণতার জন্যই আমি উল্লেখ করলাম, পাছে এটা নিয়ে পরবর্তীতে আমাদের মাঝে বিতর্ক না হয়। অর্থকড়ি আদানপ্রদানের কথা আসলে এই ব্যাপারগুলো আমার একেবারেই অপছন্দ। বাকি সবকিছুতে আমি নরম স্বভাবের মানুষ, কিন্তু একবার হয়ে যাওয়া চুক্তি ভঙ্গ হলেই, আমি ভারি উগ্র হতে পারি, স্মরণে রেখো। যা কিছু আমি অর্জন করেছি, তার পইপই হিসাব যদি আমাকে বুঝিয়ে না দেওয়া হয় তবে আমি তোমার ঘরও জ্বালিয়ে দিতে পারি যখন তুমি বেঘোরে ঘুমাবে। তাই যে ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছিলাম, সেটা অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর তারপর, বিশেষ করে আবেগের বহিঃপ্রকাশ থেকে ক্কচিত্ কোনো উপহার যদি তুমি আমাকে দাও, খুব দামি কিছু হতে হবে না একদম তুচ্ছ কিছুও যদি হয়, তাও আমি সকল পন্থাতেই তোমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকব, দুঃসাহসী থাকব। এইমাত্র যা বললাম, এর বাইরে আগস্টের ২৪ তারিখ, আমার নামকরণের দিনে ২ গ্যালন রামের একটা ছোট্ট পিপা ছাড়া আমার আর কিছু চাওয়ার থাকবে না।”

হাত দুটো একত্রে বাজিয়ে বিস্ময়ের স্বরে কৃষক বলে উঠলো, “দুই গ্যালন।”

“হ্যাঁ, দুই গ্যালন,” আমি বললাম। “অত বেশিও তো নয়। তুমি হয়তো কষাকষি করে কমিয়ে আনার কথা ভাবছো। কিন্তু জেনে রাখো, তোমার কথা বিবেচনা করে, আমি ইতোমধ্যেই দাবিদাওয়া কমিয়ে এনেছি। কোনো আগন্তুক যদি আমাদের কথা শুনে ফেলার জন্য থাকত, তবে আমি যথেষ্ট লজ্জা পেয়ে যেতাম অবশ্যই। এখন আমরা যেভাবে কথা বলছি, কোনো আগন্তুকের সামনে আমি কখনোই সেভাবে কথা বলতে পারতাম না। তাই কেউ আমাদের চুক্তি শুনতে পাবে না। অবশ্য কেইবা এসব কথা বিশ্বাস করবে?”

কিন্তু কৃষক বলল, “আপনি বরং নিজের রাস্তাই ধরুন এবার। আমি বাড়ি যাব এবং স্ত্রীর সাথে সবকিছু মিটমাট করে নেওয়ার চেষ্টা করব। হ্যাঁ, এটা সত্যি, বিগত কিছু সময় ধরে তাকে অনেক মারধর করেছি আমি। এবার কিছুটা ছাড় দেব বলে মনে করি। এতে হয়তো সে খুব কৃতজ্ঞ হয়ে পড়বে আমার প্রতি। ছেলেগুলোকেও প্রচুর মেরেছি। আস্তাবল হতে চাবুক বের করে মারতাম তাদের। ওটায়ও একটু বিরাম দেব এবার, হয়তো সবকিছু বদলাতেও পারে। স্বীকার করছি, আমি অতীতেও এই চেষ্টা করেছি, বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি তাতে। কিন্তু আপনার চাহিদার ভার অনেক। এমনকি ওগুলো না থাকলেও, এটি ব্যবসায়ের চেয়ে বেশি ভারী। রোজ মাংস, দুই গ্যালন রাম সম্ভব না। যদি সম্ভব হতো, তাও আমার স্ত্রী কখনোই অনুমতি দিত না। আর সে যদি না দেয়, তবে আমিও কিছু করতে পারব না।”

আমি বললাম, “তবে কেন আপোসের এই দীর্ঘ চেষ্টা?”


★★★

সত্যি কথা বলতে, এই গোটা বিষয়টায় আমি খুব একটা উৎসাহী নই। এক কোনায় শুয়ে আমি ততটাই দেখছিলাম, এমন হেলানো অবস্থান থেকে যতটা কেউ দেখতে পারে। ততটাই শুনছিলাম, যতটা বুঝতে পারি আমি। এ ছাড়া তো একরকম ঊষালগ্নেই বাস করছি আজ অনেকমাস যাবত। অপেক্ষা করছি নিঝুম রাত নামার। আমার কারাসঙ্গী অবশ্য ভিন্ন অবস্থায় আছে। অদম্য একটা চরিত্র তিনি, একজন দলপতি। তার অবস্থা আমি আন্দাজ করতে পারি। তিনি ওই দৃষ্টিভঙ্গির লোক, যার দুর্দশা বিপরীত মেরুর অনুসন্ধানকারীর মতো, যিনি বেহাল অবস্থার চাপে জমাটবদ্ধ হয়ে পড়েছেন কিন্তু শীঘ্রই যার পরিত্রাণের পালা আসবে অথবা ইতিমধ্যেই যাকে মুক্ত করা হয়েছে। তবে এতে অনৈক্যও আছে: কেবল তার বিজয়ী ব্যক্তিত্বের ওজন বিবেচনা করে, তাকে উদ্ধার করা হবে এটা তার কাছে কল্পনাতীত। তার কি এবার পরিত্রাণ কামনা করা উচিত? তার কামনা করা বা না করায় অবশ্য কিছু আসে যাবে না, উদ্ধার সে হবেই। তবে; তার কামনা করা উচিত কিনা, সে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যাবে। আপাতদৃষ্টিতে তার সাথে সংযুক্ত এই নিগূঢ় প্রশ্নটি নিয়ে তিনি আগাগোড়া ভাবেন, আমার সামনেও উত্থাপন করেন। আমরা একসাথে বসে আলোচনা করি। তার উদ্ধারকর্ম নিয়ে আমরা বাতচিত করি না। উদ্ধারের জন্য সম্ভবত, কোনো উপায়ে লব্ধ ছোট্ট ওই হাতুড়িতেই তিনি তার সকল আশা আটকে রেখেছেন, যেই হাতুড়ি ড্রয়িংবোর্ডে পিন আটকাতেই মানুষ ব্যবহার করে বড়জোর। এর বেশিকিছু পাওয়ার সামর্থ্য তার নেই, কিন্তু এটিও তিনি ব্যবহার করেন না। এটির ওপর তার অধিকারের বিষয়টি শুধুমাত্র আনন্দিতই করে তাকে। কখনো কখনো তিনি আমার পাশে নতজানু হয়ে বসেন এবং হাতুড়িটি ধরে থাকেন যেটি হাজারবার আমি আমার মুখের সামনে দেখেছি, নয়তো আমার হাতটি টেনে নিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে হাতুড়ি দিয়ে আমার আঙুলগুলো ঠুকতে থাকেন। তিনি ভালো করেই জানেন দেয়াল হতে চটও খসানোর ক্ষমতা নেই হাতুড়িটির এবং তিনি ওকাজ করতেও আগ্রহী নন। কখনো কখনো হাতুড়িটি সারা দেয়ালে চড়িয়ে বেড়াতে থাকেন তিনি, যেন উদ্ধারকর্মের জন্য অপেক্ষারত যন্ত্রপাতিকে তাদের এই অপারেশনে একটু দোলা দেওয়ার সংকেত দিচ্ছেন। ঠিক এই তরিকায় তো নয় কিন্তু যথাসময়ে পরিত্রাণকর্ম ঠিকই আরম্ভ হবে। হাতুড়ি নির্বিশেষে কোনো কাজে তো আসবে না, কিন্তু কিছু একটা হয়ে রয়েই যাবে ঠিক। স্পর্শনীয়, উপলব্ধনীয় কিছু একটা। একটা নিদর্শন, যেটিকে চুম্বন করা যায়, পরিত্রাণকে চুম্বন করা না গেলেও।

অবশ্যই, যে কেউ বলতে পারে বন্দীদশা নেতাকে উন্মাদ করে তুলেছে। তার চিন্তাভাবনার বৃত্তটি এতই খর্বাকৃত হয়েছে যে নূন্যতম কিছু ভাববার জায়গা থোড়াই আছে আর।

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;