লোক দেখানো মনোভাব ইবাদত-বন্দেগি নষ্টের কারণ

বিশেষ নিবন্ধ, ইসলাম

মুফতি মাহফুজ আবেদ, অতিথি লেখক, ইসলাম | 2023-09-01 23:12:46

কয়েকজন মিলে আলাপ করছে। আলাপের ফাঁকে একজন অন্যজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, বন্ধু তোমার কী মনে আছে তাওয়াফের ওই ঘটনাটা? এর পর বিস্তারিত ঘটনার বিবরণ। ওই বিবরণটা বন্ধুদের আলাপের মাঝে টেনে আনার উদ্দেশ্য হলো- তার হজ কিংবা উমরার বিষয়টি জানান দেওয়া।

দুই.
আলহামদুলিল্লাহ, আগামী অমুক তারিখ উমরার অনুমতি পেয়েছি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটু স্বস্তি। বেশ কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দিচ্ছেন অনেক সৌদী প্রবাসী। এবার আপনিই বলুন, উমরার অনুমতির বিষয়টি ফেসবুকে দেওয়ার মানে কী? এটাতো একান্ত ইবাদত। আপনি উমরা করার সুযোগ পেয়েছেন, ভালো কথা- আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এটা মানুষকে ঘটা করে জানাতে হবে কেন? আপনার কী ধারণা, মানুষকে না জানালে উমরা কবুল হবে না?

তিন.
নামাজ শেষ করে উঠে যাওয়ার সময় জানতে পারলেন বাসায় কোনো মেহমান এসেছে। এজন্য মেহমান ঘরে প্রবেশ করা পর্যন্ত জায়নামাজে বসে থাকলেন। সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত না হলেও অবচেতন মন চাইছে নামাজে যে পড়ছেন- মেহমান দেখুক।

চার.
কেউ একজন ফোনে আপনাকে জিজ্ঞেস করলো, কি করছেন? উত্তরে বললেন, নামাজ পড়ে, কোরআন তেলাওয়াত শেষে এখন পত্রিকা পড়ছি কিংবা নাস্তা করতেছি। এখানে শুধু পত্রিকা পড়ার কথা বললেই হতো। আলাপচারিতায় ‘নামাজ পড়ে, কোরআন তেলাওয়াত শেষে’ কথাটি জুড়ে দিয়ে অতি সূক্ষ্মভাবে নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতকে প্রচারে নিয়ে আসা হলো।

পাঁচ.
ফজরে যে নামাজ পড়তে উঠলাম, কিন্তু কেউ জানলো না। তাই সেটা মানুষকে জানানোর জন্য দিলাম ফেসবুকে একটা পোস্ট- ‘সবাই নামাজ পড়তে উঠুন।’ এই পোস্টে কারও ঘুম ভাঙবে না, কেউ দেখে নামাজে যাবে না। তাও দিলাম। কারণ, নামাজের ব্যাপারটা সবাইকে জানাতে হবে।

ছয়.
নফল রোজা রেখে দুপুরে বন্ধুর সঙ্গে চ্যাট করছি। হঠাৎ ভিন্ন প্রসঙ্গে যেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাত খেয়েছিস কি-না?’ অথচ আজীবন তার ভাত খাওয়ার খবর নেইনি। সে হ্যাঁ বা না উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করবে- আপনি খেয়েছেন?’ এ সুযোগে জানিয়ে দিলাম- নারে, দোস্ত! আমি রোজা রাখছি পরশু থেকে। আরও দু’টো বাকী আছে। করে দিলাম নফল রোজার প্রচার।

সাত.
কোরবানির জন্য গরু কিনলাম। অফলাইনে বাসা-বাড়ির আশেপাশের সবাই দেখলেও অনলাইন বন্ধুদের তো দেখা হলো না! তাই প্রাইভেসি পাবলিক করে দিলাম ফেসবুকে পোস্ট, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তুমি কবুল করো।’ লাইক-কমেন্ট শুরু। অনেকেই দামও জিজ্ঞেস করছে। প্রশ্নের উত্তর না দিলে তো আর চলে না! সুযোগে দামটাও বলা হলো!

আট.
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় মজার ছলে অন্যজনকে বললাম, তুই বেটা কিপটা; কিছুই দান করিস না। ‘তুই কি দান করে উল্টিয়ে ফেলছিস’ এই প্রশ্নটা যে করবে, তা জানুয়ারির পর ফেব্রুয়ারি আসার মতোই নিশ্চিত। সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিলাম, আমার দানের লিস্ট; মানুষকে উপকার করার তালিকা।

ওপরে উল্লেখ করা ঘটনাগুলো কাল্পনিক নয়। সৎ নিয়তে স্বীকার করতে বললে দেখা যাবে, অনেকের জীবনের সঙ্গে তা মিলে গেছে। এবার বলুন, এখানে যে ইবাদত-বন্দেগিগুলোর কথা আলোচনা করা হলো, সেগুলা কি আল্লাহর জন্য; নাকি লোক দেখানো? আল্লাহর জন্য হলে, এভাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রচার কেন? লোক দেখানো মনোভাব কেন? কখনও ভেবেছেন, এসব ইবাদত আদৌ কবুল হবে কি-না? ইসলামি শরিয়তে একেই বলে- রিয়া। যার সরল অর্থ- লোক দেখানো ইবাদত, প্রদর্শনপ্রিয়তা।

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিয়াকে ছোট শিরক বলেছেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে ছোট শিরক নিয়ে যতোটা ভয় পাচ্ছি, অন্যকোনো ব্যাপারে এতোটা ভীত নই। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কী? তিনি বলেন, রিয়া বা প্রদর্শনপ্রিয়তা। আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের প্রতিদান প্রদানের সময় বলবেন, তোমরা পৃথিবীতে যাদের দেখাতে, তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের কাছে তোমাদের কোনো প্রতিদান আছে কি না?’ –মুসনাদে আহমদ: ২২৫২৮

কোরআনে কারিমেও আল্লাহতায়ালা লোকদেখানো ইবাদত-বন্দেগি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেনো সৎ কাজ করে এবং তার প্রভুর ইবাদতে কাউকে অংশীদার না করে।’ –সূরা কাহাফ: ১১০

অন্য আয়াতে লোকদেখানো ইবাদতকারীদের নিন্দা করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজের ব্যাপারে উদাসীন, যারা প্রদর্শন করে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া থেকে বিরত থাকে।’ - সূরা মাউন: ৪-৭

বর্ণিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা রিয়াকে কবিরা গোনাহ (বড় পাপ) ও হারাম আখ্যা দিয়েছেন। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) কবিরা গোনাহের তালিকার প্রথমে রিয়ার আলোচনা করেছেন। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, নিশ্চয়ই প্রদর্শনপ্রিয়তা হারাম। প্রদর্শনকারী আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয়। কোরআনের আয়াত, রাসূলের হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্য দ্বারা তা প্রমাণিত।’ -ইহয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/৪৮০

বান্দার আমলে রিয়া যদি ইচ্ছাকৃত হয়, তবে তা যত গৌণই হোক; ওই আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি শরিককারীদের শরিক থেকে অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি কোনো আমল করলো এবং তাতে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করলো, আমি তাকে ও যাকে সে শরিক করল তাকে প্রত্যাখ্যান করি।’ –সহিহ মুসলিম: ৩৫২৮

তবে রিয়া যদি অনিচ্ছায় হয়, বান্দা তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে এবং এ জন্য অনুতপ্ত হয়- তবে গ্রহণযোগ্য মতো হলো, এমন ইবাদত আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হবে না। ব্যক্তি রিয়া নামক ছোট শিরক থেকে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আশা করা যায়, ব্যক্তি ইবাদতের দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তবে তার প্রতিদান কী হবে, তা আল্লাহতায়ালাই ভালো জানেন।

আল্লাহতায়ালা সব মুমিন-মুসলমানকে রিয়ামুক্ত ইবাদতের তওফিক দান করুন। আমিন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর