রাস্তায় চলাচল, ফুটপাত ব্যবহার ও গাড়ি পার্কিং বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা

বিশেষ নিবন্ধ, ইসলাম

ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম | 2023-08-31 16:28:28

সাহাবি হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা রাস্তার পাশে বসে থেকো না। সাহাবারা বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমাদের তো এর প্রয়োজন হয়, পরস্পরে প্রয়োজনীয় কথা বলতে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বসতেই যদি হয় তবে রাস্তার হক আদায় করে বসো। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার হক কী?

হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাস্তার হক হলো- দৃষ্টিকে অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজ হতে বিরত রাখা। -সহিহ বোখারি: ৬২২৯

অন্য বর্ণনায় আরও কিছু বিষয় এসেছে। যেমন- পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া, মজলুম ও বিপদগ্রস্তের সাহায্য করা, বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা, ভালো কথা বলা, হাঁচির জবাব দেওয়। -সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১৯

যেহেতু রাস্তায় বসলে তাতে যাতায়াতকারীদের কষ্ট হয়। আর রাস্তা তো বৈঠকখানা নয়, এটা চলাচলের জন্য। তাই নবী করিম (সা.) রাস্তায় বসতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামের অপারগতা দেখলেন, হক আদায় করার শর্তে প্রয়োজন পরিমাণ বসার অনুমতি দিলেন।

সুতরাং রাস্তায় দাঁড়ানো বা বসা ব্যক্তির খেয়াল রাখা উচিত, যেন তার দ্বারা কোনো চলাচলকারীর সামান্য কষ্ট না হয়। এটাই ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশ।

কষ্ট দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি
এমনভাবে দাঁড়ানো বা বসা যে যাতায়াতকারীর কষ্ট হয়। কিংবা রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ফলের খোসা-ময়লা-আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, পানের পিক ফেলা, দুর্গন্ধ ছড়ায় এমন কোনো জিনিস ফেলে রাখা, ছাদ থেকে পানি নিষ্কাষণের পাইপ রাস্তায় দেওয়া। এসব কষ্ট দেওয়ার নানা উপায়।

তেমনি ফুটপাতে বা রাস্তায় দোকান বসানো, যার কারণে চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়, এটাও কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। দোকানের সীমানা বাড়াতে বাড়াতে রাস্তার মধ্যে চলে যাওয়া, অথবা বাড়ির প্রাচীর বাড়িয়ে দেওয়া; যে কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এটাও কষ্টের কারণ।

সাধারণত বাজার কিংবা মার্কেটগুলোতে দেখা যায়, দোকানের অর্ধেক ভেতরে আর অর্ধেক বাইরে- ফুটপাতে। মনে হয় যেন ফুটপাত দোকানদারের হক! অথচ সবাই জানে এটা দোকানের অংশ নয়; ক্রেতাদের জন্য অথবা চলাচলকারীদের বানানো হয়েছে, যাতে যাতায়াত সহজ হয়। কিন্তু এখন ফুটপাতই দোকান হয়ে গেছে। অনেকে তো ফুটপাতে ঘর বানিয়ে শাটার লাগিয়ে রীতিমতো মার্কেট বানিয়ে ফেলে। কেউ আবার মালসামানা এমনভাবে রাখে যার দ্বারা রাস্তা আর দেখা যায় না। চলাচল করা যায় না।

গাড়ি পার্ক করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া পাপ, ছবি: সংগৃহীত

 

অনেকে আবার ফুটপাত দখল করে দোকান খুলে বসে। এতেও রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যায়। অথচ এটা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ। এ কারণে বাজারে আসা-যাওয়া কিংবা চলাচলের সময় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাস্তায় যানজট দেখা দেয়, নানাবিধ দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ মানুষ যদি রাস্তার হক আদায় করে চলে, তাহলে রাস্তাগুলো প্রশস্ত থাকবে, চলাচলে আর কষ্ট হবে না- ইনশাআল্লাহ।

ঈমানের দাবি
দেখুন, ঈমানের সর্বনিম্ন শাখা হলো- রাস্তায় কষ্টদায়ক কোনো জিনিস দেখলে তা সরিয়ে দেওয়া। হাদিসে বলা হয়েছে, এটা ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে, সর্বোত্তম শাখা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া, আর লজ্জা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। -সহিহ মুসলিম: ৩৫

অন্য আরেক রেওয়ায়েতে আছে, হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি হজরত আবু যর গিফারি (রা.)-কে নসিহত করেন, তার মাঝে একটি উপদেশ ছিলো- রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও সদাকা। -জামে তিরমিজি: ১৯৫৬

উল্লেখিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, মুমিনের কাছে ঈমানের ন্যূনতম দাবি হলো, সে যখন রাস্তায় চলবে কষ্টদায়ক কিছু দেখলে সরিয়ে দেবে। হতে পারে এই ওসিলায় সে কিয়ামতের দিন নাজাত পেয়ে যাবে।

রাস্তা থেকে কাঁটাদার গাছ কাটার পুরস্কার বিষয়ে একাধিক হাদিসে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনম আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতের গালিচায় গড়াগড়ি খেতে দেখলাম (অর্থাৎ শান্তি ও আরামের সঙ্গে সুখময় জীবন কাটাচ্ছে)। মানুষের চলাচলের পথে একটি গাছ ছিল, যার কারণে চলাচলে কষ্ট হচ্ছিল। এ ব্যক্তি তা কেটে দিয়েছিলো। (ফলে আল্লাহ খুশি হয়ে তাকে জান্নাতে দাখেল করেন)। -সহিহ মুসলিম: ১৯১৪

বড় কোনো আমলের কারণে নয়, বরং মানুষের যাতায়াতের রাস্তায় একটি কাঁটাদার গাছ ছিলো, এ ব্যক্তি সেটি কেটে দিয়েছিল। যাতে পথিকের পথ চলা নির্বিঘ্ন হয় এই আমলের বরকতেই আল্লাহ তাকে জান্নাতে পৌঁছে দিয়েছেন।

রাস্তায় চলাচলের সময় অনেক কষ্টদায়ক বস্তু আমাদের নজরে আসে। কিন্তু আমরা মনে করি এটা তো সরকারের কাজ, তারা করবে। ঠিক আছে তাদের করা উচিত, কিন্তু আমরা মুসলমান সুতরাং এটা আমাদেরও দায়িত্ব, কারণ এটা ঈমানের দাবি।

গাড়ি পার্ক করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া 
রাস্তায় কষ্টদায়ক কাজের অন্যতম হলো- যত্রতত্র সাইকেল, মোটরসাইকেল, গাড়ি পার্ক করে রাখা। নিষিদ্ধ জায়গায় গাড়ি পার্ক করা অন্যায়। চাই সেই জায়গা খালি থাকুক কিংবা অব্যবহৃত। নিষেধ সর্বাবস্থায় মানতে হবে। আর যেখানে গাড়ি পাকিংয়ের অনুমতি আছে, সেখানেও এমনভাবে গাড়ি পার্ক করা, যেন অন্য গাড়িওয়ার কষ্ট না হয়। অনেক সময় দেখা যায়, দোকানের সামনে এমনভাবে গাড়ি রাখছে কেউ কেউ, যে কারণে দোকান বন্ধ হয়ে যায়, ক্রেতা-গ্রাহক আসতে পারে না কিংবা আসতে কষ্ট হয়। এটাও অনুচিত কাজ।

তদ্রূপ রাস্তায় বেশি জোরে গাড়ি চালােনা, রং সাইডে চলাচল কিংবা অযথা হর্ণ বাজানো মানুষ পছন্দ করে না। এগুলোও খেয়াল রাখা দরকার। এক কথায়, গাড়ি এমনভাবে চালাতে হবে, যেন কোনো মানুষ ও প্রাণী কষ্ট না পায়। কারও কোনো পেরেশানি না হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর