Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

মাসিক, প্রসব পরবর্তী স্রাব, দুধ পান করানো ও গর্ভাবস্থায় রোজার বিধান

মাসিক, প্রসব পরবর্তী স্রাব, দুধ পান করানো ও গর্ভাবস্থায় রোজার বিধান
নারীদের নানাবিধ অসুস্থতা রোজার মাস নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের প্রধান অন্তরায়, ছবি: সংগৃহীত
যাইনাব আল গাযী
অতিথি লেখক
ইসলাম
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

বছরের বারো মাসই ইবাদতের মাস। বারো মাসই আমাদেরকে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল ইবাদতে কাটাতে হবে। কোনো মাসে ছাড় নেই। তবে রমজান হচ্ছে একটা সোনালী সুযোগের মতো। এ মাসে আল্লাহতায়ালা শয়তানকে বেঁধে বান্দাকে সুযোগ করে দেন নেকির কাজ করে আমলনামা ভারি করার।

প্রত্যেক নারী-পুরুষিই চান রমজান মাসে খুব বেশি করে ইবাদত করতে। কিন্তু চাইলেই তো আর সব হয় না, নারীদের নানাবিধ অসুস্থতা পুরো রোজার মাস নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের প্রধান অন্তরায়। তাই বলে এটা নিয়ে মন খারাপের কোনো কারণ নেই। এটা আল্লাহর বিধান।

মাসিক ও প্রসব পরবর্তী স্রাবের সময়কার রোজা
রমজান মাসে বা তার কিছু আগে যদি কেউ মা হন, তবে প্রসব পরবর্তী স্রাব (নেফাস), শারীরিক দূর্বলতা ও বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের পক্ষে রোজা পালন সম্ভব হয় না। কোনো উপায়ও থাকে না প্রসব পরবর্তী স্রাব বন্ধ রেখে রোজা রাখার। তবে মাসিক পিরিয়ড ঔষধ সেবন করে বন্ধ রাখা যায়। মাসিক পিরিয়ড বন্ধ রাখা ও না রাখা নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক।


মাসিক পিরিয়ড বন্ধ না রেখে রোজা
ক. রমজান মাসে কেউ যদি হায়েজ বা নেফাসের কারণে রোজা রাখা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে অবশ্যই তাকে পরবর্তীতে যতগুলো রোজা বাদ পড়েছিল সব কাজা আদায় করতে হবে। কোনো কাফফারা নেই। শুধু একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা রাখবে।

খ. এই রোজাগুলো সে একাধারে বা দুই-একদিন বাদ দিয়ে, বাদ দিয়ে রাখতে পারবে।

গ. হায়েজের রোজা শাওয়াল মাসে রেখে এরপর শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা উত্তম। তবে কেউ যদি কাজা রোজা শাওয়ালে না রাখে, তবে বছরের অন্য যেকোনো মাসেও রাখতে পারবে।

ঘ. নেফাসের রোজা যেহেতু অনেকগুলো হবে তাই সেটা শাওয়াল বা পরবর্তী যেকোনো মাসে বা পরের রমজান আসার আগে পুরো বছর মিলিয়ে সপ্তাহে দুই-তিনটা বা আরও কম বেশি করে রেখে কাজা আদায় করতে পারবে।

ঙ. নেফাসের সর্বোচ্চ সীমা ৪০দিন। তবে কারও এর বেশি বা কম দিনও হতে পারে। যদি ৪০ দিন হওয়ার আগেই কেউ পবিত্র হয় তবে তার শরীর সুস্থ হলে, তার নিজের ও বাচ্চার কোনো ক্ষতি না হলে- সে চাইলে রোজা রাখতে পারবে। আর যদি কারও ৪০ দিনের ওপর চলে যায়, এর মাঝে রমজানও আসে, তবে এটুকু জানতে হবে যে, ৪০ দিনের ওপর যে রক্তটুকু যাবে তা নেফাস নয় বরং তা ইস্তিহাজা অর্থাৎ কোনো রোগজনিত রক্ত। মা চাইলে আর কোনো ক্ষতির আশংকা না হলে রোজা রাখতে পারবে।

মাসিক বন্ধ রেখে রোজা
এক ধরনের পিল পাওয়া যায় যা খেয়ে মাসিক কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা যায়। এই পিল খেয়ে হায়েজ বন্ধ রাখার জায়েজ ও নাজায়েজ উভয় হুকুমই হবে অবস্থা বুঝে।

পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ রাখার কিছু শর্ত আছে। শর্তগুলো পূরণ হলে তখন জায়েজ হবে, অন্যথায় নয়। শর্তগুলো হলো-

১. বিবাহিত হলে স্বামীর অনুমতি লাগবে। কারণ পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করার সঙ্গে পেটে বাচ্চা আসার সম্পর্ক রয়েছে। আর বাচ্চা পেটে আসার সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক রয়েছে।

২. পিল খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হতে পারবে না। অনেকের মাসিকের নিয়মিত অভ্যাস অনিয়মিত হয়ে যায়, অনেকের হরমনজনিত সমস্যা দেখা দেয়, শরীর মোটা হয়ে যায়। অর্থাৎ কেউ কেউ অসুস্থ হন আবার কেউ কেউ হন না। যাদের পিল নিলে সমস্যা হয় তারা পিল নিয়ে মাসিক বন্ধ রাখতে পারবেন না। কিংবা যদি কাউকে ডাক্তার নিষেধ করেন পিল নিতে, তবে তার জন্যও জায়েজ হবে না।

৩. বিনা প্রয়োজনে পিল খাওয়া জায়েজ নেই। (অনেকে এমনিতেই মাসিক বন্ধ রাখতে পিল নেন)।

উল্লেখিত আলোচনায় উঠে আসা প্রয়োজনকে নিরঙ্কুশভাবে শতভাগ বৈধ বলা কঠিন। তবে উমরা ও হজপালনের সময় কিছুটা অবকাশ দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অনেক ইসলামি স্কলার।

ইসলামি স্কলারদের অভিমত হলো, রমজান মাসে মাসিক বন্ধ রাখার খুব প্রয়োজন হয় না। কারণ রোজার কাজা আদায় করার অনেক সময় থাকে ও কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। তবে এটা দুঃখজনক যে, কদরের রাত আমরা বছরে একবারই পাই। আর এই সুবর্ণ সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যায় মাসিকের কারণে। এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো, কারো যদি রমজানের শুরুতে হায়েজ আসে তবে যেন সে পিল না খায়। আর যদি শেষ দশ দিনে আসে তবে শর্তগুলো মেনে পিল নিতে পারে।

হায়েজ মানব শরীরের একটি সাধারণ নিয়ম। এটা কোনো রোগ বা আল্লাহর তরফ থেকে আজাব নয়। বরং একটা রহমত। হায়েজের কারণে মেয়েরা মা হয়। এটা দুঃখজনক কিছুই না, বা ইবাদত থেকে আল্লাহ বঞ্চিত করছেন এমন কিছুও না। কেউ যদি পুরো রমাজানেই হায়েজ বন্ধ না রাখেন তবে তারও দুঃখের কিছু নেই। আপনি ওইটুকু নেকি হাসিল করতে পারবেন, যা আপনার তকদিরে লেখা আছে।

গর্ভাবস্থায় রোজা
গর্ভাবস্থাকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। শুরু থেকে ৩-৪ মাস। ৫ থেকে ৭ মাস ও তারপর থেকে একদম প্রসব পর্যন্ত।

ক. প্রথম অবস্থায় মায়েরা অনেক বেশি দূর্বল ও অসুস্থ থাকেন। বমি হয় প্রচুর এবং জ্ঞান হারান ঘন ঘন। এমন অবস্থায় অনেকে রোজা রাখতে পারেন, অনেকে পারেন না। যারা পারছেন না, বেশি দূর্বল হয়ে যাচ্ছেন; তারা পরবর্তীতে কাজা আদায় করবেন। আর যারা রাখছেন, আল্লাহ তাদের মাঝে বরকত দিন।

তবে মনে রাখবেন, অনিচ্ছাকৃত বমি হলে রোজা ভাঙে না। অনেকে রোজা রাখেন, কিন্তু বমি হওয়ার পর মনে করেন রোজা ভেঙে গেছে এবং খাওয়া-দাওয়া করে ফেলেন; এটা ভুল। তবে বমি মুখে আসার পর কেউ যদি তা ইচ্ছাকৃত গিলে ফেলে রোজা ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র কাজা রোজা করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব নয়। কিন্তু অবস্থা যদি এমন হয়, অজান্তেই বমি এসে আবার ভেতরে চলে যায়, তবে রোজা ভাঙবে না।

দ্বিতীয় অবস্থায় মায়েরা মোটামুটি সুস্থ থাকেন। তারা একটু আরাম করে রোজাগুলো রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে পরিবারের বাকি সদস্যদের সাহায্য দরকার। গর্ভবতী মা যেন লম্বা সময় রান্না ঘরে কাজ না করেন, বা বাড়ির অন্য এমন কোনো কাজ না করেন যেন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও খাবারের প্রয়োজন পরে।

সবাই মায়ের প্রতি যত্নশীল হলে ইনশাআল্লাহ রোজা রাখতে সমস্যা হবে না। তবে কেউ যদি এ সময়েও অসুস্থ থাকেন এবং কোনো রোজা রাখতে অপারগ হন, তবে পরে কাজা আদায় করবেন।

তৃতীয় অবস্থাও দ্বিতীয় অবস্থার মতোই। অনেকে এ সময়ে একদম সুস্থ-সবল থাকেন, অনেকে আবার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি হাঁটাচলাও বন্ধ হয়ে যায়, হাত-পা ফুলে যায়। এমতাবস্থায় গর্ভবতী নারী যদি পারেন রোজা রাখতে তবে রাখবেন। আর যদি না পারেন, পরে কাজা করে নেবেন। তবে এ সময় অনেক বেশি করে ইবাদত-বন্দেগি করবেন। চেষ্টা করবেন সব নামাজ সুন্নতসহ আদায় করতে। তারাবি এবং তাহাজ্জুদ আদায় করতে। শুয়ে-বসে, সবসময় জিকির ও কোরআন তেলাওয়াত করতে। গর্ভের সন্তানের জন্য দোয়া করবেন। চেষ্টা করবেন দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে। দাঁড়াতে না পারলে বসে আদায় করবেন। অনেকে তারাবি বা তাহাজ্জুদ বাদ দেন। এটা না করে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে বসে হলেও পুরো নামাজ আদায় করার চেষ্টা করা।

দুধ পান করানো অবস্থায় রোজা রাখা
কেউ যখন রমজানের আগে মা হন অর্থাৎ এমন সন্তানের জনক যে কিনা শুধুই মায়ের দুধ পান করে। তখন ওই মায়ের জন্য কষ্টকর হয় রোজা রাখা। কারণ বাচ্চা দুধ পান করলে মাকেও ঘনঘন খাবার খেতে হয়। আবার মা রোজা রাখলে বাচ্চা দুধ কম পায়। আবার অনেক মায়ের দু’জন দুধের শিশু থাকে। সে ক্ষেত্রে মা রোজা রাখলে মা ও শিশু উভয়েই দূর্বল হয়ে পরে। এমতাবস্থায় সেই মায়ের জন্য অনুমতি আছে রোজা না রাখার। এই অনাদায়ী রোজাগুলো পরবর্তী রমজান আসার আগেই কাজা আদায় করে ফেলবে।

তবে এমন যদি হয়, মা রোজা রাখলে দূর্বল হন না এবং বাচ্চা দুধ পায় পর্যাপ্ত, অথবা বাচ্চা দুধ ছাড়াও অন্য খাবার খায়- সে ক্ষেত্রে মা রোজা রাখবেন।

মাসিক ও প্রসব পরবর্তী স্রাব অবস্থায় ইবাদত
নারীরা রমজান মাসে মাসিক ও প্রসব পরবর্তী স্রাবের কারণে ৩ ধরনের ইবাদত থেকে বঞ্চিত হয়। সেগুলো হলো- নামাজ, রোজা এবং কোরআন তেলাওয়াত।

নামাজ তো আল্লাহতায়ালা মাফ করে দিয়েছেন। রোজা পরবর্তীতে কাজা আদায় করা যাবে। আর কোরআন তেলাওয়াত একটা উত্তম সুন্নত। অনেকেই মন খারাপ করেন ইবাদতগুলো করতে না পারার জন্য। তবে এমন আরও অনেক ইবাদত আছে যা এ সময় নারীরা পালন করতে পারেন।

সেহেরি ও ইফতার বানানোর দায়িত্ব নিয়ে রোজাদারকে ইবাদত করার সুযোগ করে দেওয়া। এই সুযোগ করে দেওয়ার ফলে ইবাদতকারীর নেকির অংশীদার তিনিও হবেন, কিন্তু তার সওয়াব একটুও কমবে না।

সারাক্ষণ ইস্তেগফার, তাহমিদ, তাহলিল, তাকবির ও নানান ফজিলতপূর্ণ জিকির করতে পারেন।

প্রতিবেশীসহ পথেঘাটের গরিব-মিসকিনদের মাঝে ইফতার বিতরণ করতে পারেন।

যারা রোজা অবস্থায় আছেন, তাদের অন্যান্য কাজগুলো করে দিতে পারেন। বেশি বেশি দান-সদকা করবেন।

কোরআনে কারিমের তাফসির পড়বেন, রাসূলের জীবনী পড়বেন, দ্বীনি কিতাব পরে ইলম অর্জন করবেন। তবে কোনো কিতাবে কোরআনের আয়াত থাকলে ওই জায়গাটা স্পর্শ করা যাবে না।

অনেকে নামাজের সময় বা তারাবি-তাহাজ্জুদের সময় ইবাদতের অভ্যাস চালু রাখতে অজু করে জায়নামাজে বসে জিকির করেন ও দোয়া করেন। এতে কোনো সমস্যা নেই, তা করতেই পারেন। তবে এতে অজু করা জরুরি নয়, যেহেতু হায়েজ অবস্থায় অজু হয় না। তাই অজু করা না করার মাঝে কোনো তফাৎ নেই। আর হায়েজ অবস্থায় যদি নাপাকি না লাগে তবে জায়নামাজেও বসতে কোনো সমস্যা নেই।

শেষ দশ দিনের বিজোড় রাত্রিগুলোয় বেশি বেশি দান-সদকার পাশাপাশি বেশি বেশি দোযা ও জিকির করা।

আপনার মতামত লিখুন :

একাধিক জানাজা ও লাশ দাফনে বিলম্ব প্রসঙ্গে ইসলাম

একাধিক জানাজা ও লাশ দাফনে বিলম্ব প্রসঙ্গে ইসলাম
বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাজার নামাজের দৃশ্য, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আমাদের দেশে বিখ্যাত কেউ মারা গেলে তার একাধিক জানাজার নামাজ পড়া হয়। অনেকক্ষেত্রে জানাজার নামাজের সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে মরদেহ দু’তিন পর দাফন করার ঘটনাও ঘটে। অথচ ইসলামে এসব কাজের অনুমতি নেই।

বর্ণিত বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো- কেউ মারা গেল বিলম্ব না করে মৃতদেহের গোসল দেবে, কাফন পরাবে। অতপর জানাজার নামাজ পড়ে দ্রুত দাফন করে দেবে। একাধিক হাদিসে মৃত্যুর পর থেকে দাফন পর্যন্ত সব কাজ দ্রুত করার কথা বলা হয়েছে এবং বিলম্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে।

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত তালহা ইবনে বারা (রা.) অসুস্থ হলে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। অতপর বললেন, আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। অতএব (সে মারা গেলে) এ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। আর তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা কোনো মুসলমানের মৃতদেহকে পরিবারস্থ লোকদের মাঝে আটকে রাখা উচিত নয়।’ -হাদিস: ৩১৫৯

অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তোমরা তাকে আটকে রেখো না। তাকে দ্রুত দাফন করে দিও।’ তাবারানি: ১৩৬১৩

সহিহ বোখারির এক হাদিসে জানাজার নামাজের পর লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব না করার নির্দেশ এসেছে।

বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, মৃত্যুর পর বিলম্ব না করে কাফন, জানাজা দ্রুত সম্পন্ন করে তাড়াতাড়ি দাফন করে দেবে।

এ কারণে ইসলামি স্কলাররা বলেন, মৃতের গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা উত্তম এবং বিনা কারণে বিলম্ব করা মাকরূহ।

তাই স্বাভাবিক সময়ের ভেতরে মৃতের জানাজা-দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেলে মৃতের অভিভাবক উপস্থিত লোকদের নিয়ে জানাজা পড়ে দ্রুত দাফন করে দেবে। এ সময়ের মধ্যে কোনো আত্মীয়-স্বজন বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে তার জন্য বিলম্ব করা সমীচীন নয়।

অবশ্য মৃতের অভিভাবক নিজেই যদি দূরে অবস্থান করার কারণে স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে তার উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে করণীয় হলো- তার অপেক্ষা করতে না বলে দ্রুত দাফন করে দিতে বলা।

কিন্তু অভিভাবক যদি তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে তাহলে তার জন্য বিলম্ব করার অবকাশ রয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রেও এ পরিমাণ বিলম্ব করার অবকাশ নেই, যার কারণে লাশের মধ্যে পরিবর্তন হওয়ার আশংকা হয়। এত অধিক সময় বিলম্ব করা জায়েজ নয়।

আর দাফনে দীর্ঘ বিলম্বের উদ্দেশ্যে লাশের পরিবর্তন ও বিকৃতিরোধে লাশকে হিমাগারে রাখা কিংবা ঔষধ দিয়ে রাখা জায়েয নয়। বরং লাশের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার পূর্বে দাফন করে দেওয়া জরুরি। এর অধিক বিলম্ব করা গোনাহ।

ইসলামি স্কলারদের অভিমত হরো- মৃতদেহকে হিমাগারে রাখা কিংবা মেডিসিন ইত্যাদি দিয়ে রাখা সম্মানপরিপন্থী ও কষ্টদায়ক। অথচ মৃত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। হাদিসে আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, কোনো মুমিন ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর পর কষ্ট দেওয়া তেমনই যেমন জীবিত অবস্থায় তাকে কষ্ট দেওয়া। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১৯৯০
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563205495520.jpg

এ সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, জীবিত ব্যক্তি যে সব বস্তু দ্বারা আরামবোধ করে মৃত ব্যক্তি তা দ্বারা আরামবোধ করে। ইবনুল মালেক (রহ.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তি কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা কষ্ট পায়। -মিরকাতুল মাফাতিহ: ৪/১৭০

তাই মৃতকে হিমাগারে রাখা মূলত তাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর। এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

অনুরূপ লাশ জানাজা ও দাফনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রথা পালনের জন্য স্থানে স্থানে প্রদর্শন করা, পুষ্পস্তবক অর্পণ করা, ভিডিও করা, শোকের আবহে করুণ সুর বাজানো, লাশকে সামনে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে জীবনালোচনা করা গর্হিত কাজ। এগুলোর মধ্যে জীবিত মৃত কারোরই কোনো কল্যাণ নেই।

জানাজার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত। নবী করিম (সা.) আদেশ করেছেন, ‘তোমরা সবার জানাজার নামাজ আদায় করো। মৃত ব্যক্তি ভালো হোক আর মন্দ হোক।’

নবী করিম (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে। ওই সব অধিকারের পঞ্চমটি হলো- সে মারা গেলে তার জানাজার নামাজ আদায় করা।’

যেহেতু পৃথিবীর সব মুসলমানের জন্য প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জানাজার নামাজ আদায় করা সম্ভব নয়, সেহেতু এটা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ কিছু মানুষ আদায় করলে সবার ওপর থেকে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। আর এ কথা আমরা সবাই জানি যে, কোনো নির্দিষ্ট ফরজ আমল একাধিকবার করা যায় না। নফল বারবার করা যায়।

আর মৃতের একাধিক জানাজা পড়া জায়েজ নয়। মৃতের অভিভাবক কিংবা তার অনুমতি সাপেক্ষে জানাজার নামাজ আদায় হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার ওই মৃতের জানাজা পড়ার অবকাশ নেই। সাহাবারা কোনো মৃতের একাধিক জানাজা পড়া থেকে বিরত থাকতেন।

ইসলামি স্কলারহণ, জুমার দিনের শুরুতে জানাজা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর শুধু অধিক সংখ্যক মুসল্লি নিয়ে জানাজা পড়ার উদ্দেশ্যে জুমা পর্যন্ত বিলম্ব করাকেও মাকরূহ বলেছেন।

ইসলামি শরিয়ত মৃতের অভিভাবককে নামাজে জানাজার অগ্রাধিকার প্রদান করেছে, সেহেতু তার অসম্মতিতে কিংবা তার অগোচরে নামাজে জানাজা পড়া হলে শরিয়ত প্রদত্ত অভিভাবকের এ অগ্রাধিকার ক্ষুন্ন হয়। সেক্ষেত্রে অভিভাবকের অধিকার অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইসলাম অভিভাবককে বিশেষ অনুমতি প্রদান করেছে, সে পুনরায় নতুন কিছু মানুষ নিয়ে নামাজে জানাজা আদায় করতে পারবে।

ইসলাম মতে মৃতের অভিভাবকের সম্মতিতে নামাজে জানাজা মাত্র একবার হবে। যারা কোনো কারণে নামাজে জানাজার জামাতে অংশ নিতে পারবে না- তারা মৃতের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে।

উল্লেখ্য, মৃতের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে পারাটাই জীবিতদের একমাত্র কর্তব্য নয়। বরং দাফনের পরও মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের অনেক করণীয় রয়েছে। যেমন, মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা ও শরিয়ত মোতাবেক ইসালে সওয়াব করা ইত্যাদি।

ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো- কোনো ব্যক্তি যে এলাকায় মারা যাবে তাকে সেখানের কবরস্থানে বা নিকটের কোনো কবরস্থানে দাফন করে দেবে। প্রয়োজন ব্যতিত দূরবর্তী এলাকায় লাশ নিয়ে দাফন করা অনুত্তম।

পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের নির্দেশনা

পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের নির্দেশনা
গরুর খামার, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কোরবানির পশু মোটাতাজা করার প্রক্রিয়া। অনেকে প্রাকৃতিকভাবে পশু মোটাতাজাকরণের পদ্ধতি অনুসরণ করলেও অসাধু কিছু খামারি নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব পশুর গোশত মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একশ্রেণির লোভী মানুষের কাছে জনস্বাস্থ্য কীভাবে জিম্মি হয়ে পড়ছে পশু মোটাজাতাকরণে ক্ষতিকর হরমোনের ব্যবহার তারই প্রমাণ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, স্টেরয়েড দ্বারা মোটাতাজাকৃত পশুর গোশত খেলে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ধমনি বিকল হয়ে হৃদরোগ এমনকি ব্রেনস্ট্রোকও হতে পারে। এ ধরনের পশুর গোশত খেলে কিডনি ও লিভার বিকলসহ পঙ্গুত্বের আশঙ্কাও থাকে।

এমনিতে জনমনে ভুল ধারণা রয়েছে, কোরবানির গোশত বেশি খেলে তাতে কোনো ক্ষতি হয় না। এ ভুল ধারণার কারণে কোরবানির ঈদের সময় হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে।

কোরবানির পশু বিশেষ করে গরু কেনার সময় ক্রেতারা সতর্ক থাকলে অবশ্য এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরুর পাঁজরের হাড় দেখা যায় এবং দুই হাড়ের মধ্যে একটা ঢেউয়ের ভাব থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর মাংসল স্থানে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে অনেক দেবে যায় যা স্বাভাবিক গরুর ক্ষেত্রে হয় না।

উচ্চ আদালত হরমোন প্রয়োগে গরু মোটাতাজাকরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলায় অবৈধভাবে পশু মোটাতাজাকরণ বন্ধ হয়নি।

আমরা আশা করব, জনস্বার্থে এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন সবকিছুই করবে এবং এটিকে তাদের নৈতিক কর্তব্য হিসেবে ভাববে।

দেখুন, কোরবানি শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- কোনো কিছু উৎসর্গ করা কিংবা বিসর্জন দেওয়া। যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। আল্লাহতায়ালার ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ কোরবানি করে। কোরবানি একটি পবিত্র ও কল্যাণময় ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।

কোরবানির পশুর রক্ত-গোশত কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহর কাছে বান্দার তাকওয়া (মনের কথা, ইচ্ছা) পৌঁছে। আল্লাহতায়ালা প্রত্যেকটি ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে বান্দার তাকওয়া দেখে থাকেন। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে তাদের রক্ত কিংবা গোশত কিছুই পৌঁছে না; বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে।’ -সূরা হজ: ৩৭

এমতাবস্থায় কোরবানির সময় জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিতায়ক পশু বাজারজাত করা নিশ্চয়ই অমানবিক বিষয়। সেই সঙ্গে কোরবানির পশুকে নানাভাবে কষ্ট দেওয়াও অনুচিত। আমরা আশা করবো, খামারিরা বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে ভেবে দেখে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে কিছু (লোক) আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহতায়ালা ও আখেরাতের ওপর ঈমান এনেছি, কিন্তু তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহতায়ালা ও তার বান্দাদের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে, যদিও তাদের অন্য কাউকে নয়, নিজেদেরই ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে, যদিও তাদের কোনো প্রকারের চৈতন্য নেই।’ -সূরা বাকারা: ৮-৯

যারা কৃত্রিম উপায়ে কোরবানির পশু মোটাতাজা করে, তারা সবাই কিয়ামতের মাঠে ধোঁকাদানকারী অর্থাৎ শয়তানের দলভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। যে ব্যক্তি অপর একজনকে ধোঁকা দিলো সে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করল। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের জন্য আল্লাহ কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে, আর শয়তান যা প্রতিশ্রুতি দেয় তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এরাই হচ্ছে সেসব ব্যক্তি; যাদের আবাস্থল হচ্ছে দোজখ, যার থেকে মুক্তির কোনো পন্থাই তারা পাবে না।’ -সূরা আন নিসা: ১২০-১২১

কোরবানির পশু মোটাতাজা করার ক্ষেত্রে পশুর প্রতি অবশ্যই সদাচারণ করতে হবে। পশুর যেন কোনোরূপ কষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহতায়ালার পরিবার সদৃশ; সুতরাং সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক প্রিয়, যে আল্লাহর পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ প্রদর্শন করে।’ -মেশকাত: ৪৭৮১

হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা পশুর মুখমণ্ডলে আঘাত করো না এবং পশুর গায়ে দাগ দিও না।’ - মেশকাত: ৩৯০০

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘জমিনের বুকে বিচরণশীল যেকোনো জন্তু কিংবা বাতাসের বুকে নিজ ডানা দু’টি দিয়ে উড়ে চলা যে কোনো পাখিই- এগুলো তোমাদের মতোই।’ -সূরা আনআম: ৩৮

সুতরাং যারা কোরবানির পশু লালন-পালন করে থাকেন এবং যারা কোরবানি আদায় করবেন উভয়কেই কোরবানির পশুর প্রতি সদাচারণ করতে হবে। এর অন্যথ্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র