Alexa

কোরবানির প্রয়োজনীয় কিছু মাসয়ালা

কোরবানির প্রয়োজনীয় কিছু মাসয়ালা

গাবতলীর বিখ্যাত কোরবানির পশুর হাট, ছবি: সুমন শেখ, বার্তা২৪.কম

ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি আদায় করে না তার ব্যাপারে হাদিস শরীফে কঠিন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ -মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৩৫১৯

ইবাদতের মূলকথা হলো- আল্লাহতায়ালার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দু’টি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। ১. ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা পালন করা ও ২. ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা মোতাবেক সহিহ-শুদ্ধভাবে বিধি মোতাবেক তা সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কোরবানির কিছু প্রয়োজনীয় মাসয়ালা উল্লেখ হলো।

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব: প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। আর নেসাব হলো- স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। -আল মুহিতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ: কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১২

কোরবানির সময়: মোট তিনদিন কোরবানি করা যায়। জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে জিলহজের ১০ তারিখেই কোরবানি করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক: ১৮৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/২৯৫

নাবালেগের কোরবানি: নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কোরবানি করলে তা সহিহ হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৬

নাবালেগের পক্ষ থেকে কোরবানি: নাবালেগের পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া অভিভাবকের ওপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব। -রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১৫, ফাতাওয়া কাজিখান: ৩/৩৪৫

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/19/1534663762617.jpg
চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা, ছবি: সুমন শেখ, বার্তা২৪.কম

মুসাফিরের জন্য কোরবানি: যে ব্যক্তি কোরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাজিখান: আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৫

দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানির হুকুম: দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়, কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯২

কোরবানি করতে না পারলে: কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানি দিতে না পারে তাহলে কোরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে তার ওপর কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করার পরও কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া সম্ভব না হয়; তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দেবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাজিখান: ৩/৩৪৫

প্রথম দিন কখন থেকে কোরবানি করা যাবে: যেসব এলাকার লোকদের ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো সমস্যা থাকার কারণে যদি প্রথম দিন ঈদের নামাজ না হয় তাহলে ঈদের নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কোরবানি করা জায়েয। -সহিহ বোখারি: ২/৮৩২, কাজিখান: ৩/৩৪৪

রাতে কোরবানি করা: ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কোরবানি করা জায়েয। তবে দিনে কোরবানি করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ: ১৪৯২৭, মাজমাউয যাওয়াইদ: ৪/২২

কোরবানির উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর জবাই করলে: কোরবানির দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশু সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩২০-৩২১

কোন কোন পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ- বন্যগরু, গয়াল ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা জায়েয নয়। -কাজিখান: ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৫

নর ও মাদী পশুর কোরবানি: যেসব পশু কোরবানি করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদী দু’টোই কোরবানি করা যায়। -কাজিখান: ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৫

কোরবানির পশুর বয়সসীমা: উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয়; তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।

উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েয হবে না। -কাজিখান: ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৫-২০৬

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/19/1534663871538.jpg

চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা, ছবি: সুমন শেখ, বার্তা২৪.কম

এক পশুতে শরিকের সংখ্যা: একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কোরবানি দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কোরবানি করলে কারোটাই সহিহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে। সাতের অধিক শরিক হলে কারো কোরবানি সহিহ হবে না। -সহিহ মুসলিম: ১৩১৮, কাজিখান: ৩/৩৪৯

সাত শরিকের কোরবানি: সাতজনে মিলে কোরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কোরবানিই সহিহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৭

মাসয়ালা: উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কোরবানি করা জায়েয। -সহিহ মুসলিম: ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৭

কোনো অংশীদারের নিয়ত গলদ হলে: যদি কেউ আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করে তাহলে তার কোরবানি সহিহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরিকদের কারো কোরবানি হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শরিক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৮, কাজিখান: ৩/৩৪৯

কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ: কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হতে পারবে। এতে কোরবানি ও আকিকা দু’টোই শুদ্ধ হবে। -তাহতাবি আলাদ্দুর: ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬২

মাসয়ালা: শরিকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কোরবানি সহিহ হবে না।

মাসয়ালা: যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরিক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কোরবানি করাই শ্রেয়। শরিক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরিব হয়, যার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরিক করতে পারবে না। এমন গরিব ব্যক্তি যদি কাউকে শরিক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিবে। -কাজিখান: ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২১০

কোরবানির গোশত জমিয়ে রাখা: কোরবানির গোশত তিনদিনের অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৪

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/19/1534663956837.jpg

চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা, ছবি: সুমন শেখ, বার্তা২৪.কম

কোরবানির গোশত বণ্টন: শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়। -আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৭, কাজিখান: ৩/৩৫১

মাসয়ালা: কোরবানির গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৪, ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/৩০০

গোশত, চর্বি বিক্রি করা: কোরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান: ১৭/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৫

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া: জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয নয়। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারি দেওয়া যাবে।

জবাইয়ের অস্ত্র: ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৩

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা: জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৩

অন্য পশুর সামনে জবাই করা: এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।

কোরবানির গোশত বিধর্মীকে দেওয়া: কোরবানির গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয। -ইলাউস সুনান: ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০

অন্য কারো ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে চাইলে: অন্যের ওয়াজিব কোরবানি দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কোরবানি আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করে তাহলে তাদের কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

কোরবানির পশু চুরি হয়ে গেলে বা মারা গেলে: কোরবানির পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মারা যায় আর কোরবানিদাতার ওপর পূর্ব থেকে কোরবানি ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কোরবানি করতে হবে। গরিব হলে (যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কোরবানি করা ওয়াজিব নয়। -বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ৪/৩১৯

ইসলাম এর আরও খবর