রোহিঙ্গা সংকটের এক বছর

মুহিববুল্লাহ মুহিব, ডিস্ট্রিক করেসপন্ডেন্ট
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

কক্সবাজার: সোনামত মিয়া। একবছর আগেও রাখাইনের মংডুর বাসিন্দা ছিল সোনামত। মিয়ানমার সেনার নির্মমতায় সন্তান, দুই ভাইকে হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলাদেশে। নানা ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে সোনামত এখন ভালো আছে। তবে ভিটায় ফেরার স্বপ্ন ও সন্তান-স্বজন হারানোর বেদনা প্রতিনিয়ত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।   

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। দিনটার কথা মনে পড়লে আজও চমকে ওঠে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া লাখো সোনামত মিয়া। ওইদিন মিয়ানমারের সেনা চৌকিতে হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের ওপর শুরু হয় পাশবিক নির্যাতন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে’র আকাশে উড়ে আগুনের কালো ধোয়া। সেই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল বাংলাদেশের উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত দিয়েও। এরপর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশের আকুতি।

ঘোষণা আসলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার; মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার। সেই নির্দেশ সীমান্ত এলাকায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা জনস্রোত সীমান্ত পাড়ি দিলো উখিয়া-টেকনাফে। নৌ পথে বাংলাদেশে আসতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে মারা যায় প্রায় ৩ শতাধিক নারী-পুরুষ ও রোহিঙ্গা শিশু। লাশের মিছিল শুরু হয় নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ উপকূলে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/25/1535139586445.gif

কেউ এসেছে গুলিবিদ্ধ কেউ এসেছে ধর্ষিত হয়ে। নির্মম নির্যাতনের শিকার অনেক রোহিঙ্গাকে দেখে হতবাক হয়েছেন স্থানীয়রা। বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবিকতার হাত। নিজেদের ভাত খাইয়েছেন রোহিঙ্গাদের। এমন কি নিজেদের থাকার ঘরেও ভাগাভাগি করে থেকেছেন স্থানীয়রা। যা প্রশংসার পাশপাশি বাংলাদেশের মানুষের উদারতার পরিচয়ও ছিল।

 

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বড় বড় এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসে রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন ক্যাম্প তৈরি করে। উখিয়া-টেকনাফের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর ভুমিতে ৩০ টি ক্যাম্পে ভাগ হয়ে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। বাংলাদেশ সরকার দিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা। যা বাংলাদেশকে প্রশংসিত করেছে বিশ্ব দরবারে।

শনিবার (২৫ আগস্ট) চলমান রোহিঙ্গা সংকটের এক বছর পুর্ণ হয়েছে। এক বছর পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে বিশ্ব প্রতিনিধিদের দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়। চাপের এক পর্যায়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মতি দেয়। সম্প্রতি মিয়ানমার সফরে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী। এ সফরে তিনি রাখাইনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন এবং রোহিঙ্গাদের ফিরে য্ওায়ার বিষয়ে দু‘দেশের মধ্যে আলোচনা করেন।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিবির পরির্শনকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হবে। তবে রোহিঙ্গারা এক বছর পর্যন্ত বাংলাদেশে ভালো রয়েছে। গত বছর তারা ঈদে কোন ধরনের আনন্দ করতে পারেনি। এবারের ঈদে তারা খুব খুশিতে আনন্দ করছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2018/Aug/25/1535139692867.gif

এদিকে ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম আজাদ বার্তা ২৪.কমকে বলেন, সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন। এতে বেশকিছু সিদ্ধান্তে পৌছেছে দুই দেশ। তাই আমরা দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারবো বলে আশাবাদী।

প্রসঙ্গত  যে, ১৯৮০ দশকে নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করে মিয়ানমারের জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার কেড়ে নেয়। গত বছরের অক্টোবরের শুরুর দিকে ধাপে ধাপে সামরিক প্রচারণা চালিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের রোহিঙ্গাবিদ্বেষী করে তোলা হয়। এরপর ৯ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের উপর সেনা ও স্থানীয় মগদের নির্যাতন শুরু হয়। ওই দিন থেকে কয়েক দফায় বাংলাদেশে এসেছিল রোহিঙ্গারা। এরআগেও ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে  যারা বাংলাদেশে আসে তাদের কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়ায় দুইটি ক্যাম্প রাখা হয়। সেখানে তারা  এ পর্যন্ত ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আবারও নিপিড়নেরমুখে বাংলাদেশে আসতে হয় রোহিঙ্গাদের। কিন্তু এবার প্রায় ৭ লাখের বেশী। নতুন পুরাতন মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংখ্যা এখন প্রায় ১২ লাখ।

আপনার মতামত লিখুন :