Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

ফ্রি’তে বেড়াতে চাইলে ঘুরে আসুন লুক্সেমবার্গে!

ফ্রি’তে বেড়াতে চাইলে ঘুরে আসুন লুক্সেমবার্গে!
লুক্সেমবার্গের একটি শহর, ছবি: বার্তা২৪
কাওসার আহমেদ


  • Font increase
  • Font Decrease

লুক্সেমবার্গ, লুক্সেমবার্গ সিটি থেকে: পশ্চিম ইউরোপের ছোট দেশ লুক্সেমবার্গ। দেশটির মোট জনসংখ্যা মাত্র ৬ লাখ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে ল্যান্ডলকড লুক্সেমবার্গ ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ। যার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশগুলোর মধ্যে লুক্সেমবার্গ অন্যতম একটি। দেশটির টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, লুক্সেমবার্গটিতে প্রতি ১ হাজার জন মানুষের মধ্যে ৬৬২ টি গাড়ি রয়েছে এবং প্রত্যেকেই নিজে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে থাকেন। (সূত্রঃআন্দ্রেয়া লো,সিএনএন,১৫ জানুয়ারি-২০১৯)।

যার জন্য রাজধানী লুক্সেমবার্গ সিটিতে যানজট খুব প্রকট আকার ধারণ করেছে। লক্ষাধিক মানুষের এই শহরে প্রতিদিন কাজের জন্য আসেন আরও প্রায় চার লাখ  মানুষ। এছাড়া প্রায় দুই লাখ মানুষ সীমান্ত পার হয়ে পার্শ্ববর্তী ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানিতে যায় প্রতিদিন। ২০১৬ সালের একটি গবেষণা অনুসারে, এই বছরে লুক্সেমবার্গের চালকরা গড়ে ৩৩ ঘণ্টা যানজটের শিকার হয়। এর ফলে তৈরি হয় প্রচণ্ড যানজট।

পহেলা আগস্ট ২০১৮ থেকে ২০ বছরের কম বয়সী সকল নাগরিক, হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রী এবং ৩০ বছরের নিচের দেশি-বিদেশি সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য যাতায়াত ফ্রি করে দিয়েছিল লুক্সেমবার্গ সরকার।

ট্র্যাফিক জ্যামে অতিষ্ঠ হয়ে দেশটির সরকার এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ট্রেন, ট্রাম ও বাসে চড়লে কাউকে কোনও ভাড়া দিতে হবে না। (সূত্রঃআন্দ্রেয়া লো,সিএনএন,১৫ জানুয়ারি-২০১৯)।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Mar/03/1551581455091.jpg

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সব গণপরিবহনের ভাড়া মওকুফ করে দিচ্ছে লুক্সেমবার্গের সরকার। এরকম সুবিধা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

লুক্সেমবার্গের চলাচল ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানি ফ্যাঙ্ক বলেছেন, ‘আমরা আশা করছি এই পদক্ষেপের কারণে রাস্তায় জ্যাম কমবে এবং পরিবেশগত সুবিধাও পাওয়া যাবে।’

মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির গণ পরিবহন ব্যবস্থা পুরো দেশজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রতি বছর এজন্য ৫৬২ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। তবে টিকেট বিক্রি করে প্রতি বছর আয় হয় ৪৬ মিলিয়ন ডলার।

ফ্রাঙ্ক বলেন, ‘সরকার এখন এই খাতে ভাড়া বিনামূল্যে করতে চাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের বর্তমান আর্থিক অবস্থা খুব ভালো অবস্থানে আছে। আমরা চাই জনগণ এই সচ্ছল অর্থনীতির সুফল পাক।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Mar/03/1551581470119.jpg

নগর উন্নয়ন বিশ্লেষকদের ধারণা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফ্রি করা হলে যানজট অনেকাংশেই হ্রাস পাবে সেই সাথে প্রচুর পরিমাণে পর্যটক বেড়ে যাবে দেশটিতে। যার ফলে সরকার সেই ব্যয় তুলে নিতে সক্ষম হবে বলে তাঁদের ধারণা।

আপনার মতামত লিখুন :

বৌদ্ধ আর হিন্দু দেবতাদের নিষিদ্ধ মিশ্রণ

বৌদ্ধ আর হিন্দু দেবতাদের নিষিদ্ধ মিশ্রণ
সালা কাও খু: ভাস্কর্যের বাগান

থাইল্যান্ডের উত্তরের ছোট প্রাদেশিক শহর নং খাই। প্রতিবেশী দেশ লাওসের সঙ্গে সীমান্ত এই শহরের। যাদের ভাগ করেছে মেকং নদী।

শনিবার সকালে ঘুম ভাঙলো দেরিতে। লাওস থেকে আমাদের বন্ধু পাতিতিন এসেছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। নদীর ওপারেই লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন। নিজের সাইকেল নিয়েই চলে এসেছে এখানে৷ নং খাই কানালায়ায়েউই ওয়াক্লেহংয়ের চেয়েও ভালো চেনেন পাতিতিন। ও হ্যা, পাতিতিনের ডাক নাম কং আর কানালায়ায়েউইয়ের ডাক নাম পে।

আগের সন্ধ্যায় মেকংয়ের তীরের সান্ধ্যকালীন বাজার দেখা হয়েছে আর নদী তীরে রাতভর আড্ডা। তাই শনিবারে ঠিক করলাম সাইক্লিং করব আর দেখতে যাবো সালা কাও খু।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121703721.jpg
এই শহর খুব ছিমছাম। মানুষের তুলনায় প্যাগোডার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। আর ড্রাগনের যে প্রভাব রয়েছে, সেটা রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে শুরু করে যেকোন স্থাপনার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। প্রায় ৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পৌছালাম সালা কাও খু'তে। সূর্য যেন আজ সকাল থেকেই আগুন ঢেলে যাচ্ছে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল বুদ্ধের দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ মূর্তি৷ আর সাপের সাতটি ফনা৷

সালা কাও খু'তে ঢুকতে গুণতে হলো ১০০ টাকার টিকিট। এরপর যেন অভিভূত হওয়ার পালা৷ এখানকার ভাস্কর্যগুলো রহস্য ছড়ানো। কারণ এর নির্মাণেই যেন ছড়িয়ে আছে রহস্য। এই সালা কাও খু নির্মাণে সময় লেগেছে ২০ বছরের বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রহস্যে ঘেরা এক সাধু লুয়াং পু বৌন লিউয়া সৌরিরাত এই ভাস্কর্যের বাগান নির্মাণ করেছিলেন গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে৷ ১৯৯৬ সালে পরলোকগমন করেন লুয়াং পু। কিন্তু তার সাধনায় নির্মিত বুদ্ধ, শিব, ভিষ্ণু এবং আরো দেব-দেবীর মূর্তিগুলো যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি চোখে পড়ার মতও।

শুধু হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম নয়, লু পাং অন্যান্য ধর্ম-সংস্কৃতি থেকেও নিয়েছেন উপাদান। যেমন তার শবদেহ চিতায় না দিয়ে তার ইচ্ছেনুযায়ী কবর দিয়ে মাজার বানানো হয়েছে। আর এই মাজারের গঠন একেবারেই প্যাগোডার সঙ্গে যায় না।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121727097.jpg
এই লুয়াং পু এবং কাও খু নিয়ে বেশ জ্ঞান রয়েছে কংয়ের। সে বললো, লুয়াং পু নিজের জীবনিতে বলেছেন, তিনি শৈশবে একটি গর্তে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। যেখানে তার সঙ্গে কাও খু নামে একজন সন্নাসী ভূ-গর্ভের এক রহস্যময় জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকেও একজন পুরোহিতে রূপান্তরিত করেন। পরে ভিয়েতনামে এক যোগীর কাছে হিন্দু ধর্মের দীক্ষাও নেন তিনি। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের মিশ্রণ করে নতুন এক মৌলিক ধর্মীয় ধারণার উদ্ভব ঘটান লুয়াং পু। মেকং নদীর তীরের আশপাশে তার অনুসারি বাড়তে থাকে হু হু করে। এমনকি এই কাও খু’র ভাস্কর্যের বাগান প্রকল্পও করার কথা ছিল লাওসে। তবে ১৯৭৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি লাওস নিয়ন্ত্রণে নিলে সেখান থেকে সরে থাইল্যান্ডের নং খাইতে চলে আসেন তিনি।

এখানে ভাস্কর্যগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটলে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় আবেশ পাওয়া যাবে না। বরং কিছুটা অদ্ভুত আর রহস্যঘেরা যেন সব কিছু। এখানে প্রথমে ঢুকলেই একজন সর্পদেবী রয়েছেন। তার পেছনেই এক ঝাঁক কুকুরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাতি। ভাস্কর্যগুলো নিখুঁত৷ গড়নে রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া৷

এখানে আরেকটি বড় ভাস্কর্য আমাদের মতো অনেককেই ভাবাচ্ছে। একটি কুকুর মাঝখানে। তার পেছনে একটি সাপ ফনা তুলে রয়েছে। আর অপর পার্শ্বে ধনুক হাতে তরুণ। এই ভাস্কর্যে তিনটি চরিত্র কে কাকে রক্ষা করছে বা মারতে চাচ্ছে সেটি বোঝার উপায় নেই। থাই ভাষায় লেখা রয়েছে বর্ণনা। পে সেটি পড়ে আমাদের জানালো, এটাই হচ্ছে দৃস্টিভঙ্গি। আসলে তুমি যেটা বিশ্বাস করতে চাও সেটাই দেখতে পাবে৷
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121750262.jpg
এখানে দুটি মাঝারি ধরনের পুকুর রয়েছে। পুকুরে মাগুর মাছের ঝাঁক। দেখে মনে হয় এক-একটি মাছের ওজন ৫ থেকে ১০ কেজির কম হবে না। দর্শনার্থীরা অনেকেই পাউরুটি ছুড়ে দিচ্ছেন আর এক গালেই পুরে নিচ্ছে মাছগুলো। এই মাছ এবং এখানকার কবুতরগুলোকেও পবিত্র আর রহস্যঘেরা বলে বিশ্বাস করেন অনুসারীরা।

সেখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমরা হেঁটে হেঁটে ভাস্কর্যগুলোর রহস্য উন্মোচনের ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। এখানে সবচেয়ে উঁচু ভাস্করর্যটি ২৫ মিটার। যেটাতে একটি কালসাপের বুক বরাবর বসে আছেন বুদ্ধ আর সাপটির মাথা ৭টি।

এখানকার ভাস্কর্য আর মূর্তিগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, সাপ ভালোবাসতেন লুয়াং পু। কং বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যত সময় সাপের। সাপের কোন হাত পা নেই পৃথিবী ধ্বংস করার মতো। তাই এটি এক পবিত্র প্রাণী। তিনি নিজেকেও অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক সাপ বলে ভাবতেন।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121778711.jpg
লুয়াং পু'র অনুসারীরা এই ভাস্কর্যের বাগানটি তৈরি করেছেন তার সন্ন্যাসী কাও খু'র স্মরণে। লুয়াং পু তার জীবনীতে বলেছেন, তার অনুসারীরা কেউ ভাস্কর নয়, তবে সবাই হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে এই ভাস্কর্যগুলো বানিয়েছেন৷

১৯৯৬ সালে লুয়াং পু'র মৃত্যু হলে তার অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু পরের বছরই লুয়াং পু'র এই সর্পকেন্দ্রিক দেবতা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করে নং খাইয়ের স্থানীয় সরকার।

এখানে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই যেন হিম হয়ে আসে শরীর। মনে হয় যেন কোন অশরীরি আত্মা ঘোরাফেরা করছে৷ লুয়াং পু'র সাপের ভাস্কর্যগুলো কেমন যেন রহস্যময় হাসি দিয়ে রেখেছে।

দুপুরের রোদে আমাদের যেন কাহিল দশা। মেকংয়ের তীর ধরে হোটেলে ফিরতে আবার ৫ কিলোমিটার সাইক্লিংয়ের কথা ভাবতেই লুয়াং পু'র রহস্য মাথা থেকে উবে গেল!

নিকলী হাওর নৌভ্রমণ

নিকলী হাওর নৌভ্রমণ
নিকলী হাওরের মাঝ থেকে দূরনদীতে নৌকা চলাচল

নাস্তা সেরে ইকো রিসোর্ট থেকে আমাদের বের হওয়ার কথা সকাল আটটায়। আগেভাগেই উঠে পড়লাম। কারণ আজ হাওর দর্শনে যাওয়ার কথা। হাওর এক দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। নদীবাহিত বিস্তীর্ণ চরাচর ভরবর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফুলফেঁপে এক অপরূপ রূপ ধারণ করে। যাদের সমুদ্র দেখার ফুরসত মেলেনি, তাদের জন্য হাওরে যাওয়া এক আকর্ষণ। আমাদের ভ্রমণদলের সবাই সমুদ্রদর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করলেও হাওর দেখেনি। আমাদের কাছেও হাওরের আকর্ষণ কম নয়। কিন্তু, একি! জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি গাছগাছালির ওপর বৃষ্টি পড়ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে দিগন্তবিস্তৃত মাঠে যতদূর চোখ যায়, টিপটিপ বৃষ্টির ধোঁয়াশা। বাতাসও আছে। আজ হাওরে নৌভ্রমণ হবে কিনা তা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যেই নিচে নেমে নাস্তা সেরে নিলাম। ভ্রমণ তালিকা থেকে হাওরে নৌকায় ঘোরাঘুরি যদি বাদ হয়, তাহলে ঢিলেঢালাভাবে বের হলেও ক্ষতি নেই। তবে সবাই অনড়—হাওরে নামা হোক বা না হোক অবশ্যই যেতে নিকলীর হাওরপাড়ে। নয়টায় সবাইকে নিয়ে আমাদের রিজার্ভ মাইক্রোবাসের ড্রাইভার কটিয়াদী-কিশোরগঞ্জ সড়কে উঠে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।

হাওর ও গ্রামপর্যটন বিস্তারে জালালপুর ইকো রিসোর্ট

সময় এলো গুগল চাচার সহায়তা নেওয়ার। এই এক আশ্চর্য পদ্ধতি, যাকে বারবার জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হয় নিজের হদিস—আমি এখন পৃথিবী নামের এই গ্রহটির ঠিক কোন জায়গায় আছি, গন্তব্যেই বা যাব কিভাবে? গুগল কটিয়াদী থেকে নিকলী যাওয়ার দুটি অপশন দেখাল। একটিতে পৌনে একঘণ্টা, আরেকটিতে একঘণ্টা। কোন রাস্তার অবস্থা ভালো তা কিন্তু গুগল দেখাতে পারল না, রাস্তায় জট আছে কিনা তা ভালোই দেখাল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সড়ক ধরে কিশোরগঞ্জের দিকে এগিয়ে কালিয়াচাপড়া চিনিকল পার হয়ে ডানের পথ ধরব। এই বৃষ্টি বাদলার মধ্যে গ্রামের সরু রাস্তায় বড় গাড়ি ঢোকানো ঠিক হবে না।

কটিয়াদি-কিশোরগঞ্জ সড়কের পুলের ঘাট থেকে ডান দিকে নিকলীর রাস্তা। এই সড়ক গচিয়াহাটা হয়ে চলে গেছে নিকলী। যাওয়ার পথে বনগ্রাম ও গচিয়াহাটায় মাছের পোনার বাজার দেখে উল্লসিত হলাম। গাড়ি ছুটে চলল নিকলী। এরই মধ্যে একটি দৈনিকে কর্মরত এক সিনিয়র সাংবাদিক, আমার সাবেক সহকর্মীর ফোন। ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর কাছে খবর পৌঁছেছে আমরা নিকলীতে হাওর ভ্রমণে যাচ্ছি। অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ফোনে বলল, ‘ভাই, নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমার স্ত্রী। কোনো সমস্যা হলে ফোন দিয়েন’। জিজ্ঞেস করলাম, নিকলী হাওর ভ্রমণে প্রশাসনের সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন আছে কিনা। জবাব এলো, ‘তা নেই, তবে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সহায়তা যদি লাগে’। নম্বরগুলো টুকে রেখে দিলাম।

আঁকাবাঁকা রাস্তা গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলে গেছে। নিকলী পৌঁছার বেশ কয়েক কিলোমিটার আগে থেকেই হাওরের আমেজ চোখ জুড়িয়ে দিল। রাস্তার দু’পাশেই জলরাশির দিগন্তবিস্তার। পানির মধ্যে ছোপ ছোপ গ্রাম। আমরা বিশাল জলরাশি দেখে বারবারই উল্লসিত হয়ে পড়ছি ‘নিকলী হাওরে এসে গেছি, এসে গেছি’ বলে। গাইড ডালিয়া হোসেন অভিজ্ঞ। আমাদের শান্ত করছেন নিকলী আরো সামনে। রাস্তার দু’পাশের জলরাশির সঙ্গে মিতালী করতে করতেই একসময় একটি বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করল। বাঁয়ে সমতল আর ডানে তুমুল জলরাশি। কিছুক্ষণ পর নিকলী হাসপাতালসহ নানা স্থাপনার সাইনবোর্ড দৃষ্টিগোচর হলো। বাঁধের নিচে হাওরের পানিতে গ্রামের মেয়েরা সারবেঁধে পাটের আঁশ ছড়াতে বসেছে। পুরুষরা হাওরে মাছ ধরে তীরে এসে নৌকা ভিড়িয়েছে। আমরা একই পথে হাসপাতাল মোড়ের দোকানপাট-হোটেল পেরিয়ে বাঁধের মাথায় পৌঁছালাম। সারি সারি পর্যটন নৌকা বাঁধা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920693628.jpg
পর্যটকদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্যুরিস্ট বোট

 

হাওরের ঘাটে গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের সবার চক্ষু ছানাবড়া। সামনে দিগন্তছোঁয়া পানি। বিশাল জলরাশির মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ গ্রাম চোখে পড়ে। দূরে আষাঢ়ের মেঘের পেছনে নীল আকাশ পানির সঙ্গে মিতালী করেছে। নিরন্তর বাতাস বইছে। হাওরের পানি ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস প্রাণমন জুড়িয়ে দেয়। বাতাসের তোড় খুব বেশি নয় আর হাওরেরও পানি বেশি নয় বলে পানিতে ঢেউয়ে খুব উত্তাল নয়। যতটুকু আছে তা এক কুল কুল শব্দ করে আছড়ে পড়ে বাঁধের কিনারে।

ঘাটে ইকো রিসোর্টের নিয়মিত মাঝি ফারুক হাজির। আমাদের আসার পথে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় ফারুক মাঝিকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই সে নৌকাঘাটে উপস্থিত। গাড়িতে নামতেই হাত বাড়িয়ে পরিচিত হয়ে তার নৌকায় নিয়ে গেল। মাঝি না বলে ফারুককে নৌকার মালিক বলা যেতে পারে। আরো দুজন মাঝি আছে নৌকায়। আমি মাঝির পাশের দোকানে লাইফ জ্যাকেট খোঁজ করে পেলাম না। মাঝিরা জানাল, পর্যটকরাই নিয়ে আসে এই জীবনতরী। তবে হাওরে নৌকাডুবির ভয় তেমন নেই বলেও অভয় দিল।

শহুরের গ্রাম দরশন

বিলম্ব না করে আমাদের ভ্রমণ দলের সবাই নৌকার ছাদে উঠে গেল। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ছাদেই বেশিরভাগ মানুষ বসে। রোদ-বৃষ্টির সময় নিচের পাটাতনেও বসে, সেখানে ঢুকতে হলে হামাগুড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে যেতে হয়। নৌকা হাওরের পানি পেরিয়ে ঘোরাউত্রা নদীর দিকে চলতে শুরু করল। নিকলীর ওপারপাড়ে ছাতিয়ার চর। আমরা নদী পেরিয়ে চরে যেতে চাইলেও মাঝিরা সেদিকে যেতে অনীহা প্রকাশ করল। কারণ অজানা। তারা বলল, ওই চরে সমস্যা আছে, ঘাট নেই, নৌকা চরে আটকে যাবে, যেতে আসতে অনেক সময় চলে যাবে ইত্যাদি। আমরা মূল নদীর তীর দিয়ে নিকলী হাওরের মাঝখানে একটি কাশবনের দ্বীপে গিয়ে পৌঁছালাম। মাঝিরা নেমে বেড়ানোর পীড়াপীড়ি করলেও আমরা নামলাম না। বেশিরভাগ পর্যটকের নাকি কাশবন এক আকর্ষণ বলেও তারা জানাল। দলের কামরুল ভাই, মাঝিরা সময়ক্ষেপণ করার বাহানায় আমাদের কাশবন দ্বীপে নিয়ে এসে নৌকা ভিড়িয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920602805.jpg
নৌকার অভ্যন্তর

 

আমরা নদীর পাশ দিয়ে ঘুরে আবার হাওরের ঘাটের দিকে যেতে বললাম। হাওরের চারদিকে যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। মাঝিরা বলল, বর্ষার সময় নদীর পানি ফুলে ফেঁপে হাওর তৈরি হয়। অন্যসময় নদীতেই শুধু পানি থাকে, মাঠে ধানভুট্টার চাষ হয়। তারা বর্ষা মৌসুমে নৌকা চালায়, অন্যসময়ে চাষাবাদ করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920667172.jpg
নৌকার ছাদে বসে হাওর পর্যটন

 

নৌকা চলছে। তবে ইঞ্জিনের শব্দে আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়ে। মনে পড়ে ছোটবেলায় পালতোলা নৌকায় কত চড়েছি। কালের বিবর্তনে নৌকার সেই পাল হারিয়ে স্থান নিয়েছে ইঞ্জিন। আমরা কখনো নৌকার নিচের পাটাতনে কখনো টিন দিয়ে তৈরি ছাদে উঠে আড্ডা আলোচনা আর হাওর সৌন্দর্য দেখে সময় পার করছি। ছবি, ভিডিও, সেলফি তোলা সমানে চলছে। আষাঢ়ের ঘনঘটার মধ্যে মেঘের ফাঁকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে কখনো কখনো। নিরন্তর গা জুড়িয়ে যাওয়া বাতাসে রোদের মধ্যেও প্রশান্ত দিচ্ছে বলে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, জলরাশির বিস্তার। কবি কামরুল হাসান বললেন, পৃথিবী যে গোল এখান থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ক্ষেতসমুদ্রে সান্ধ্য ভ্রমণআড্ডা

হাওর ভ্রমণের অন্যতম মজা, হাওরতীরের হোটেল থেকে হাওরের তাজা মাছের তরকারি দিয়ে উদরপূর্তি। স্থানীয় মানুষ পর্যটকদের এই আকর্ষণ বুঝতে পেরে হোটেল ব্যবসা খুলেছে। নিকলী হাওরের হাসপাতাল মোড়ে অনেকগুলো খাওয়ার হোটেল। আশি টাকায় যে কোনো একটা মাছের তরকারি আর ভাত, ডাল, সবজি খাওয়া যায়। আমরা সেখানকার সেতু হোটেলটি পছন্দ করলাম। আইড়, পাঁচমিশালী, হুতুম, হাওরের কই মাছের তরকারি লাচ্চু মাছ ভাজা দিয়ে উদরপূর্তি করলাম। আমাদের সঙ্গীরা একেকজন একেক ধরনের মাছের তরকারি পছন্দ করে উদরপূর্তি করে মহাখুশি। দিনের পরবর্তী গন্তব্য কিশোরগঞ্জ শহর। গাড়ি সেদিকে ছুটে চলল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র