Alexa

কুতুব মিনার, আটশ’ বছর দাঁড়িয়ে থাকাটাই বিস্ময়

কুতুব মিনার, আটশ’ বছর দাঁড়িয়ে থাকাটাই বিস্ময়

কুতুব মিনার/ছবি: বার্তা২৪.কম

কুতুব মিনারের পাশ থেকে: কুতুব মিনারের সামনে ডাব বিক্রেতা বলে উঠলেন, এ কুতুব মিনারে কী আছে যে সারা বছর এতো মানুষ আসে দেখতে?

পাশেই দাঁড়ানো রমেশ পাওয়াল। ভারতের হরিয়ানা রাজ্য থেকে এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বললেন, আটশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি যে দাঁড়িয়ে আছে; সেটাই বিস্ময়। কুতুব মিনার তো কারুকার্যময় একটি স্তম্ভ। তাজমহলের চেয়েও বেশি দর্শক আসেন এটি দেখতে। সাধারণ পাথরে মানুষের বানানো একটি স্থাপনা এতো বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে তা বিস্ময়ই বটে, মন্তব্য রমেশের।

বদলে গেছে ভারতের রাজনীতি। এক পায়ে দাঁড়িয়ে কত রাজনীতি দেখেছে এই কুতুব মিনার! মানুষ বদল না হলেও কর্তৃপক্ষ বদল হয়েছে। তাইতো অনেক কিছুতেই দিল্লির প্রতীক হিসেব এখন কুতুব মিনারের ছবি ব্যবহার কমে গেছে।

দিল্লি মেট্রোরেল বেশ প্রসারিত। কয়েক বছর আগেও এই মেট্রোর টিকিট বা টোকেনে কুতুব মিনারের ছবি থাকতো। এখন তা নেই।

কুতুব মিনার নামের এই বিজয়স্তম্ভ দিল্লি শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।

Kutub Minar
কুতুব মিনার/ছবি: বার্তা২৪.কম

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির সেনাপতি ও প্রতিনিধি কুতুব-উদ্দিন আইবেক ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে চৌহান রাজা পৃথ্বিরাজকে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করেন। এ বিজয়ের পরে তিনি দিল্লি অধিকার করে কুওয়াতুল ইসলাম নামে একটি মসজিদ এবং এর সংলগ্ন একটি মিনার নির্মাণ করেন। এই মিনারটি ভারতবর্ষের মুসলিম ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন।

ভারতের প্রথম মুসলমান শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের আদেশে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে।

তার তত্ত্বাবধানে প্রথম ও দ্বিতীয় তলা নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে (১২১১-৩৬) সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশের তত্ত্বাবধানে মিনারের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা এবং শেষে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে পঞ্চম তলা নির্মাণ শেষ হয় ১৩৮৬ খ্রিস্টাব্দে। ভারতীয়-মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন কুতুব মিনার।

কুতুব মিনার বিশ্বের সর্বোচ্চ ইট আর লাল বেলে পাথরে নির্মিত মিনার। এটি কুতুব কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত। মিনারটির উচ্চতা ৭২.৫ মিটার (২৩৮ ফুট)। মিনারটির পাদদেশের ব্যাস ১৪.৩২ মিটার (৪৭ ফুট) এবং শীৰ্ষ অংশের ব্যাস ২.৭৫ মিটার (৯ ফুট)। ত্ৰয়োদশ শতাব্দীর প্ৰথম দিকে এই মিনারের নিৰ্মাণ কাজ শেষ হয়। মিনার প্ৰাঙ্গণে আলাই দরজা (১৩১১), আলাই মিনার (এটি অসমাপ্ত মিনারের স্তূপ, এটি নিৰ্মাণের কথা থাকলেও, নিৰ্মাণ কাজ শেষ হয়নি)।

কুতুব মিনার কামরাঙ্গার ভাজের মত গঠন নিয়ে নিপূণভাবে নির্মিত, যার মাঝে মাঝে বারান্দা রয়েছে। আচ্ছাদন এর উপরে পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা। ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতে মিনারের কোনো ক্ষতি হলে সেটি আবার শাসকদের দ্বারা ঠিক করা হয়। ফিরোজ শাহ এর শাসনকালে, মিনার এর দুই শীর্ষ তলা বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিরোজ সেটা সংস্কার করেন। ১৫০৫ সালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সিকান্দার লোদীও এটি সংস্কার করেন।

Minar
মিনারের গায়ে আরবি লেখা ও সুন্দর কারুকাজ/ছবি: বার্তা২৪.কম

এরপর বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকার এটির সংস্কার কাজ চালিয়ে আসছে।
ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কুতুব মিনার এবং এর কমপ্লেক্সে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভবন ও সৌধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে কুতুব মিনার কমপ্লেক্স। কুতুব মিনার দিল্লির পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান।

আফগানিস্তানের জাম মিনারের অনুকরণে এটি বানানো হয়। পাঁচতলা বিশিষ্ট মিনারের প্রতিটি তলায় রয়েছে ঝুলন্ত বারান্দা। কুতুব মিনার নামকরণের পেছনে দু’টি অভিমত রয়েছে, প্রথমত, এর নির্মাতা কুতুব উদ্দিন আইবেকের নামানুসারে এর নামকরণ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ট্রান্সঅক্সিয়ানা থেকে আসা বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত কুতুব উদ্দিন বখতিয়ার কাকীর সম্মানার এটি নির্মিত হয়।

কুতুব মিনারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মনোরম একটি কমপ্লেক্স। ১০০ একর জমির ওপর নির্মিত এ কমপ্লেক্সে রয়েছে কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদ, আলাই মিনার, আলাই গেট, সুলতান ইলতুৎমিশ, সুলতান গিয়াস উদ্দীন বলবন, সুলতান আলাউদ্দিন খলজী ও ইমাম জামিনের সমাধি ও লৌহ পিলার।

আপনার মতামত লিখুন :