সুদান: রক্তাক্ত নীল নদের তীর

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
সুদান: রক্তাক্ত নীল নদের তীর/সংগৃহীত

সুদান: রক্তাক্ত নীল নদের তীর/সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

 

আফ্রিকার প্রাণপ্রবাহ নীল নদের উভয় তীরবর্তী জনপদই রক্তাক্ত হচ্ছে। এক তীরের দেশ মিশরের পথ ধরে অন্য তীরের সুদান নামক আপাতত শান্ত দেশটিও এখন রক্ত, মৃত্যু, সংঘাতে উত্তপ্ত।

ইতিহাস ও সভ্যতার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় নীল নদের প্রবহমান পানিতে গৌরব ও অর্জনের পাশাপাশি মিশছে রক্তের ধারা৷ যে বিখ্যাত নীল নদ মিশরের জনজীবনকে সুজলা সুফলা করে তুলছে সেই নদের জলেই তৃষ্ণা মেটায় অপর তীরের সুদান৷ ভৌগোলিক নৈকট্যের মতো রাজনৈতিক সংঘাতের ধারাও নদীস্রোতের সমান্তরালে এসে মিশেছে দুইটি দেশে।

নীল তীরে সুদান নামক লম্বা, সুঠাম, কালো মানুষের দেশটিতে সর্বসাম্প্রতিক কালে রাজনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে৷ সুদানে দীর্ঘ ৩০ বছর একনায়ক ছিলেন ওমর আল বশির৷ কিছুদিন আগে প্রবল গণ বিক্ষোভের চাপে এই স্বৈরশাসককে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী৷

আফ্রিকার এই দেশটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত৷ তবে দেশটির দক্ষিণ অংশ অর্থাৎ দক্ষিণ সুদান ২০১১ সালে পৃথক হয়ে যায়৷ তখন থেকেই লাগাতার সংঘাত ও চাপা গৃহযুদ্ধে এই দেশটিও রক্তাক্ত এবং বিপন্ন ৷

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বরাতে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, প্রবল গণ বিক্ষোভের চাপে গত ১১ এপ্রিল ৩০ বছরের স্বৈরশাসক ওমর আল বশিরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সুদানের ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপর সেনারা দুই বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকবে বলে ঘোষণা করে। এই দুই বছর সময়ের মধ্যে নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে বলেও জানানো হয় সামরিক বাহিনীর তরফে।

কিন্তু, এক স্বৈরতন্ত্র থেকে আরেক স্বৈরতন্ত্রের অধীনে আসতে চান না মানুষ। সুদানি জনগণ ক্ষমতা দখলকারী সেনাবাহিনীকে মানতে নারাজ৷ গণআন্দোলন তাই সুদানের স্বাভাবিক জীবনকে স্পর্শ করে। প্রতিদিনই আন্দোলন বেগবান হতে থাকে দেশের জনগণের মধ্যে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560076675721.jpg

ফলে সুদানি জনগণ দ্রুত গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সেনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন৷ সেনা সদর দফতরের সামনে শুরু হয় অবস্থান৷ জুন মাসের শুরুতে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। জনগণ ও সামরিক বাহিনী চলে আসে মুখোমুখি অবস্থানে।

মিডিয়া সূত্রে প্রকাশ, উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে গত ৩ জুন ভোরে জনতা-সেনাবাহিনীর সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হয়। বিক্ষোভ ও আন্দোলন থামাতে দেশটির র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (আরএসএফ) নির্বিচারে গুলি চালায়৷ এতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়৷ আহত ও আটক হন বহুজন।

বিদেশি সাংবাদিকরা সরেজমিন উপস্থিত থেকে জানিয়েছেন যে শতাধিক মৃত্যুর সংবাদ এলেও ৬০ জনের গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার করা হয়েছে৷ বাকিদের মরদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সাংবাদিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে সুদানের পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই গৃহযুদ্ধের দিকেই মোড় নিতে চলেছ।

পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ ও বিপজ্জনক যে সুদানে থাকা বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বার্তা দিচ্ছে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস৷ বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়েছে, কোনও অবস্থায় কেউ বাইরে বের হবেন না৷

রাজধানী শহর খার্তুমে থাকা বিদেশিরা আপাতত নিরাপদ বলেই জানা গিয়েছে৷ তবে সেখানে ঘুরতে যেসব পর্যটক গিয়েছেন তাদের অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে সরে আসতেও বলা হয়েছে।

সুদান সংক্রান্ত মিডিয়ায় প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে এমনই জানা গেছে যে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে সহিংস হয়ে আছে রাজধানী খার্তুম। সেখানকার পরিস্থিতি রক্তাক্ত৷ গুলি চলছে এলোপাথাড়ি৷ ঝুঁকি নিয়ে বের হওয়া বিপজ্জনক।

ইতোমধ্যেই আফ্রিকান ইউনিয়ন সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে তাদের সদস্য পদ থেকে সুদানকে বাদ দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোড়ন হয়েছে এবং সুদান দৃশ্যত একঘরে হয়ে গিয়েছে।

বিবিসি, এএফপি, আলজাজিরাসহ সব আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের সর্বশেষ খবর খার্তুমের রাস্তায় রাস্তায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তেজিত জনতার সংঘর্ষ আরও ছড়াচ্ছে৷ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহতের সংখ্যা শতাধিক৷ নীল নদের জল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বহু দেহ৷ এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা৷

সব মিলে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপে আফ্রিকার দেশ সুদান ফুটছে৷ সেই উত্তাপ ছড়িয়েছে বিভিন্ন দেশেও৷ আর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে আফ্রিকান ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা সুদানের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করছেন৷ সুদানে থাকা বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷ উত্তপ্ত ও রক্তাক্ত সুদানকে কেন্দ্র করে আফ্রিকায় সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা।

আপনার মতামত লিখুন :