Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-৬

গ্র্যান্ড মদিনা মসজিদ

গ্র্যান্ড মদিনা মসজিদ
ছবি: বার্তা২৪
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

অন্ধকারের ঘোর কাটিয়ে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় শিলং পৌঁছে ভ্রামণিকদল পুলকিত। চারদিকের দৃশ্যে যেমন নয়ন জুড়ায়, তেমনি জলহাওয়ার শীতলতা অনুভূতিকে প্রশান্ত করে দেয়।

কবি নজরুল বলেছেন, ‘আমার নয়নে নয়ন রাখিয়া প্রাণ করিতে চাও কোন অমিয়...’ আমরা যেন প্রকৃতির এক অমিয়সুধা পান করছি। এই পরিভ্রমণরত মেঘদলে ঢেকে যাচ্ছে অদূরের পাহাড়, তো পরক্ষণেই রোদের ঝিলিক। সৃষ্টির এই অবারিত বৈভব দেখে অজান্তে এর স্থপতির প্রতি মাথা নুয়ে আসে। সেই মাথাকে আরও নত করে দিতে আমাদের অন্যতম ভ্রমণগাইড খাসিভাষার কবি ও কলেজশিক্ষক বাখিয়ামুন রিনজারে গাইডেন্সে গাড়ি ছুটে চলে লাবান এলাকায়। সেখানে শিলংয়ের নতুন বিস্ময় গ্র্যান্ড মদিনা মসজিদ বা গ্লাস মসজিদ। ভারতের একমাত্র গ্লাস এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম মসজিদ।

ব্লগ ও ভ্রমণ গাইডে শিলংয়ের প্রচুর দর্শনীয় স্থানের মধ্যে গ্লাস মসজিদের উল্লেখ পাওয়া যায় না বললেই চলে। আগ্রহ আকুল পর্যটকই কেবল পাহাড়ি সরু রাস্তা পেরিয়ে লাবানে ছুটে যায় মসজিদ পরিদর্শনে। আমাদের ভ্রমণ লিস্টের ওপরের দিকেই রয়েছে গ্র্যান্ড মদিনা মসজিদ। সেই আগ্রহের কারণও বাখিয়ামুন। কারণ ‘ভ্রমণগদ্য শিলং ট্রিপ’ গ্রুপে সে-ই একটা ভিডিও পোস্ট করেছিল, যা দেখার পর ভ্রমণসূচিতে সেটি না রেখে পারিনি। মনে হলো শিলং ভ্রমণটি নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু হলে খুব খারাপ হবে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/13/1560440766978.jpg

ভ্রামণিকদলের সবাই উৎফুল্ল, খাসি গোস্টগণ আমাদের মসজিদ দেখাতে পেরে, আমরা দেখতে পেরে। তারা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হলেও অন্য ধর্মের তুলনায় ইসলাম ও মুসলমিদের সঙ্গে সাজুয্যবোধ করে বলে আগেই জানিয়েছে।

বাখিয়ামুন বললো, ‘আই থিঙ্ক দ্য মস্ক অফার টু প্রেয়ার সার্ভিসেস এভরি ডে, মর্নিং অ্যান্ড ইভেনিং টাইম। ইউ উইল গেট ইভেনিং প্রেয়ার।’ বললাম, ‘ওহ নো, দেয়ার আর প্রেয়ারস ফর ফাইভ টাইমস অ্যা ডে।’

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গাড়ি লাবান এলাকা পৌঁছাল। একটি সরু গলি দিয়ে নিচে নামতেই ডানদিকে তিনতলা ভবন। ভবনের নিচ দিয়ে ভেতরে প্রবেশের রাস্তা। সামনে ঘাসে ছাওয়া প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণে ঢুকলে চোখ জুড়ানো বহু বর্ণিল ফোয়ারা আগন্তুককে স্বাগত জানায়। সামনে তাকিয়ে দেখি, অপূর্ব স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত বহুতলবিশিষ্ট গ্র্যান্ড মসজিদ চোখের সামনে চকচক করছে। মসজিদের একটি গম্বুজ, চারটি মিনার। পুরো মসজিদ সবুজাভ কাঁচে মোড়ানো বলে এর আরেক নাম গ্লাস মসজিদ। পূর্ব প্রান্তের চত্বর দিয়ে ঢুকে মসজিদের ডানদিক বা উত্তরে মেয়েদের ওজুঘর।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/13/1560440839885.jpg

ভেতরে ডানদিকে ঘেরা জায়গায়তাদের নামাজের ব্যবস্থা। মসজিদ ও সংলগ্ন ঈদগাহ মিলে আট হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের ধারণক্ষমতা দু্ই হাজার। উইকি তথ্য দিচ্ছে, শিলং শহরে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৫ শতাংশ বা সাত হাজারের মতো।

বাম দিকে পুরুষ ওজুখানা। ভ্রমণদলের দু’দল দু’দিকে ওজুর জন্য ছুটলাম। ওজুখানায় বসার জায়গা থাকলেও বুঝতে পারলাম এ্রখানে সবাই দাঁড়িয়ে ওজু করে। আমি তসু ও কবি কামরুল হাসান ওজু করে নিলাম। ওজুখানার প্রবেশপথের বামদিকে একটি ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে ৩১ মে জুম্মা কালেকশনের পরিমাণ লেখা। মনে হলো, গোটা মাসে জুম্মা নামাজের সময় মসজিদ তহবিলে যে অর্থ আদায় হয়, তার পরিমাণ লেখা হয় বোর্ডটিতে। ৩১ মে পর্যন্ত জুম্মা কালেকশনের পরিমাণ ১০ হাজার ১১০ টাকা। ভাবলাম, গ্লাস মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর স্বচ্ছতার মতোই স্বচ্ছ এর হিসাব-নিকাশও।

ওজুখানা থেকে দক্ষিণ দিকের দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। দিনমানের ভ্রমণক্লান্তি নিমেষে উধাও। একটি পবিত্রতার বেষ্টনীর মধ্যে ঢুকে গেলাম। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মেঘালয় রাজ্য গারো ও খাসি প্রধান। এদের প্রাচীন ধর্ম অনেকটাই লুপ্ত। বেশিরভাগ এখন খ্রিষ্ট ধর্মদীক্ষিত। এমন একটি রাজ্যের রাজধানীর প্রধান মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারায় ভিন্ন অনুভূতিতে তৃপ্ত হচ্ছে মন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/13/1560440882264.jpg

ঘড়িতে ছটার কিছু বেশি বাজে। আজান হয়ে গেছে। নামাজ শুরু হতে যাচ্ছে। দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম কোন নামাজের নিয়ত করবো? আকাশ তখনও পরিষ্কার। ভারতের সময় আধাঘণ্টা এগিয়ে। মাথার মধ্যে তখন মাগরিবের সময়টা আসেনি। মনে হলো, তাড়াতাড়ি মাগরিব? নামাজে দাঁড়ানোর পর দেখি, ইমাম সাহেব উচ্চস্বরে পড়া শুরু করেছেন-‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, আররাহমানির রাহিম’.... নিয়ত করলাম মাগরিবের।

নামাজ শেষ করে দেখি প্রশস্থ মসজিদের পেছনের একটি সারিতে কবি কামরুল হাসান নামাজে দাঁড়িয়েছেন। জামাতে ফরজ শেষ করে সুন্নত পড়ছেন। জানা মতে, ব্যবস্থাপনার এই প্রফেসরকে ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে আগ্রহাকুল দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বরং ধর্ম-বিশ্বাস এসব নিয়ে আলাপচারিতায় তিনি বিজ্ঞানের প্রসঙ্গ তোলেন। এখানকার ভাবগাম্ভীর্যময় পরিবেশ ও পবিত্রতার বেষ্টনী সেই মানুষকেও নামাজিদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ব্যতিক্রমী মসজিদটি থেকে শুধু দেখার স্মৃতি নিয়েই তিনি ফিরতে চান না, নামাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে সঙ্গে সংযুক্ত করার স্মৃতিটিও রেখে যেতে চান।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্রনাথের শৈল অবকাশ শিলং

নামাজ শেষে বাইরে বেরিয়ে দেখি সামনের চত্বরের ফোয়ারাটি ইতোমধ্যে বিদ্যুতের বহুবর্ণিল আলোয় ঝলমল করছে। গম্বুজ ও চারমিনার ও মুল মসজিদ থেকে সবুভ আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। চত্বরে দাঁড়িয়ে আমরা নানা কৌণিকে মসজিদকে পেছনের রেখে ছবি তুলে যাচ্ছি। নামাজে শামিল হওয়া ত্রিশ জনের মতো মুসল্লি তখন চত্বর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কবি কামরুল হাসান আলাপী মানুষ, নিরন্তর নেটওয়ার্কিংয়ের বিশ্বাসী, দেখি একজনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। শিক্ষিত, মার্জিত শ্রুশ্মমন্ডিত যুবক। আমিও যোগ দিই। জানা গেল তার নাম ডা. জামাল সিদ্দিক। ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি। তিনি জানালেন, বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজে মুসল্লি খুব বেশি হোক বা না হোক, শুক্রবার জুম্মার নামাজে পাঁচ শতাধিক মুসল্লির জমায়েত হয়। আলাপের সময় ইমাম সাহেব বের হয়ে যাচ্ছিলেন।

বেরিয়ে আসার সময় মনে হলো, এ অঞ্চলের ঝরনা, জাদুঘর, মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশনসহ বহু দর্শনীয় স্থানের কথা ভ্রামণিকদের লেখালেখিতে এন্তার পাওয়া যাচ্ছে। নয়ানাভিরাম মসজিদটি রয়েছে এখনো অনাবিষ্কৃত। এ রচনার ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টিতে পড়লে গ্র্যান্ড মদিনা মসজিদ হয়ে উঠতে পারে ধর্মীয় পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র।

আপনার মতামত লিখুন :

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ। আমেরিকার মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বুজ অ্যালড্রিন প্রথম মানুষ, যারা এই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রং। এরপর বুজ অ্যালড্রিল। তাদের সঙ্গী ছিলেন মাইকেল কলিন্স। তবে তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে না নেমে নভোযানে অবস্থান করেন।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ‘ঈগল’ নামক এক চন্দ্রতরীতে করে তারা প্রথম চাঁদে অবতরণ করেন। নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বলেছিলেন, "That's one small step for man, one giant leap for mankind." (মানুষের ক্ষুদ্র এই পদক্ষেপটি মানব সভ্যতাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেল।)

Moon

চাঁদে মানুষ পাঠানো নিয়ে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ছিল মর্যাদার লড়াই। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক নামক কৃত্রিম উপগ্রহ প্রথম মহাকাশে পাঠায় রাশিয়া। এতে চন্দ্র জয়ের দৌড়ে এগিয়ে যায় দেশটি।

এরপর ১৯৬৬ সালে রাশিয়ার লুনা-৯ নামক উপগ্রহ চাঁদে সফট ল্যান্ডিং করে। এর দুইমাস পর লুনা-১০ নামক আরেকটি উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করে রাশিয়া। তারা চন্দ্রজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও মানুষ পাঠানোর মতো প্রযুক্তি তখনও তারা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে তাদের মহাকাশ অভিযান বাধাপ্রাপ্ত হয়।

Moon

এরমধ্যে ১৯৬৮ সালে মহাকাশ গবেষণায় বড় সাফল্য অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মহাকাশে অ্যাপোলো-৮ নামে মানুষ বহানকারী একটি যান মহাকাশে পাঠায়। সেটি চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১ তে চড়ে চাঁদে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রংরা।

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক
আব্বাস ইবনে ফিরনাস : যিনি প্রথম পাখি হয়েছিলেন

জ্ঞানচর্চার জাত-ধর্ম হয়না।
‘Mankind: The Story Of All Of Us’—বেশ পরিচিত। মানুষের ইতিহাস নিয়ে আমেরিকান সিরিজ। মজার ব্যাপার হলো, স্পেনের এক ভদ্রলোককে নিয়ে আছে লম্বা বয়ান। যেখানে ইসলামের নবী মুহম্মদকে নিয়ে বলা হয়েছে খুবই অল্প। ভদ্রলোকের নামে কর্ডোবাতে ব্রিজেরও নামকরণ করা হয়েছে। আরো বড় কথা, চাঁদে একটা ক্রেটারের নাম তাঁর নামে। বলা বাহুল্য, ক্রেটার হলো গ্রহের পৃষ্ঠতলে বিস্ফোরণ, উল্কাপতন কিংবা মহাকাশীয় বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট গহ্বর। ভদ্রলোকের নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস।

নবম শতক। স্পেনে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কর্ডোবার এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে দেখা গেল পাখা বানাতে। পাখির ওড়ার কৌশল তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। প্রস্তুতি শেষ হলো। মানুষকে অবাক করে উঠলেন উঁচু টাওয়ারে। তারপর দিলেন লাফ। মৃত্যু হতে পারত কিন্তু হলো না। বরং সফলভাবেই উড়লেন একরকম। শুধু ল্যান্ড করার সময় পড়ে গিয়ে আহত হলেন। কারণ লেজের ধারণায় ত্রুটি ছিল। বেশকিছু হাড় ভাঙল। ততক্ষণে রচিত হয়েছে প্রথম মানব হিসেবে উড্ডয়নের ইতিহাস। সেই আব্বাস ইবনে ফিরনাস। বুঝলেন, পাখির মতো একটা লেজ না হলে ল্যান্ডিং সমস্যা ঘুচবে না। যতদিন বেঁচে ছিলেন, কাজ করেছেন এ নিয়ে।

ওড়ার জন্য পাখা তৈরিতে ফাঁপা কাঠ ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। ইবনে ফিরনাস সম্পর্কে লিখেছেন ঐতিহাসিক মুহম্মদ আল মাক্কারি। তৎকালীন কর্ডোবার শাসক প্রথম মুহম্মদের (মৃ.-৮৮৬) দরবারি কবি মুমিন ইবনে সাইদ লিখেছিলেন, “ফিরনাস যখন শকুনির পালক পরে, তখন ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুতবেগে উড়তে পারে।” আরমেন ফিরম্যান বলে ল্যাটিন যে নামটা মধ্যযুগের ইউরোপেও ছিল, তা ইবনে ফিরনাসেরই বলে ধরা হয়।

তবুও তাঁর কাজ শুধুমাত্র এটাই ছিল না। একটা চেইন রিংয়ের ডিজাইন করেছিলেন, যার দ্বারা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি অবিকৃতভাবে উপস্থাপিত হতো। মাকাতা নামে জলঘড়ির আবিষ্কার করেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাস বলে যা আজ পরিচিত, তা অনেকটা তাঁর হাত ধরেই আসে। আগে মিশর থেকে কোয়ার্টজ আমদানি করা হতো স্পেনে। ইবনে ফিরনাস ‘রক ক্রিস্টাল’ কাটার পদ্ধতির অগ্রগতি ঘটিয়ে এ থেকে মুক্তি দেন। তাঁর পরিচয়ে বলা হয়—প্রকৌশলী, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি এবং সংগীতজ্ঞ।

‘Cosmos: A spacetime Odyssey’—পণ্ডিতি ধাঁচের আরেক পশ্চিমা ডকুমেন্টারি সিরিজ। প্রভাবশালী এস্ট্রোফিজিসিস্ট কার্ল সেগানের Cosmos থেকে উদ্ভূত। অনুরূপ জ্যাকব ব্রনস্কির The ascent of man। সেকুলার বয়ান। তবু উভয়ক্ষেত্রেই এসেছে প্রাচ্যের এক আলোকবিজ্ঞানীর নাম। নিউটন, আইনস্টাইন, কোপার্নিকাস কিংবা হাবলের আলোচনা করার সাথে। চাঁদের একটা ক্রেটারের নাম দেওয়া হয়েছে তাঁর নামেও। ভদ্রলোকের নাম ইবনে আল হাইথাম বা আলহাজেন। জন্ম ৯৬৫ আর মৃত্যু ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে। বসরায় জন্ম নেওয়া কায়রোয় বসবাসকারী এই পণ্ডিতের সম্পর্কে প্রাচ্যবাসী প্রায় অনেক কিছু জানে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563620749290.jpg

ইবনে আল হাইথাম: আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চিন্তক ◢

 

মরুভূমিতে একবার তাবু তৈরি করলেন তিঁনি। এমন আবদ্ধ যে ভেতরটাতে কোনো আলো আসতে না পারে এবং বাতি বন্ধ করলে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার তৈরি হয়। তাবুর দেয়ালের একপাশে রাখা হলো সূক্ষ্ম একটা ফুটো। বাতি বন্ধ করে দিলে দেখা হলো অদ্ভুত কাণ্ড। ফুটো দিয়ে আলো প্রবেশ করছে। প্রবেশ করা আলোর গতিপথ সরল। এবং আলো আপতিত হয়ে উল্টো বিম্ব তৈরি করে। এই একটা পরীক্ষা দিয়ে আল হাইথাম ভুল প্রমাণ করে দিলেন তার পূর্ববর্তী ধারণাকে। প্রতিষ্ঠিত করলেন আলোর গতি, ধর্ম ও ক্যামেরার ধারণা। এইখানেই শেষ না। নিউটনের কয়েকশো বছর আগে হাইথামের লেন্স নিয়ে কাজের পাণ্ডুলিপি আজও ইস্তাম্বুলে বিদ্যমান।

আলো এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান খুব সম্ভবত তার প্রিয় বিষয় ছিল। অধিকন্তু ক্যালকুলাস, সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার অবদান ব্যাপক। বায়হাকি তাকে দ্বিতীয় টলেমি বলে স্বীকৃতি দেন। তার কিতাবুল মানাজির ল্যাটিনে অনুদিত হয়েছে ত্রয়োদশ শতকেই। বইটি সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিলো বেকন, গ্যালিলিও, কেপলার, দেকার্তে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এবং রেনেসাঁসের অন্যান্য পণ্ডিতের।

মানুষের চোখের গঠন সংক্রান্ত তার তত্ত্ব ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। ইস্তাম্বুলে রক্ষিত কিতাবুল মানাজিরের প্রথম খণ্ডে বিধৃত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিঁনি বলেন—The duty of the man who investigates the writings of scientists, if learning the truth is his goal, is to make himself an enemy of all that he reads, and ... attack it from every side. He should also suspect himself as he performs his critical examination of it, so that he may avoid falling into either prejudice or leniency.৷ — আল হাইথাম।

খুব সম্ভবত একারণেই Matthias Schramm আল হাইথামকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সত্যিকার স্থপতি বলতে চান।

জ্ঞানচর্চায় প্রাচ্যের পতন ঘটেছে অনেক আগে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে এসে ইবনে হাইথাম কিংবা আব্বাস ইবনে ফিরনাসেরা ঠিকই পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চায় আলোচিত হয়। জ্ঞানের কোনো জাত-কাল-ধর্ম নেই। কেবল হয় না প্রাচ্য সমাজে। একসময় যেখানে বায়তুল হিকমা ছিল, আজ সেখানে গৃহযুদ্ধের গন্ধ। একসময় যারা গ্রহ নক্ষত্রের গতিপথ নিয়ে তত্ত্ব কপচিয়েছে। আজ তাদের বংশধর ঘর হারিয়ে ঘুরছে পথে। ইতিহাস খুবই নির্মম। বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা তাদের শিকড় ভুলে যায়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র