স্বপ্ন থেকে সাফল্যে

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
বরফে-মোড়া চূড়াগুলোর কাছ থেকে উঁকি মারে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া/ ছবি: সংগৃহীত

বরফে-মোড়া চূড়াগুলোর কাছ থেকে উঁকি মারে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নেপালের অনেকগুলো ছোট্ট নয়নাভিরাম গ্রামের একটিতে তেনজিংয়ের জন্ম। টুকরো টুকরো সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ছিল গ্রামটি। বছরের বেশির ভাগ সময় সে পাহাড়ের চূড়াগুলো ঝকঝকে সাদা বরফের চাদরে ঢাকা থাকে। মাঝে থিয়াংবোচে বৌদ্ধ গুম্ফা। এই বরফে-মোড়া চূড়াগুলোর কাছ থেকে উঁকি মারে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া, স্থানীয় নেপালি ভাষায় সাগরমাথা, আর তিব্বতিতে চোমালাংমা।

আরেক বঙ্গ সন্তান রাধানাথ শিকদারের জরিপ করার পর নাম হয় ’পিক ফিফটিন’। এটাই মাউন্ট এভারেস্ট নামে পরিচিত। উচ্চতা ২৯ হাজার ০২৮ ফুট।

এই হিমালয়কে দেখতে দেখতে নেপালের উত্তর-পূর্ব অংশে খুম্বু অঞ্চলের সোলো খুম্বুতে ১৯১৪ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে জন্ম হয় নামগ্যাল ওয়াংদি’র। বাবা খাংলা মিংমা ও মা ডোকমার। বাবা ইয়াক পালক। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে নামগিয়াল ছিলেন ১১তম। পরবর্তীকালের তিনিই বিশ্বখ্যাত তেনজিং।

ছোটবেলা থেকে বরফ মোড়া পাহাড় চূড়ার ফাঁক থেকে এভারেস্ট দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত নামগ্যাল ওয়াংদি। রং বুক গুম্ফার প্রধান লামা নামগিয়ালের তার নতুন নামকরণ করেন তেনজিং নোরগে।

কৈশোরে রোমাঞ্চকর অভিযানের নেশায় দু’ দু’ বার বাড়ি থেকে পালিয়ে যান তেনজিং/ ছবি: সংগৃহীত
কৈশোরে রোমাঞ্চকর অভিযানের নেশায় দু’ দু’ বার বাড়ি থেকে পালিয়ে যান তেনজিং/ ছবি: সংগৃহীত

 

কৈশোরে রোমাঞ্চকর অভিযানের নেশায় তেনজিং দু’দু’বার পালিয়ে যান বাড়ি থেকে। প্রথমবার কাঠমান্ডু, দ্বিতীয়বার দার্জিলিং। এরপর বাড়ির লোক তাকে পাঠিয়ে দেন থিয়াংবোচে গুম্ফায়। লক্ষ্য ছিল তেনজিং গুম্ফায় পাঠ নিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হবেন। তা হলেই না, হলেন পর্বতারোহী।

কিছুদিন পরে তেনজিং বুঝতে পারেন, সন্ন্যাসধর্ম তার জন্য নয়। ১৯ বছর বয়সে তিনি পাকাপাকিভাবে দার্জিলিংয়ে তু সুং শেরপা বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। ঠিক করলেন, এভারেস্টে তাকে যেতেই হবে। শুরু করলেন মাল বাহকের কাজ।

১৯৩৫ সালে প্রখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন তার এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন। মালবাহক আর শেরপা বাছাইপর্বে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে তার নজর পড়ে একটা সুঠাম হাসিখুশি মুখ। পাকা জহুরির মত এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তিনি বেছে নেন তেনজিংকে।

পরে এরিক বলেছিলেন, ‘কয়লার মধ্যে হিরের দ্যুতি ঢাকা পড়ে না। সেরকম একঝাঁক মালবাহকের মলিন মুখের মধ্যে হঠৎ নজরে এল একটি যুবকের ঝকঝকে তামাটে মুখ। যেন না-কাটা হিরের ঝলক। আমি সেদিনই বুঝেছিলাম এভারেস্টকে বাগ মানাতে পারে এই যুবক।’

১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হয়ে গেল লাগাতার অভিযান। বছরের পর বছর ধরে। শুরুতে তেনজিং ছিলেন নিছকই মালবাহক মাত্র। কিন্তু প্রথম অভিযানেই তিনি তার জাত চিনিয়ে দেন। বছর কয়েক ধরে নানা দলের সঙ্গে চলতে থাকে তার পাহাড় অভিযান আর গিরিশৃঙ্গ জয়। সরাসরি চিনতে থাকেন তিনি অপার রহস্যময় হিমালয়কে।

বছরের বেশির ভাগ সময় পাহাড়ের চূড়াগুলো সাদা বরফের চাদরে ঢাকা থাকে/ ছবি: সংগৃহীত
বছরের বেশির ভাগ সময় পাহাড়ের চূড়াগুলো সাদা বরফের চাদরে ঢাকা থাকে/ ছবি: সংগৃহীত

 

বারবার চেষ্টা করেও বহু দিন পর্যন্ত এভারেস্ট ছিল তেনজিংয়ের অধরা। দুর্ভাগ্যও যেন তাড়া করে ফিরছিল তাকে। ১৯৫২ সালে সুইস দল লম্বেয়ারের সঙ্গে এভারেস্ট অভিযান যেমন। নেপালের দক্ষিণ পথ দিয়ে এভারেস্ট চূড়ার মাত্র ৭৭৮ ফুট দূর থেকে খালি হাতে ফিরে আসতে হয় দলটিকে। চূড়ার কাছে পৌঁছে হঠাৎ লম্বেয়ারের শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে যায়।

তেনজিংয়ের কাছে তখন এভারেস্ট জয়ের থেকেও লম্বেয়ারকে সুস্থ অবস্থায় ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনাটা ছিল খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরের বছরই এলো তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। ২৯ মে, ১৯৫৩। এভারেস্ট বিজয়ের ক্ষণ।

আরও পড়ুন: একজন অসামান্য পর্বতারোহী তেনজিং

আরও পড়ুন: বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ

আরও পড়ুন: ইভেন-বরিলিয়ান আউট, হিলারি-তেনজিং ইন

আরও পড়ুন: ১৬ বার ব্যর্থ হয়েছিলেন তেনজিং!

আপনার মতামত লিখুন :